বাড়ির সামনের পাগাড়ের ওপারে বেগুনখেতে কাজ করছিলো কালুর বাপ। বুলুর বেটা তাকে ডাকতে গেলে হঠাৎ করে হুরমতুল্লার নাতির জন্যে কাদেরের সুপারিশের কথা মনে পড়ে শরাফতের, কাদের, তখন তুমি না কার কথা কচ্ছিলা? আরে কী নাম। কল্যা? আরে মোসলমান কোন ডাক্তার, ছাইহাটার কোন ডাক্তারের কথা তখন কল্যা না?
করিমের কথা কন? আবদুল করিম? নাম ঠিকঠাক বলতে পারলেও আবদুল কাদের ওই ডাক্তারকে নাকচ করে দেয়, না না। বাজান, কী যে কন! হরেন বাবু পুরানা ডাক্তার, আগে দেখুক। খালি খালি নতুন ডাক্তারের কাছে যাওয়া–।
দরকার নাই। তুমি তখন কল্যা, তাই।
হরেন ডাক্তার পরপর দুইদিন এলো, জ্বর একটু কমে ফের দ্বিগুণ বেগে জ্বর ও কাঁপুনি হতে থাকলে টাউনের রহমত শেখের জোড়া ঘোড়ার ফিটন ভাড়া করে বাড়িতে নিয়ে আসা হলো ডাক্তার শিশির সেনকে। শিশিরবাবুর সঙ্গে এসেছে প্রশান্ত কম্পাউনডার, তার হাতে ডাক্তারের ব্যাগ। গাড়ির পিছে পিছে এসেছে চাষীপাড়ার মানুষ, মাঝিপাড়ার মানুষ। কলুপাড়ার গফুর আর গোলাবাড়ির কিছু লোক তো আছেই। মেয়েমানুষও হাজির হয়েছে মেলা। কোলে কোলে ন্যাংটা শিশুরা এবং সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বালক বালিকা। বিলের ওপারের নিজগিরিরডাঙার মানুষও ভেঙে পড়েছে মণ্ডলবাড়িতে। এমন কি মরিচের খেত থেকে নিজেকে ছিড়ে নিয়ে হাজির হয়েছে হুরমতুল্লা। হুরমতুল্লা কিছুক্ষণ পর পর আবদুল আজিজকে খুঁজে বার করছে এবং নিয়োজিত থাকছে আজিজের ছেলে সম্বন্ধে প্রশংসা করায় এবং তার রোগ নিয়ে আক্ষেপ করায় এবং প্রশংসা ও আক্ষেপকে বিলাপে রূপ দেওয়ায়। টেলিগ্রাম পেয়ে আবদুল আজিজ এসে পৌঁছেছে শিশির ডাক্তার পোঁছুবার একটু পর; সুতরাং তার টমটমের গতি উদযাপন ও চাকা অনুসরণে উৎসাহী মানুষ বেশি পাওয়া যায় নি।
হুরমতুল্লার মেয়ে এসেছে দুই জন, ফুলজান আর সবচেয়ে ছোটোটা, ফালানি। ফুলজানের কোলে তার ছেলেটি প্রায় সবসময় ঘ্যানঘ্যান করে, মাঝে মাঝে তার কমজোরি কান্না বন্ধ হয় কেবল সে মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লে। তমিজ ঘুরঘুর করছিলো প্রশান্ত কম্পাউনঙরের পিছে পিছে। কম্পাউনডার বাবুর ভার লাঘব করতে তার হাতের ব্যাগ বহন করার জন্যে সে দুটো হাতই বাড়ালো কয়েকবার। কিন্তু প্রশান্ত তার সেবা প্রত্যাখ্যান করেছে বারবার। এমনি রূঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় আর তমিজ একেকবার ভাবে, দূর, এর চেয়ে বরং জমিতে যাই, বিল থেকে নালা কেটে নেওয়ার কাজটা বরং এগিয়ে রাখি। কিন্তু এতো এতো মানুষ, এরকম জোড়াঘোড়ার ফিটন গাড়ি এবং ডাক্তারবাবু, কম্পাউনডার এবং সর্বোপরি তার হাতের ব্যাগের আকর্ষণ তাকে সেঁটে রাখে মণ্ডলবাড়ির সঙ্গে।
