কাছে এসে তমিজকে দেখে ফুলজান খুব অবাক, তবে তার বিস্ময়কে ছাপিয়ে ওঠে তার বদ খাসলত, ক্যা, গো, হামার পয়সাটা দিলা না? ধান কাটিচ্ছে সারা মুলুক জুড়া, পয়সা তো ভালোই কামাচ্ছো। খালি হামার হাওলাতটা শোধ করতে তোমার পাছা কামড়ায়, না?
এইসব শুনেও তমিজের পাছা কেন, কোনো অঙ্গই একটুও কামড়ায় না। বরং তাকে পুরো আট আনা, আট আনাও নয়, বারো আনা পয়সা দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। একটু তাড়াহুড়া করেই সে বলে, কাল দেমো। কালই দেমে। সুদও না হয় দেমো।
মাঝির কথার কোনো ঠিক ঠিকানা আছে? বলতে বলতে ফুলজান বাপের দিকে এগুলে হুরমতুল্লা বলে, আর অল্প এ্যানা জায়গা সাফ করা উঠিচ্ছি। কততক্ষণ লাগবি? পাঁচুন দিয়ে জমির আগাছা তুলতে তুলতে সে আপনমনে বলে, চাঁদের আলো যখন আছে তখন কাজ করতে আর আপত্তি কী? আল্লা সুরুজ দিয়েছে মানুষের চাষবাসের সুবিধা হবে বলেই তো। আর যেসব রাতে আল্লা চাঁদ জ্বালিয়ে দেয় সেসব হলো কাজের রাত্রি, চাঁদনি রাতে রাতভর কাম করো।-আল্লার প্রতি শোকরানা গুজার তার চাপা পড়ে হঠাৎ কাশির দমকে।
ফুলজানও হঠাৎ বাচাল হয়ে ওঠে, গোঁ ধরার মতো করে বলে, না বাপজান, ঘরত যাও। কাল বেনবেলা বেলা ওঠার আগেই যাওয়া লাগবি গিরিরডাঙা, মণ্ডলবাড়ি থাকা মানুষ আসিছিলো।
আল্লা চাঁদটাকে নিভিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত হুরমতুল্লা উঠবে না বলে স্থির করেছিলো। কিন্তু ফুলজান তার পাশে বসে হাত থেকে পাঁচুনটা টেনে নিয়ে বলে, এখন ওঠো।। তোমার না আজ বেনবেলা জুর আসিছিলো। কাল ব্যায়না পান্তা খায়ো না। কড়কড়া আছে, ত্যাল মরিচপোড়া দিয়া নবিতন ম্যাখ্যা দিবি, তাই খায়া যায়। তুমি যাও। তোমার পাঁচুন হুঁকা আর হোঁচা হামি লিয়া আসিচ্ছি।
বড়ো মেয়ের এরকম আদুরে কিসিমের হুকুম হুরমতুল্লা জীবনে শোনে নি, বাপের ঠাণ্ডা লাগায় এমন উদ্বিগ্ন হওয়া কি আর এই মেয়ের ধাতে আছে? এ রকম সোয়াগের কথা বলে তার মেজোমেয়ে নবিতন। হুরমতের কাশি তো সবসময় লেগেই থাকে, আবার শীত বাড়ার সাথে সাথে ঘুসঘুসে জ্বরও তার নতুন কিছু নয়। ফুলজানের ঘ্যাগ। থেকে গলা হয়ে বেরুনো এরকম আদরে সোয়াগে হুরমতুল্লার কাছে তার নিজের শরীর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সত্যি সত্যি সে উঠে দাঁড়ায়। তাড়তাড়ি আয়। বলে হুরমতুল্লা রওয়ানা হলে তার টলোমলো পা দেখে বোঝা কঠিন, সে কি আসন্ন জ্বরে কাঁপছে, না-কি ফুলজানের আদরে বিচলিত হয়ে পড়েছে।
ফুলজান কিন্তু পাঁচুন হোচা গুছিয়ে নিয়েও ওঠে না। হুরমতুল্লা তার দিকে পেছন ফিরে তাকালে সে ফের ওইরকম আদুরে হুকুম ছাড়ে, তুমি যাও। হামি আসিচ্ছি। মেয়ের আদরের ঠেলায় কিংবা একবার কাজ ছেড়ে ওঠায় জ্বর তার হয়তো চেপে এসেছে বলে হুরমতুল্ল টলতে টলতে বাড়ির দিকে চলে যায়। ফুলজান আর একটু জায়গার আগাছা সাফ করতে নিড়ানি শুরু করে।
