আবার হাটবারের একদিন পর নিজগিরিরডাঙায় কামারপাড়ায় শরাফত মণ্ডলের জমিতে ধান কাটা হলো। আধিয়ার যুধিষ্ঠির কামার। হায়রে, কামারের বেটা নিজের জমি নিজেই বর্গা চাষ করলো। আকালের সময় যুধিষ্ঠিরের বাপ ধান নিয়েছিলো জগদীশের কাছ থেকে, সুদে আসলে যা হয়েছিলো তাই শোধ করতে জমি বেচলো সে শরাফতের কাছে। শরাফতের হাবভাব বোঝা দায়। কামারের বেটাকে তার নিজের জমি বর্গা দাও, ভালো কথা, কিন্তু তমিজের বাপের ভিটার সাথে লাগোয়া জমিটা তমিজকে দিতে দোষ কী? তমিজ কি তার বাপ কি আর গোলমাল করার লোক? যুধিষ্ঠির তো মেলা গাইগুই করলো। কী সমাচার?–না, আঁটি কোবান দিয়েই ধান সে একবার তুলতে চায় মণ্ডলের গোলায়। আঁটি খুলে গোরু দিয়ে মাড়িয়ে খড় দেবে পরে। মণ্ডল রাজি নয়। ভিজে ধান সে নেবে না। আর ধান-ছাড়ানো আঁটি কামারের বাড়ি রেখে এলেই কামারের বেটা পরে ওখান থেকে মেলা ধান বার করবে। হোক সেটা ঘোলানো ধান, তার দাম যতোই কম হোক, শরাফত নিজের ন্যায্য ভাগ ছাড়বে কেন? যুধিষ্ঠিরকে শেষপর্যন্ত জোতদারের কথাই মানতে হয়। কিন্তু এই নিয়ে মণ্ডলের সঙ্গে ছোঁড়া একটু বেয়াদবিই করে এসেছে। আবার মণ্ডলবাড়ির শিমুলগাছের সাদা বকের কয়েকটা নাকি যুধিষ্ঠিরের ওপর উড়ে উড়ে ওদের বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিলো। এতে মণ্ডল আরো রেগে গেছে। বকের ঝাক তো এসেছিলো কামারপাড়া থেকেই, যুধিষ্ঠির কি আবার তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে তুকতাক করছে নাকি? কিন্তু তমিজের বাপ সেদিন রাতে জড়িয়ে জড়িয়ে। তমিজকে বলছিলো, নেমকহারাম বকের ঝাক আসলে গিয়েছিলো কামারবাড়ির খুলিতে মণ্ডলের ধানের পরিমাণ দেখে আসতে।।
তা বাপু, যুধিষ্ঠির আর মণ্ডল যা ইচ্ছা করুক, তমিজের তাতে কী? যুধিষ্ঠির মানুষটা ভালো। কামলাপাটকে পয়সা যা দেওয়ার দিয়েছে, খাওয়া দিয়েছে ভালো। ওখানে ধান কেটে তমিজের পয়সা যা মিললো, তাতে ফুলজানের পয়সা মিটিয়েও মেলা থাকতো। তবে, পয়সা জমানো দরকার। পয়সা এলো, আর একে ওকে দিয়ে আর মাছ কিনে আর। বাতাসা কিনে সব উড়িয়ে দিলো, তো গোরু কিনবে কী করে? তবে ফুলজানের চটাং চটাং কথা শুনে একেকবার ভাবে, দুত্তোরি দিয়েই দিই। কিন্তু ফুলজান তখন তার কাছে আর চাইবে কী?
