সবই ভালো। হুরমতুল্লার বেটিরও সব ভালো, কিন্তু তমিজের কাছে তার কয়েক আনা পয়সার দাবি তুলছে না, একেবারে চুপচাপ হাঁটছে বলে তমিজ উসখুস করে। আগামীকাল পয়সা ফেরত পাবার ওয়াদা পেয়েই কি তার উদ্বেগ শেষ হয় গেলো? তমিজ আস্তে আস্তে বলে, পয়সাটা আর কয়েদিন বাদে লেওয়া যায় না? ১ কয়টা দিন বাদে? বলে ঠোঁটে একটুখানি বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ফুলজান তমিজের দিকে কেবল একবার তাকায়। তার চোখজোড়ার চেয়ে বাঁকা ঠোটটাই তমিজের চোখে সেঁটে থাকে অনেকক্ষণ, বলতে গেলে সারা রাত জুড়ে। তমিজ বোঝে চারদিকের এই চালের আটা গোলা আলো আসলে আসে ওই ঠোট থেকে। আসমানের চাঁদের সাধ্য কি এই ফকফকা আলোয় দুনিয়া ভাসিয়ে দেয়? আকাশের দিকে তাকিয়ে তমিজ দেখে। সেখানে চাঁদের চিহ্নমাত্র নাই। তাহলে এতো আলো কি এমনি এমনি আসে? মেয়েটাকে তার একটু ভয় ভয় লাগে, আবার তার পাশ থেকে তার সরতেও ইচ্ছা করে না। তমিজ তাই আস্তে আস্তে বলে, ধানটা উঠলেই দিমু। না হয় কয়টা পয়সা বেশিই দিমু।
ঠোঁটে চাঁদ জ্বালিয়ে রেখেই ফুলজান ফের হাসে, উগলান ঢঙের কথা থোও মাঝির বেটা। পয়সা হামার দরকার, বোঝো না? ছছালেক লিয়া হামি ডাক্তোরের কাছে যামু। বলতে বলতে ফুলজান আরো কাপে, চারদিকের আলোও কেঁপে কেঁপে ওঠে।
ফুলজানের বেটার রোগের কথায়, না-কি তার কাঁপুনিতেই কে জানে, তমিজের বুকের ভেতরে তোলপাড় করে ওঠে। নিজে ঠিক ধরতে না পেরে তোমার খুব জাড় করিচ্ছে, না? বলে সে তার গায়ের সুতির ব্যাপারটা ফেলে দেয় ফুলজানের পিঠে। ভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে ফুলজান চাদরটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বলে, ছোল বুঝি হামার বাঁচে না গো! তার কথায় একটু ফেঁপানিও থাকে, আজ সাজবেলাত মুখোত ভাত তুললো না। একটা নওলা ভাতও যদি খাবার পারে!
শুনে ফুলজানের ছেলের প্রতি গভীর দায়িত্ববোধে তমিজের মাথা ভারী হয়ে আসে। আবার ওই ভারী মাথায় তার ফুরফুরে হাওয়া খেলে যায় : আবদুল কাদেরকে তার এতো তোয়াজ করার দরকার কী? সে নিজেই না হয় ফুলজানের বেটাকে নিয়ে যাবে ছাইহাটার। করিম ডাক্তারের বাড়িতে। তার জমির ধানটা কাটা হয়ে যাক। এইতো দুই ক্রোশ আড়াই ক্রোশ রাস্তা। সোজা চলে যাবে খুতিতে পাঁচটা টাকা নিয়ে। সে হাঁটবে এক পা আগে, পিছে পিছে চলবে ফুলজান, কোলে বেটা।