হুমায়ুনের অছিলাতেই কয়েক গ্রামের মানুষ মেয়েমানুষকে আল্লা আজ টাউনের বড়ো ডাক্তার, তার ব্রাহ্মণ কম্পাউনডার, কম্পাউনডারের হাতের ব্যাগ, জোড়া ঘোড়ার ফিটন গাড়ি প্রভৃতি এতো কাছে থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। সুতরাং হুমায়ুনের প্রতি দায়িত্ব পালনে উচাটন হয়ে তারা ভিড় জমায় রোগীর ঘরের বারান্দায়, বারান্দার নিচে উঠানে, ঘরের দরজায়, এমন কি ঘরের ভেতরে পর্যন্ত। প্রশান্ত নাকে রুমাল চেপে বলে, এ কি, তামাশা নাকি? যাও, যাও। শরাফত, আবদুল কাদের ও হরেন ডাক্তারের ধাক্কাধাক্কিতে লোর্কজন উঠানে নেমে গেলে শিশির ডাক্তার স্টেথসকোপ দিয়ে হুমায়ুনকে নানাভাবে দেখে আর যতোই দেখে ততোই গম্ভীর হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে ঠাণ্ডা চোখে সে তাকায় হরেনের দিকে। হরেন অবশ্য কাল থেকেই ভয়ে ভয়ে আছে। কাল বিকালে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলেছিলো হুমায়ুন। লুঙিতে রক্তের দাগ দেখে হামিদা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে যায় বিছানাতেই। তখনি শিশির ডাক্তারকে ডেকে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই গ্রামে শিশির সেন আজ প্রথম এলেও শরাফত মণ্ডলের ছেলেরা চিকিৎসার জন্যে টাউনে গেলে তার চেম্বারেই ধন্না দেয়। আবদুল কাদের তার মোটামুটি ভালোভাবেই চেনা। এই দুই ভাইকে বারবার নাম ধরে ডেকে ডাক্তার আজ দূরত্বটি কমিয়ে ফেলেছে। হুমায়ুনকে বাবা, বাবু, লক্ষ্মীছেলে, এইতো আমার গুডবয় বললে বাড়ির সবাই ডাক্তারের প্রতি গদগদচিত্ত হয় এবং তার ওপর নিরঙ্কুশ আস্থা পোষণ করতে থাকে।
পুবদুয়ারি ঘরে শরাফতের বড়োবিবি ডাক্তারের মুখ দেখতে না পেলেও রোগীর ঘরের আকস্মিক নীরবতা থেকে হুমায়ুনের বিপদের মাত্রা ঠিক আঁচ করে ফেলে এবং নিয়ম অনুসারে বিলাপ করতে করতে গালি দিতে থাকে শরাফত মণ্ডলকে। এই উচ্চকণ্ঠ বিলাপে প্রথমে বিব্রত ও পরে ক্ষিপ্ত হতে থাকে আবদুল কাদের। তবে মায়ের অসৌজন্যমূলক আচরণে ডাক্তার ও কম্পাউনডারের প্রতিক্রিয়া দেখতেই সে বেশি মনোযোগী ছিলো। ডাক্তারের মুখের রেখা এতোটুকু বাঁকা হয় না, কিন্তু প্রশান্ত কম্পাউনডার তার ফর্সা মুখটাকে বাঁকাচোরা করে বারবার তাকায় উঠানের ওপারে পুরদুয়ারি ঘরের দিকে এবং ডাক্তার শুনতে না পায় এমন স্বরে বিরক্তি ঝাড়ে, এরকম চাঁচালে রোগী দেখা যায়? এগুলো সব কী?
ডাক্তারবাবুকে সন্তুষ্ট রাখতে তটস্থ ছিলো আবদুল আজিজ। রোগী দেখার পর ডাক্তারবাবুর হাত ধোবার ব্যবস্থা করতে সে নিজেই বারান্দায় পানির বালতি, বদনা ও জলচৌকি নিয়ে আসে। সাবানের জন্যে ডাক্তার প্রশান্তের দিকে হাত বাড়ালে বেচারা। ব্যাগ হাতড়াতে হাতড়াতে হয়রান হয়ে পড়ে, নাঃ ব্যাগে সাবান নাই। আজকাল তার এরকম ভুল প্রায়ই হচ্ছে, বাবু এই নিয়ে কথা তুলবে টাউনে গিয়ে। প্রায় কাঁপতে কাঁপতে সে আজিজকে বলে, এদিকে দোকান নাই? সাবান পাওয়া যাবে না?
