শিশুটির দিকে ভালো করে তাকিয়ে কাদেরের গা শিরশির করে। অনেকদিনের কালাজ্বর ও আজকের প্রবল জ্বরে সে পেয়েছে একটা ভূতের চেহারা। কে জানে তার ওপর কারো আসর টাসর পড়লো কি-না। মোষের দিঘিতে কোদালের কোপ পড়েছে, মহাদেব কি আর কোনো দেও তার মুখে ছাই ছিটিয়ে দিলো নাকি? না-কি কাৎলাহারের খানদানি বাসিন্দা চোখ দিলো তার ওপর? এখন এই ভূতের চিকিৎসা করার অনুরোধ সে ডাক্তারবাবুকে করে কোন আক্কেলে?
এই সময় ডাঃ শিশিরকুমার সেন বারান্দা থেকে নিচে নেমে ঘোড়াগাড়ির দিকে রওয়ানা হয়ে একটু দাঁড়িয়ে সাদা বকে-ছাওয়া শিমুলগাছ দেখছিলো অভিভূত চোখে। পাশে তার আবদুল আজিজ। আজিজের চাপাস্বরের তীব্র ধমকে তমিজ সরে যায়, তবে কয়েক মুহূর্তেই সে দাঁড়ায় গিয়ে ফিটনের সঙ্গে জুতে-দিতে-থাকা জোড়া ঘোড়ার পাশে। ফুলজানের বেটা এখন মায়ের কোলে, মাতৃক্রোড়েও তার রূপের হেরফের হয় নি। তবে তমিজ মুক্ত হয়েছে ভৌতিক মুণ্ডু থেকে। তাই কাদের স্বস্তি পায়, স্বস্তির খুশিতে তার বর্গাচাষা ও দলের কর্মীকে কৃতজ্ঞতা পর্যন্ত জানায়, ফুলজানের বেটাক ভালো ঠেকলো না রে। করিম ডাক্তারের কাছে লিয়া যাস। তখন কলাম না? আমার কথা বললে পয়সা কম লিবি। যাস!
গাড়িতে ওঠার আগে ডাক্তারবাবু আবদুল আজিজের সঙ্গে রোগী সম্বন্ধে শেষবারের মতো কথাবার্তা বলছিলো। গাড়িতে এক কাঁদি শবরিকলা তুলে দেওয়ার তদারকি করছিলো শরাফত মণ্ডল নিজে। ফুলজান ডাক্তারের দিকে এগোবার চেষ্টা করলে শরাফত চাপা গলায় বকে, এই বেহায়া মাগী, তফাৎ যা, তফাৎ যা! একটু তফাৎ যেতেই . ফুলজান পড়ে প্রশান্তের সামনে। প্রশান্ত হঠাৎ শিশুটির গায়ে হাত দিয়ে বলে, জ্বর তো অনেক রে? চোখ দেখেই আমি বুঝেছি।
এতোটা লাই পেয়ে ফুলজান গদগদ হয়ে যায়, তার বাড়ন্ত গলগণ্ড থেকে কথা। গড়িয়ে পড়ে পুঁজের মতো আঠালো হয়ে, ছোলকোনার হামার বারো মাসই ব্যারাম গো বাবা ডাক্তোরবাবু। এানা ওষুধ দিয়া যান গো বাবা। পয়সা হামি সাথথ লিয়াই আসিছি। ওষুধ দিয়া যান বাবা।
সিকি দুয়ানি একানি কানা পয়সা মিলে সে সাড়ে চোদ্দ আনা পয়সা নিয়ে এসেছিলো। ছেলেটাকে কোলে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে বলে তমিজ তার কাছ থেকে নিয়েছিলো পুরো আট আনা পয়সা, পয়সা না দিলে ডাক্তার তোমার ছেলের গাওত হাত দিবি না। এখন ফুলজানের আঁচলে বাধা সাড়ে ছয় আনা। তমিজ তো কিছু করতে পারলো না। এখন নিজেই সে মরিয়া হয়ে এসেছে ডাক্তারের কাছে। ওষুধপত্র যা দেয়। এখনি সে কিনে ফেলবে নগদ নগদ, নইলে পরে মাঝির বেটার কাছ থেকে পয়সা কি আর আদায় করতে পারবে?
দিলি তো দিনটা নষ্ট করে। প্রশান্ত রাগ করে, এখন বাড়ি গিয়ে রাতবিরেতে চান করে জলটা স্পর্শ করতে পারবো? শরতের রাতে একটু একটু ঠাণ্ডায় স্নান করার ঝুঁকি নিয়েও প্রশান্ত কিন্তু শিশুটির পেট টেপে এবং এই সিদ্ধান্তে আসে, পেটের পিলেটা তো পিপে হয়ে গেছে রে। হরেন বুঝি এই হাল করে দিয়েছে। না কী?
হরেন ডাক্তারকে অবশ্য কখনো দেখানো হয় নি। ফুলজান তবু তার সন্তানের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি হিসাব দাখিল করে, ডাক্তোর কোবরাজ কম করনু না বাবা ডাক্তারবাবু। উদিনকা কয়েস কোবরাজেক দ্যাখানু, লগদ সাড়ে সাত আনা পয়সা খরচ হলো। মহাস্থানের ফকিরের পানিপড়া লিয়া আসিছি জষ্টি মাসোত, বাজানের আসা যাওয়া আর দরগার শিরনি বাবদ গেছে এক পয়সা কম চার আনা। আবার—
এই ব্যারাম কতোদিন হলো রে? প্রশান্ত তাকে থামিয়ে জিগ্যেস করলে ফুলজান বলে, ছোল হামার বারোম্যাসা রোগী গো। ছোলকোনা হামার বাঁচবি না!
