সাবান? দিচ্ছি। বলে আজিজ ঘরে গেলেও প্রশান্তের সংশয় কাটে না, কাদেরকে জিজ্ঞেস করে হাটের গোলাপি সাবান? তোমাদের ব্যবহার করা না তো?
আবদুল কাদেরের ভুরুতে গেরো পড়ে, গেরো-পড়া ভুরুর নিচে চোখজোড়া কুঁচকে সে তাকায় প্রশান্তের দিকে, আবদুল আজিজ এর মধ্যে নতুন লাইফবয় সাবান এনে দিলে ডাক্তারবাবু দুই হাতে সাবান মাখে, বদনা থেকে পানি ঢালে আবদুল আজিজ। প্রশান্তের কানের কাছে মুখ এনে কাদের বলে, লাইফবয় চলে তো? নাকি লাক্স, পালমোলিভ লাগবে? কন তো তাই না হয় দেই।
প্রশান্ত এবার হাসে বাঁকা ঠোঁটে, তোমাদের তো এখন দিন! কতো কি আমদানি হচ্ছে। তোমরা শিশির ডাক্তারকে নিয়ে আসো! ওরে বাবা! বাড়িতে তো বাবু পিয়ার্স ছাড়া মাখে না। তোমাদের ঘরে বুঝি তাও মজুত রাখো, না কি?
বাইরের ঘরে বসে ডাক্তার নীচু গলায় বলে, একটু দেরি হয়ে গেছে শরাফত মিয়া। আমার সঙ্গে কাদের যাক, ওষুধপত্র নিয়ে আসুক। হরেন ইনজেকশনটা পুশ করবে। দেখা যাক।
কাঁসার মস্ত গামলা থেকে ফুলপাতা আঁকা চিনামাটির বড়ো প্লেটে চামচ দিয়ে পায়েস ঢেলে দিতে কাদেরের বাধো বাধো ঠেকছিলো। কিন্তু দুই চামচ দেওয়ার পর ডাক্তার ব্যস বললে এই খাদ্য গ্রহণে তার সম্মতি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে খুশিতে সে আরেক চামচ ঢালে। টাউন থেকে ডাক্তারকে নিয়ে আসার সময় ক্রিম ক্রেকার বিস্কুট ও লিপটনের চা নিয়ে এসেছিলো। পায়েসের পর বিস্কুট কয়েকটা খেয়ে চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে ডাক্তার বলে, আঃ! ভেরি গুড!
কিন্তু ঘরের বারান্দায় বসে-থাকা প্রশান্ত কম্পাউনডারকে কিছুই খাওয়ানো গেলো। এমন কি কিসের না কিসের হাঁড়িতে জল গরম করেছে এই ভাবনায় সে চা পর্যন্ত ছুঁয়ে দেখলো না। এতে শরাফত বা আজিজ মাথা ঘামায় না। কিন্তু প্রশান্তকে খাওয়াবার জন্যে কাদেরের যেন জেদ চেপে যায়, তো কলা চলবে তো? কলায় তো আর জাতের গন্ধ নেই।
কাদেরের এই উত্তেজনায় ঘরের ভেতর ডাক্তার হেসে ফেলে, কাদেরকে ডেকে বলে, কাদের, রাগ করো না। প্রশান্তের ছোঁয়াছুঁয়িটা একটু বেশি। ব্রাহ্মণ সন্তান, আমার বাড়িতেও কিছু মুখে দেয় না, বুঝলে? তুমি কিছু মনে করো না।
কাদের বাইরে এলে প্রশান্ত গলা নামিয়ে বলে, বাবু সায়েব মানুষ, তিনি সবই পারেন। আমরা গরিব বামুন, আমাদের অর্থবল নেই, প্রতিপত্তি নেই, জাতটা গেলে আমাদের আর থাকে কী?
কাদের বলে, জাতপাত নিয়েই থাকেন। আলাদা জাত বলেই তো আলাদা হতে চাই। আলাদা দেশ দিতে আপনাদের এতো গায়ে লাগে কেন?
ফর্সা ও রোগা প্রশান্ত ফের বাঁকা করে হাসে, আলাদা হয়ে থাকতে পারবে? আলাদা হলে তোমার ভাইয়ের চিকিৎসা করবে কে?
