তমিজের জমিতেও ধান এবার ভালো। কাৎলাহার বিল থেকে নালা কেটে সেঁউতি দিয়ে পানি সেঁচে সেঁচে তমিজ তার জমির চেহারাই পাল্টে দিয়েছে। কার্তিকে জমিতে যে চিড় ধরেছিলো, তা সম্পূর্ণ ঝুঁজে গিয়ে মাটি সেখানে এই পৌষেও কালো কুচকুচ করে। অথচ দেখো, পাশেই রাস্তার মাটির রঙ সেখানে হাড়ের মতো ময়লা সাদা। জমিতে ধানের গোছা তার বেশ ভারি, শীষের ভারে ধান গাছ নুয়ে পড়ে। ধানের রঙও দিন দিন হচ্ছে পাকা সোনার মতো। পাশ দিয়ে যে-ই যায়, সে বাপু যতো ঝানু চাষাই হোক, কিছুক্ষণ দাঁড়াবেই। আলের ওপর দাঁড়িয়ে শমশের পরামাণিক সেদিন আর চোখ ফেরাতে পারে না। খুশিতে সে ডগমগ, মাঝির বেটা, তুই কী করিছু রে? তোর হাতের বরকত আছে বাপু। তাও তো শীষের ছড়া ছাড়া শমশের আর কিছুই দেখে নি। পাকা শীষ মাথায় করে কালো মাটির দিকে মাজা একটু হেলে দাঁড়ানো পুরুষ্টু উঁটিগুলোকে দেখে শুধু তমিজ নিজে। ধানখেত কিন্তু নিজের রঙকে কখনোই সম্পূর্ণ করে দেখায় না; ভোরে শিশিরে এটা টলটল করে, দুপুরবেলা ধানের শীষ থেকে রঙ নিয়ে রোদের তেজ বাড়ে, রোদকে দিয়ে থুয়ে ধানের রঙ হয় একটু ফ্যাকাশে। আবার পৌষের বেলা তাড়াহুড়া করে হেলে পড়লে এই জমিতেই পড়ে হালকা ছায়া, শীষগুলো তখন তাকিয়ে থাকে নিজের ছায়ার দিকে। তারপর সন্ধ্যায় কুয়াশার ভেতর মাথা গুঁজলে ধানখেতটাকে চেনা যায় না, এটা তখন কার কবজায় বোঝা দায়!
ভোরবেলা শীত পড়ে। পিরানের ওপর একটা কথা জড়িয়েও তমিজের জাড় করে। ধানগাছও একটু একটু কাঁপে। তখন নিজের শিরশির করা আর ধানগাছের কাঁপুনির কোনটা কার তমিজ ফারাক করতে পারে না।
দিনমান শরাফতের অন্য কোনো জমিতে ধান কেটে কিংবা ধান কাটার তদারকি করে হুরমতুল্লা সন্ধ্যার আগে আগে মরিচ খেতে এসে নিড়ানি দেয়, মরিচ গাছের গায়ের ময়লা সাফ করে। বেলা ডোবার পর এদিকে মানুষজন থাকে না, মোষের দিঘির ওপারে। হুরমতের বাড়ি থেকে ধোঁয়া ওঠে। হুরমত কিন্তু জমি থেকে ওঠে না। কোনো কোনো দিন হুঁকায় কল্কে সাজিয়ে আনে ফুলজান। একেক দিন তার হাতে থাকে পোড়া মিষ্টি আলু। বাপকে আড়াল করে এক-আধ টুকরা আলু সে এগিয়ে দেয় তমিজের দিকে। কোল থেকে বেটাকে নামিয়ে কুলগাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসিয়ে রেখে সে জমিতে। হাত লাগায় বাপের সঙ্গে। ঠাণ্ডায় ছেলেটা তার হি হি করে কাঁপে। তমিজ তখন তাকে কোলে নিয়ে নিজের শরীরের ওম দেওয়ার চেষ্টা করে। ফুলজানের বেটা আরামে মাথা ঠেকিয়ে দেয় তমিজের বুকে। বুকটা তমিজের ভার ভার ঠেকে;—এটা কি এই পেট-ফোলা ছেলেটার শরীরের ভারে কি-না সে ঠিক ঠাহর করতে পারে না। মরিচখেতের হালকা কুয়াশার ভেতর থেকে ফুলজান তার বেটা কোলে বসে-থাকা তমিজকে দেখতে পায় কিনা সন্দেহ। দেখলে ভালোই হয়!