বাঁচবে না কেন? ডাক্তার সম্বোধনটির মর্যাদা রাখতে প্রশান্ত কম্পাউনডার প্রেসক্রিপশন ছাড়ে, ব্রহ্মচারীর ইনজেকশন দিতে হবে। কালাজ্বর এখন সারে, এই ইনজেকশন দিলেই সারে। টাউনে নিয়ে আয়, দিয়ে দেবো। ছেলে তোর ঠিক বেঁচে যাবে।
ছেলের আয়ুর নিশ্চয়তা পেয়ে ফুলজানের ঘ্যাগে কাপন ওঠে, তার মোটা ও তামাটে গালে লাগে রক্তের ঝাপটা। তার মুখের সঙ্গে লাগানো শিশুটির কালচে হলুদ ছোপ-লাগা মুখে ও ঘোলাটে চোখে সেই ঝাপটার ছায়া একটুখানি হলেও পড়ে বৈ কি?
১৩. প্রশান্ত কম্পাউনডারের ভবিষ্যদ্বাণী
প্রশান্ত কম্পাউনডারের ভবিষ্যদ্বাণী শিরোধার্য করে ফুলজানের বেটা বেঁচেই থাকে। সারা শরীরের রক্ত চুষে পিলেটা তার নাদুসনুদুস হয়, তার পেট মনে হয় রোজই একটু একটু করে ফোলে। ইনজেকশন তাকে দেওয়া হয় নি। করিম ডাক্তারের কাছেও যাওয়া হচ্ছে না। আবদুল আজিজের ছেলে হুমায়ুন মারা যাওয়ার পর কাদের কয়েকটা দিন মনমরা হয়ে পড়ে রইলো ঘরেই, সপ্তাহখানেক পর গা ঝেড়ে উঠে লীগের কাজে এতোটাই জড়িয়ে পড়েছে যে তার নিশ্বাস নেওয়ার সময়টুকু নাই। সাইকেলে করে আজকাল তাকে যেতে হয় অনেক দূরের গ্রামে গ্রামে। টাউনেই যেতে হচ্ছে সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন। তার কেরোসিন তেলের বিক্রিও বেড়ে গেছে অনেক বেশি। এই ইউনিয়নে কেরোসিন আর কোথাও মেলে না, কয়েক গাঁয়ের মানুষ কেরোসিন তেল কিনতে ভিড় জমায় তার দোকানের সামনে। দোকানে গফুর কলুর দাপট, গফুর তেল বেচে আর পাকিস্তানের ভাষণ ছাড়ে। লোকের না শুনে উপায় নাই। আর মানুষ দিনরাত খালি এইসব গল্পেই মেতে থাকে। কাদেরের সঙ্গে ফুলজান ছেলেকে নিয়ে একটু দেখা করার সুযোগ পায় না।
ইনজেকশন সম্বন্ধে তমিজ একটু আধটু খবর রাখে; উঁচু একবার ঢোকালে শরীর। থেকে সেটা যে ফের বের করা যাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। এ ছাড়া তমিজ ব্যস্তও তো কম নয়। চারপাশে আমন কাটার ধুম পড়ে গেছে। এদিকে আমনের চাষ তো আগে ছিলোই না। বছর তিনেক হলো একটু উঁচু ডাঙা জমি কেউ আর খালি রাখে না, রোপা আমন লাগায়। শরাফত মণ্ডলের গিরিরডাঙার সব জমিতে আমনের ফলন বেশ ভালো। এখানে তার আধিয়ার হামিদ সাদিকার নিজেও মাঝারি গেরস্থ; তার নিজের জমি বেশিরভাগই দোপা বলে আমন সে তেমন সুবিধার করতে পারে নি। কিন্তু শরাফতের জমিতে ধান সে তুলেছে মেলা। নিজের বাড়ির পালান পেরিয়ে বিঘা চারেক জমি শরাফত মণ্ডল কখনো বর্গা দেয় না, চাষ করায় তার বছর কামলাদের দিয়ে। ধান রোপা থেকে শুরু করে কাটা এবং কাটার পর মাড়া এবং তারও পর গোলায় তোলা পর্যন্ত সব সে দেখে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। সেখানে সবচেয়ে উঁচু জায়গাটায়, তা বিঘা দেড়েক তো হবেই, শালি ধানের চাষ করেছে মণ্ডল। কালিজিরা শালি ধানের চাষ এবারেই সে প্রথম করলো। কী করবে?–বেটার বৌয়ের বাপের বাড়ি টাউনের ধারে, চাঁদে চাঁদে তারা পোলাও খায়; বলতে কি, বড়ো বেটা আর বেটার বৌয়ের হাউসেই এই ধান বোনা হলো। সারাদিন ওই ধান কেটে তমিজের নাকে মুখে সারা গায়ে পোলাওয়ের চালের সুবাস।