পাঁচুন দিয়ে ঘাস আগাছা কাটার কুচকুচ আওয়াজে ঘোড়ার ঘাস খাবার আভাস পেয়ে তমিজের পায়ের পাতা তিরতির করে কাঁপে এবং এই চাপা গতি দিয়ে সে যে কী করবে ঠিক বুঝতে পারে না। তার এক পাশে মরিচ খেত, মরিচ খেত ঢাকা রয়েছে পাতলা কুয়াশার মশারিতে, এর ভেতরে ঢুকে পড়ে চাঁদের রঙ আটকা পড়েছে অন্যরকম রঙে। এর সঙ্গে তার ধানখেতের ফারাক অনেক। মরিচ খেতে ঢুকে জ্যোৎস্না হয়ে গেছে হলদেটে সবুজ। ছোটো ছোটো ঝোপে জবুথবু হয়ে বসে জ্যোৎস্না অতি ধীরে তার বেগ সামলায়। এই অতি অল্প বেগে সবুজ সবুজ মরিচ একটু করে বাড়ে, সেই বাড়া এতোই ধীর যে এক মরিচ ছাড়া তা দেখার সাধ্যি আর কারুর নাই। তবে হুরমতুল্লা হয়তো টের পায়। বাপের কাজ থেকে সেটা টের পেতে শিখেছে হয়তো ফুলজান। ঘাস আগাছা কাটার কুচকুচ বোলে মরিচগুলো আরাম পায়, তারা বাড়ে আরেকটু তাড়াতাড়ি। তমিজের হাউস হয়, কুয়াশার মশারির মধ্যে ঢুকে সে-ও এই নিড়ানিতে ফুলজানের শরিক হয়। মশারিটা ভালো করে গোঁজা আছে, সে ঢুকলেও চাঁদের আলো এর ভেতর থেকে সহজে বেরুতে পারবে না। তার ধানখেতের আলো যদি মিশে যায় এই মরিচের খেতের সাথে তো রাতভর দুজনে খালি জমির খেদমতই করবে। এখানে এক সাথে কাজ করলে ধান কাটার পরও ফুলজান তার পাশে পাশেই থাকতো। তমিজের জমিতে কাজের কী আর অভাব হবে? আমন উঠলে তমিজ তো আরও জমি বর্গা নিচ্ছে। তার ফসলের ফলন দেখে মণ্ডল কি তাকে জমি বর্গা না দিয়ে পারে?—তাকে জমি দিতে পারলে মানুষ বর্তে যাবে গো! দুই তিনটা খন্দ করতে পারলেই ভিটার লাগোয়া জমিটা মণ্ডলের কাছ থেকে কিনতে না পারুক, খাইখালাসি তো নিতে পারবে। ভিটার জমি, বাড়ির পেছনে বেরোলেই পা পড়ে সেই জমিতে। ফুলজান তখন আসতে পারে, পানি নিতে পারে, নিড়ানি তো দেবেই।-চাঁদ ও কুয়াশায় তার বাড়ি ও হুরমতুল্লার বাড়ি এবং কুলসুম ও ফুলজান সব মিলিমিশে যাচ্ছে। মেয়েটা তার যখন এততাই করবে। তো আর মরিচখেতে তমিজ কি একটু হাত লাগাতে পারে না?
কিন্তু আলের ওপর তমিজ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই মরিচের খেতের সব জ্যোৎস্না গলগল করে বাইরে আসার সুযোগ করে দিয়ে কুয়াশার মশারি তুলে বেরিয়ে আসে ফুলজান। তার বাঁ হাতে বাপের হুঁকা ও পাঁচুন এবং ডান হাতে ঘাস আগাছা ফেলার হোঁচা। সে তো এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি জিনিস বয়ে নিয়ে হেঁটে বাড়ি যায়। তাহলে হয়তো শীতে সে নুয়ে নুয়ে পড়ছে, এখন নুয়ে একটু কাঁপতে কাঁপতে ফুলজান আল ধরে হাঁটতে লাগলো। মরিচ খেতের এখন সবটাই আন্ধার, ফুলজান খেত থেকে বেরুতে চাঁদনির সবটাই বার করে দিয়েছে। কিন্তু এই আল, আল পেরিয়ে মোষের দিঘির উঁচু পাড় সব চাঁদের আলোয় ফকফক করে। কেউ যেন চালের আটা গুলে ঢেলে দিয়েছে তামাম পাথারে, সবই দেখা যায়, কিন্তু চোখে ক্যাটক্যাট করে লাগে না।