হুরমতুল্লার বড়ো বেটির সবই ভালো। সুযোগ পেলেই তমিজের হাতে পোড়া আলুটা, চালের আটার রুটিটা কিংবা ঠাণ্ডা একটা ভাপা পিঠা গুঁজে দেয়। আবার বাপ অন্যমনস্ক থাকলে তমিজকে জমিতে সাহায্য করতেও তার আপত্তি নাই। মেয়েমানুষের নিড়ানির হাত যে এতো ভালো না দেখলে বিশ্বাস হবে না।—সবই ভালো। দোষ তার একটাই। তমিজকে সে মাঝির বেটা বলে বড়ো হেলা করে। আর একটা দোষ।–কী?—ওই যে শিশির ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ নিতে তমিজকে আট আনা পয়সা দিয়েছিলো সেটা সে এক ঘড়ির জন্যেও ভুলতে পারে না। তমিজ তো সেখান থেকে কিছু খরচও করে ফেললো। না, নিজের জন্যে নয়।-বৈকুণ্ঠকে দিয়ে টাউনের কালীবাড়ি থেকে পাদোদক এনে দিয়েছে দশ পয়সা খরচ করে। দশ পয়সা আর বৈকুণ্ঠ পান খেতে নিয়েছে দুটো পয়সা। টাউনের কালীবাড়ির জবাফুল ধোয়া মায়ের পাদোদক ভক্তি করে খেতে পারলে মরা মানুষও লাফ দিয়ে ওঠে। ফুলজানের বেটার কিছু হলো না। হবে কী করে?—সব নষ্ট করলো ওই শালা কলুর বেটা গফুর। গোলাবাড়ি হাটে একদিন হুরমতুল্লাকে সে শুনিয়ে দিয়েছে, মাঝির বেটা তোমার বেটির পয়সা আর ফেরত দিছে! আবার হিন্দুর ঠাকুরের পানি লিয়া আসিছে? আরে, হিন্দুর ঠাকুর, তাই মোসলমানের বালামুসিবত আসান করবি কিসক? এটা শুনে ফুলজানের মনটা বিষিয়ে উঠেছে, পাদোদকে তার আর ভক্তি রইলো না। বেটার ব্যারাম সারে কী করে? এরপর থেকে পয়সা ফেরত পাবার জন্যে ফুলজান খালি ঘ্যানঘ্যান করে। তমিজ কতোবার বলেছে, ধান কাটলেই কড়ায় ক্রন্তিতে সব শোধ করবে। তো শোনে না।
কিছু পয়সা তমিজ এখনি যে দিতে পারে না তা নয়। মানুষের জমিতে জমিতে ধান কেটে কামাই তার মন্দ নয় এখন। বাড়িতে রাত্রিবেলা রোজ ভাত জুটছে, সকালে পান্তা কি কড়কড়া না খেয়ে বাপ বেটা ঘর থেকে বেরোয় না। এ ছাড়াও এদিক ওদিক থেকে কিছু কিছু আসছে। এই তো, আবদুল কাদের সেদিন গোলাবাড়ি হাটে লীগের ছেলেদের খাওয়াবার জন্যে জিলিপি আর পান বিড়ি কিনতে তমিজকে পুরো একটা টাকার নোটই দিলো, খরচ হলো সাড়ে বারো আনা, বাকি পয়সাটা পরদিন পর্যন্ত তমিজের কাছেই ছিলো। সে নিজে থেকে দুই আনা ফেরত না দিলে আবদুল কাদের মনেও করতে পারতো না। পুরো চোদ্দটা পয়সা রেখে দিলেই ভালো হতো। সোমবার হাটের দিন মুকুন্দ সাহার আড়তে আদার বস্তা উঠিয়ে দিতে তাকে ডেকে নিলো বৈকুণ্ঠ গোরুর গাড়ি থেকে বারোটা বস্তা নামিয়ে দোকানে উঠিয়ে দিলো সে আর বৈকুণ্ঠ। বস্তা ওঠাবার পর আড়ালে ডেকে বৈকুণ্ঠ তার হাতে তিন আনা পয়সা গুঁজে দিলো। বাবুর কাছ থেকে নিশ্চয়ই আরো বেশি নিয়েছিলো। তা নিক। তিন আনা পয়সাই বা কম কী? সেখান থেকে খামাখা দুই আনা দিয়ে ট্যাংরা মাছ না কিনে ফুলজানকে দিলেও তার ধারের পরিমাণটা একটু কমে যেতো।