আবদুল কাদেরের তখন রাগ হয় বাপের ওপর, ভাইয়ের ওপর এবং খানিকটা নিজের ওপরেও বটে। স্কুলে লেখাপড়াটা ভালো করে করলেই আই এসসি পড়তে পারতো, তাহলে সোজা মেডিক্যাল কলেজে ঢুকলে ডাক্তার হয়ে বেরিয়ে আসতো কবে? ম্যাট্রিক পাস করে তো ক্যাম্বেলেও ঢুকতে পারতো। ডাক্তার হতে না পারার দুঃখে আবদুল কাদের কাতর হয়ে পড়ে। নিজেদের মধ্যে ডাক্তার থাকলে এই মালাউন কম্পাউনডারের কাছে আজ তাকে এরকম হেনস্থা হতে হয়? দুটো ভাইকেই ম্যাট্রিক যখন পাস করালোই তখন তার বাপের মাথায় এটা কি ঢুকলো না যে, ফ্যামিলিতে এখন একটা ডাক্তার অন্তত হোক। চাষের জমি বাড়াবার ফন্দি ছাড়া বুড়ার আর কোনো বুদ্ধি খোলে না।-আবদুল আজিজের বড়ো ছেলে বাবর ছাত্র তো খুব ভালো, জয়পুর হাই ইংলিশ স্কুলে হিন্দু ছেলেদের মধ্যেও তার রোল নম্বর হয় ৪/৫। হিন্দু মাস্টাররা কি তাকে ফেল করাবার জন্যে চেষ্টা করে না? তারপরেও তার এই রেজাল্ট। বাবরকে ডাক্তার করতে পারলে এই শিশির সেনেরই পসার নষ্ট হবে। এই তামাম এলাকার মোসলমান রুগীরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে টাউনে বাবরের চেম্বারে। এই বেটা মালাউন কম্পাউনডার তার ফার্মেসিতে চাকরির জন্যে এই কাদেরের সুপারিশ চাইবে। চাইতে পারে?—ভাইপোকে বড়ো ডাক্তার বানিয়ে শিশির সেনের পসার মারা এবং প্রশান্তকে তার অধীনে চাকরি দেওয়ার সব পরিকল্পনা পণ্ড হয় তমিজের ডাক শুনে, ভাইজান!
চমকে উঠে বারান্দার নিচে তাকালে ভয়ে আঁতকে ওঠে কাদের : একি? তমিজের ঘাড়ের পাশে বিদুঘুটে একটা ঘ্যাগ গজালো কী করে? তারপর বোঝা যায়, ঘ্যাগ নয়, ওটা একটা মুণ্ডু। তমিজের খালি গতরের ওপর ঘাড় থেকে উঠে এসেছে দুটো মাথা। একটি তার চেনাজানা ও বর্তমানে তাদের বর্গাচাষা তমিজের; আর একটার ঘোলাটে চোখ, ফ্যাকাশে তামাটে মুখ জুড়ে কালচে হলুদ ছোপ। তমিজের ঘন কালো ঝাঁকড়া চুল তার দ্বিতীয় মাথাটিতে গড়িয়ে পড়েছে ফ্যাকাশে লাল আঁশ হয়ে। ওই মাথায় ঘোলা চোখের নিভু নিভু মণিজোড়া বেঁধা রয়েছে কাদেরের দিকে। ময়লাজমা ওই দুটো চোখের টিমটিম করে জ্বলা ভেঁতা মণি দুটো সামলানো কাদেরের সাধ্যের বাইরে।
ভাইজান, ফুলজানের বেটা। হুরমতুল্লার লাতি গো। নিজের দ্বিতীয় মুণ্ডুটির পরিচয় দিলে প্রথমে মনে হয়, ওটাই আসলে কথা বলছে পরিচিত তমিজের মুখ দিয়ে। ফুলজানের বেটা আস্তে আস্তে কাঁদতে আরম্ভ করলে কাদেরের কাছে দুজনে আলাদা হয়ে যায়। তমিজ বলে, ভাইজান, ছোলটার আজ ব্যায়না থ্যাকা খুব জ্বর। উদিনকার লাকান বেহুঁশ হয় নাই, কিন্তু শরীলেত মনে হয় আগুন ধরিছে। জ্বরের মদ্যে চ্যাংড়া খালি হেল্যা হেল্যা পড়ে। ডাক্তারবাবুক একবার দেখাবার চাছিনু।
