ইগলান ব্যারাম হামার হয় না ফকিরের বেটি। উগলান ফকিরালি ব্যারাম, তোমার দাদা দিয়া গেছে হামার বাপোক। হামার বলে ধান দেখা লাগবি না?
এই জাড়ের মধ্যে যাবা পাথারের মদ্যে? গাওত খালি একটা পিরান, জাড় করবি না?
যাওয়াই লাগবি গো। তামা ন দিন আজ যাবার পারি নাই।
সে সামনে পা বাড়াতেই তার পিঠে পড়ে কুলসুমের সুতি চাদর। কুলসুম চাদর দিয়ে বলে, গাওত দিয়া যাও।
এই চাদর এবার পাওয়া গেছে আবদুল কাদেরের দৌলতে। পাউডার দুধ, সুতির র্যাপার, উলের সোয়েটার, কুইনাইন ট্যাবলেট আর দেশলাই নিয়ে এসেছিলো রেড ক্রসের দল। দলের সর্দার আবার কাদেরের জানাশোনা মানুষ। মুসলিম লীগের টাউনের নেতা। কাদের বলে, শিক্ষিত মানুষ, আগে ছাত্রনেতা ছিলো। এখন টাউনে বাপের বাড়িতে আসিছে। লোকটার বয়স কম, তিরিশ বত্রিশও হবে না। কিন্তু জুলফিতে পাক ধরেছে এখনই। শ্যাম বর্ণের লম্বা মানুষটির গায়ে বোতাম লাগানো লম্বা মোটা পিরান। কাদের বলে, এর নাম আচকান। সেই কালো আচকান আর সাদা পায়জামাপরা। লোকটির মুখে প্রায় সবসময় সিগ্রেট থাকলেও তার গলার স্বর ভারী গম্ভীর ও ভিজে ভিজে বলে তার কথা শুনতে ভালো লাগে। সবার সঙ্গেই হেসে হেসে কথা বলতে পারে, এমন কি এই রিলিফ দেওয়ার সময়েই একদিন সে মুকুন্দ সাহাকে ডেকে বলে, এই যে সাহামশায়, কলকাতায় আমার নামে কম্পেইন করেছেন। আমাকে বললেই তো হতো! নালিশ মুকুন্দ সাহা করে নি, তার নাম দিয়ে করেছে টাউনের কংগ্রেস নেতা নলিনাক্ষবাবু। তো নালিশটা কী?গোলাবাড়িতে রেড ক্রসের রিলিফ দেওয়া হচ্ছে মুসলিম লীগ অফিস থেকে। কাদেরের দোকানে লীগের সাইনবোর্ড। রেড ক্রসের মাল, নাম হবে মুসলিম লীগের। এটা কেমন কথা? এই নালিশ সম্বন্ধে মুকুন্দ সাহা কিছু বলার আগেই রেড ক্রসের ওই লোক বলে, বেশ তো আপনার ঘরে জায়গা দিন না! আপনি কংগ্রেস, মহাসভা যার সাইনবোর্ড টাঙান আমার আপত্তি নেই। আমতলি থানার কাছে ধীরেনবাবুর ঘরটা চাইলাম, সেখানে তো কংগ্রেসের আখড়া। আমার কোনো আপত্তি নেই, লোকে রিলিফ পেলেই হলো। তো ধীরেনবাবু রাজি হলেন না। এখানে কাদেরের দোকানে জায়গা পেলাম। বাধা দেবেন, অথচ জায়গাও দেবেন না, এ কেমন কথা?