এখন অবশ্য ফুলজান চলছে তার পাশ ঘেঁষে। খয়েরি রঙের চাঁদরে শরীরের সবটা জড়িয়ে নেওয়ায় তার হলুদ ঘোমটা আলাদা করে বোঝা যাচ্ছে। তার কপালে এসে পড়েছে তার ঠোঁটের আলো।-আহা। বিমারি একটা বেটাকে এর কোলে ফেলে পাষণ্ড স্বামীটা কোথায় উধাও হয়ে গেলো, লোকটার কি একবার এর কথা মনেও পড়ে না? বিমারি ছেলেকে নিয়ে সে এখন রাত নাই দিন নাই খেটে মরে বাপের বাড়িতে। তার ছেলের চিকিৎসা করলে সে একটু আরাম পায়। আবার ওই পাষাণহিয়া হারামজাদাটকে ভালো একটা কোবান দিতে পারলেও এর জানটা ঠাণ্ডা হয়। এই দুটো কাজ করতেই তমিজ প্রস্তুত। এই সংকল্প মনে দৃঢ়ভাবে পোষণ করতে না করতেই ছয় ক্রোশ দূরের যমুনা নদীর সাত স্রোত উনপঞ্চাশ ঢেউয়ের ভেতর থেকে পাক খেয়ে বেরিয়ে বাতাসের একটা ঘূর্ণি উড়তে উড়তে বাঙালি নদীতে ভিজে একটু দুর্বল হয় এবং ভাঙায় খানিকটা আর্দ্রতা ঝেড়ে ফেলে ঝাপটা মারে নিজগিরিরডাঙার মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে এবং সেই ঝাপটায় তমিজ তো বটেই, এমন কি রেড ক্রসের চাদর গায়ে জড়ানো ফুলজানও হিহি করে কাপে। এ ছাড়াও পেট-মোটা, সরু হাত পা এবং হলুদ চোখে নিভু নিভু মণি ছেলেটির ভাবনাতেও তারা কাঁপতে পারে। তমিজ এতোটাই কাঁপতে শুরু করে যে, তার এই শরীর আর নিজের দখলে থাকে না। তার হাত থেকে পড়ে যায় ফুলজানের বাপের হোঁচাটা এবং ওই হাতটাই হয়তো কাঁপতে কাপতেই পড়ে গিয়ে ফুলজানের পিঠে। নিজের ঢ্যাঙা কালো শরীরটার সবটা নিয়েই সে পড়ে যাচ্ছিলো। তবে তার আগেই সে জড়িয়ে ধরে ফুলজানকে। ফুলজানের ঠোট থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে জ্যোত্সা। এমন কি জ্যোৎস্নার পেছনে আগুনের শিখায় আঁচ লাগে তমিজের সারা মুখে। সাদা কেরোসিন পাওয়া যায় না, ফুলজানের ঠোঁটের আলো জ্বলে লাল কেরোসিনে, তার ঝাঁঝে তমিজের মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে ওঠে। তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফুলজানের উঁচু বুক তার বুকে ঠেকলে সে বেশ আরাম পায় এবং ফুলজানের বুকের বেদনা অথবা তার স্তনজোড়া কিংবা দুটোই তমিজের গোটা শরীর জুড়ে প্রবল কোলাহল তুলতে থাকে। ফুলজানের আলো-জ্বলা ঠোঁটে তার ঠোট লাগাবার চেষ্টা করলে ফুলজান মুখ সরিয়ে নেয়, তখন তমিজের খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা গালে লাগে ফুলজানের ঘ্যাগ। এতে তার শরীরের কোলাহল কিছুমাত্র কমে না। ঠোঁটের আলো চুমুক দিয়ে সে নিতে পারে নি বটে, তবে এর মানে বোধহয় এ নয় যে, ফুলজান তাকে ফিরিয়ে দিলো। কারণ তার ঘ্যাগে তমিজের প্রবল চাপে মুখ ও গাল ঘষায় সে কৈ, কোনো আপত্তি করলো না তো। তমিজের শরীরের উত্তাপ, উত্তেজনা ও উৎসাহ বাড়তে থাকে সমান তালে। ধানখেতের কয়েক হাত তফাতে মোষের দিঘির উঁচু পাড়ের পুব দিকের ঢালে তমিজ তাকে জড়িয়ে ধরে শোবার উদ্যোগ নিলে কোনোরকম জোর না খাটিয়ে ফুলজান যে কীভাবে তার হাতের ভেতর থেকে বেরিয়ে গেলো তমিজ কিছুই বুঝতে পারলো না। বেরিয়ে পড়েই সে যেন মিলে গেলো পাথারের ভেতর। সে কি জ্যোত্ম হয়ে মিশে গেলো জ্যোৎস্নার মধ্যে?