মাঝির বেটা তমিজের সঙ্গে বেটির এইটুকু মেলামেশায় হুরমতুল্লা তেমন গা করে। হাজার হলেও বেটির তার স্বামী আছে একটা, মানুষ কতো দূর আর বলতে পারবে? নবিতনের ব্যাপারে বুড়া কিন্তু টনটনা, ওর কাছে তমিজকে ঘেঁষতে দেওয়া যাবে না। তবে নবিতন তো একটু ফুটানিওয়ালি, রাতদিন কাঁথা সেলাই নিয়ে থাকে, কিছুদিন বাদে বাদে কাপড় খারে দেয়, চুল আঁচড়ায় রোজ কাকই দিয়ে। এইসব মাঝি আর কলু, ঘরের পুরুষমানুষকে সে মোটে আমলই দেয় না। সেদিক থেকে হুরমতুল্লা নিশ্চিত। আর তমিজের সঙ্গে হুরমতুল্লা অতো ঠাস ঠাস করে কথাও কয় না। ছোঁড়াটাকে দিয়ে তার উপকার তো কম হলো না। বিল থেকে নালা কাটার কাজটা তমিজ করলো বলতে গেলে একলাই। হুরমতুল্লার মরিচের খেতে ফলন এবার আল্লায় দিলে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো হবে। মরিচের যেমন বাড়, তাতে ফাল্গুনেই মরিচ তোলা যাবে। মুকুন্দ সাহা মণ্ডলকে মরিচের দরও মনে হয় ভালোই দেবে।–তমিজ সব ধরতে না পারলেও কিছু কিছু তো আঁচ করতে পারেই। তমিজ দেখে মরিচের খেতে নিড়াতে নিড়াতে হুরমতের চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে আসে। এখন সেটা মণ্ডলের মরিচের লাভের কথা ভেবে খুশির আবেশে না নিজের খাটনির ক্লান্তিতে তা সে বুঝতে পারে না।
তমিজের চোখ খামাখা ঝুঁজে আসে না, জেগে থাকলে চোখজোড়া তার খোলাই থাকে। কিন্তু আজ শমশের পরমাণিকের জমির ধান কেটে তার বাড়ির নিকানো উঠানে আঁটিগুলো ফেলতে ফেলতে তার বুকটা হঠাৎ ধক করে ওঠে। বুকে অমন ধাক্কা দিলো কে, কেন দিলো কিছু বোঝা যায় না। এরকম আলগা ব্যারাম তো তার কখনো হয় না। কারণটা সে বুঝতে পারলো বাড়ি থেকে ফিরে সন্ধ্যাবেলা ভাত খেতে বসে।
ক্যা গো, মানষের জমির ধান কাটো, তোমার লিজের ধান তুলবা কুনদিন? কুলসুমের এই সাদামাটা প্রশ্নে তার সারাদিনের কাঁপুনির কারণ বুঝলো তমিজ। তবে ধান কাটতে তার দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো? হুরমতুল্লা বলে, দেরিতে রোপা হয়েছে, আরো সপ্তাহ খানেকের আগে তার জমির ধান কেটে লাভ নাই। বুড়াকে বিশ্বাস কী? সময় চলে গেলে ধান কেটে খন্দের সর্বনাশ। তার মানে মাঝির বেটাকে বর্গা থেকে উচ্ছেদ করিয়ে ওই জমি হুরমতুল্লা নিয়ে আসবে নিজের চাষে। বুড়া কি কম শয়তান?-তমিজ সারাদিন পর হঠাৎ অস্থির হয়ে ওঠে : জমি ভরা ধান, আর আজ একবারের জন্যেও সে জমিতে যায় নি। সেখানে কার না কার নজর লাগলো, সেখানে কী না জানি হয়ে যাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে তার ঘুম আসে না। কিংবা ঘুমের পাতলা পর্দার নিচে ছটফটট করে। তার বাপ ঘুমায় পাশের ঘরে। ভেতরের উঠানের দিকের ঝাপ খুলে চৌকাঠে বসে একটানা গুনগুন করছে কুলসুম। আধধা আধো ঘুমে অথবা তন্দ্রায় অথবা জেগে থেকেও হতে পারে, তমিজ কুলসুমের একঘেয়ে সুরের গীত শোনে,
সুরুজে বিদায় মাঙে শীতেতে কাতর।
ধান কাটো ফাটে ভরা শীষের অন্তর।।
একঘেয়ে সুরেই তমিজের মাথার জট খোলে, বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে নেমে পড়ে উঠানে। কুলসুম ওখানে বসে থেকেই বলে, এই জাড়ের মধ্যে তুমি কুটি যাও? তোমার বাপের ব্যারাম ধরলো?