মুকুন্দ সাহা সুরসুর করে সরে গেলে কিছুক্ষণ পর আসে বৈকুণ্ঠ গিরি এবং তার জন্যে সুপারিশ করে কাদের, ইসমাইল ভাই, সাহার আড়তে কাজ করলে কী হবে, এই চ্যাংড়াটা ভালো। ইসমাইল হোসেন তাকে সুতির চাদর আর একটা উলের সোয়েটার তো দেয়ই, তার বাবুর জন্যেও পাঠিয়ে দেয় একটা ভালো সোয়েটার। পাউডার দুধ নিয়ে বৈকুণ্ঠ রেখে দিলো কাদেরের দোকানেই, বাবু আবার বিলাতি দুধ দেখ্যা কী বা কয়! সুতির চাঁদরের ওপর সোয়েটার চড়িয়ে বৈকুণ্ঠ হাটময় টহল দিয়ে বেড়াতে লাগলো। সোয়েটার কিন্তু তমিজকে দেওয়া হলো না। কাদের বলে, সোয়েটার পরলে এসব মানুষের গা কুটকুট করবে। দুধের টিনটাও রেখে দিলো কাদের, ইগলান বিলাতি দুধ, খাবার পারবি না। তুই বরং দুইটা চাদর লে। একটা তোর বাপকে দিস। বাপকে সবুজটা দিয়ে নিজের খয়েরি চাদরটা তমিজ দিয়ে দিলো কুলসুমকে। একদিন গায়ে দিয়ে কুলসুম সেটা রেখে দিয়েছিলো এ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ির ভেতর।
আজ সেই চাদর গায়ে জড়িয়ে কালাহার বিলের উত্তর সিথান ঘুরে তমিজ নিজের জমিতে পৌঁছুলো, গিরিরডাঙায় তখন অনেক রাত্রি। চারদিকে ধানের জমি, বেশিরভাগ জমিতে ধান কাটা হয়ে গেছে। এর ফাঁকে ফাঁকে মরিচের খেত। চারদিকে ফসল, না হয় ফসল কাটার চিহ্ন। মোষের দিঘি থেকে পানি খেয়ে ছুটে পালিয়ে গেলো বিলের উত্তর সিথানের কয়েকটা শেয়াল। মুনসির তাপে এরা রাতে বিলের পানিতে মুখ লাগাতে পারে না। শেয়ালগুলো চলে গেলে তমিজ একেবারে একা।
দিঘি, এদিকে মাঠের পর মাঠ, ওপরে আকাশ পর্যন্ত কুয়াশা জড়ানো চাঁদের আলো। তমিজের জমিতে পাতলা কুয়াশা টাঙানো রয়েছে মশারির মতো, মশারির ভেতরে ঢুয়ে-পড়া আলোয় তার ধানগাছগুলো ঘুমিয়ে রয়েছে মাথা ঝুঁকে। চাঁদের আলো। এই ধানখেতে ঢুকে আর বেরোয় না, ধানের শীষে গাল ঘষতে ঘষতে ধানের রঙ চোষে চুকচুক করে। আবার আলো পোয়াতে পোয়াতে ঘুমায় সারি সারি ধানগাছ।
নয়ন ভরে নিজের জমি দেখতে দেখতে হঠাৎ করে সে চোখ ফিরিয়ে নেয়, ধানখেতে তার নজর লাগলো না তো? কিন্তু মরিচের খেতে নজর পড়তেই তমিজের সারা শরীর থমকে গেলো, আবার শরীরটাকে স্থির রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে, বুকের ভেতর থেকে হিম বাতাস বেরোয়, ভয়ে তমিজ তার শিসটা পর্যন্ত শুনতে পায় না। এই চাঁদনি রাতে হুরমতুল্লার মরিচের খেতে হানা দিতে এসেছে সে কোন জীব?
বিলের উত্তর থানের মুনসি কি তার মাছেদের আধার জোগাড় করতে এখানে এসে হাজির হয়েছে নিজেই। তমিজ তো ওইদিক দিয়েই এখানে এলো। কৈ কিছু তো মনে হলো না। পাকুড়গাছের নিচে নিয়ে এলে হয়তো চোখে পড়তো। পাকুড়গাছের তলায় তো সে যায় নি, দেখবে কোত্থেকে? পাকুড়তলা আরো উত্তরে। গাছটা কি তমিজ কখনো দেখেছে? তার মনে পড়ে না বলে ভয় আরো বাড়ে, হুরমতুল্লার জমির ওই প্রাণী তা হলে মুনসির কেউ না-ও হতে পারে। আরো অপরিচিত, একেবারেই অচেনা কোনো কিছুর ভয়ে তমিজ যখন চোখ বন্ধ করে ফেলেছে তখন তাকে উদ্ধার করে হুরমতুল্লার কাশির আওয়াজ।
এই শীতের রাতেও বুড়ার চোখে ঘুম নাই। এখন সে এসেছে জমির তদবির করতে বুঝতে পেরেই তমিজের মনে পড়ে, কার্তিক মাসে এভাবেই সে পানি টেনে দিয়েছিলো তার জমি থেকে। তখন তো তার সঙ্গে ছিলো ফুলজান। এখন সে আসে নি? আসে নি কেন? নিজের ধানখেত ও হুরমতুল্লার মরিচখেতের মাঝখানে আলের ওপর দাঁড়িয়ে সে এদিকে ওদিক দেখে। আল্লার কী কাম, ঠিক সেই সময়েই এসে হাজির হলো ফুলজান। মোষের দিঘির ধারে এসেই সে বাপজান বলে হাঁক দেয়। তার ডাক কেঁপে কেঁপে ওঠে, তমিজকে ছায়ার মতো ঠেকছিলো বলে সে হয়তো একটু ভয়ই পেয়েছে। কুয়াশা ও চাঁদনিতে তার কালো গতরটা সাদাটে কালো দেখায়, বলতে কি তার গায়ের রঙ এখন ফর্সার ধার ঘেঁষে।।
