কিন্তু আজ দুপুরবেলা থেকে তার গা গরম। রান্নাঘরে খেতে বসে কাঁপতে কাঁপতে পিঁড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছিলো, দাদী ধরে না ফেললে মাটিতে গড়িয়েই যেতো। তারপর থেকে তার প্রবল কাঁপুনি, জ্বরও বেড়ে যাচ্ছে ধা ধা করে। সকালে তাকে বারান্দার রোদে বসতে দেখে হামিদার একটু ভয় হয়, আবদুল কাদেরকে দিয়ে থার্মোমিটারে জ্বরটাও দেখিয়ে নিলো। তেমন কিছু হলে কাদের নিশ্চয়ই বলতো। এদিকে কাদের ছাড়া বাড়িতে কেউ থার্মোমিটার দেখতে জানে না। কিন্তু গায়ে হাত দিয়েই বোঝা যায় জ্বরে তার গা পুড়ে যাচ্ছে।
উঠানের ওপারে পুবদুয়ারি ঘরে শুয়েছিলো শরাফত মণ্ডলের প্রথম বিবি, আবদুল আজিজ ও আবদুল কাদেরের মা। চিরকালের নিয়ম অনুসারে বাড়িতে অসুখ দেখেই সে শয্যা নিয়েছে। জ্বরতপ্ত মানুষের মতো অবিরাম কথা বলে চলেছে এবং সেগুলোকে প্রলাপ বলে বাতিল করা যায় না। তার কথার সিংহভাগ জুড়ে তার স্বামীর নামে নানারকম নালিশ। নাতির রোগের প্রকোপ বাড়তে বাড়তে তার নালিশ চড়ে যায়–সরাসরি গালাগালির পর্যায়ে। যেমন, সারাদিন খালি জোতজমি আর সম্পত্তি তার মাথাত কুটকুট করিচ্ছে। বেটা হামার ব্যারামি ছোলটাকে গুয়্যা গেলো, তার জন্যে একটা ওষধু লয়, পথ্যি লয়, পানিপড়া লয়, পীরমুনসি লয়। জ্বর কি তোমার কামলা কিষাণ না চাকরবাকর? তুমি হুকুম করলা আর জ্বর গেলো?
উঠান পেরিয়ে বড়োবিবির নালিশ এই ঘরে এসে ধাক্কা খায় হুমায়ুনের মায়ের বিলাপের সঙ্গে, বাবা আমার, আব্বা আমার। এখন কেমন ঠেকিচ্ছে বাবা?
মায়ের ব্যাকুল ডাকে চোখ মেলে হুমায়ুন জড়িয়ে জড়িয়ে বলে, মা, আজ ডিমভাজা দিয়া ভাত দিবা না মা?
শূন্যের সঙ্গে ডিমের সাদৃশ্য থাকায় হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষার কয়েকটা দিন ছেলেকে স্কুলে যাবার সময় ভাতের সঙ্গে ডিম দেয় নি বলে আফসোসে হামিদা হাপুস নয়নে কাঁদে এবং রোগ সেরে গেলে তাকে রোজ, এমন কি এ্যানুয়াল পরীক্ষার সময়েও দুটো করে ডিম দেওয়ার মনস্থ করে। মায়ের কান্না এবং সংকল্পকে অগ্রাহ্য করে জ্বরের ঘোরের হুমায়ুন বিড়বিড় করে, আজ খালি ডিম খায়া যাই মা। ভাত খাবো না। আজ তো হাফ ইস্কুল।
এইসব এলোমেলো কথায় সবাই ঘাবড়ে যায় এবং টিনের বেড়ায় লাগানো কাঠের তাকে থার্মোমিটার খুঁজতে গিয়ে আবদুল কাদের মেঝেতে ফেলে দেয় শরাফতের মদনমঞ্জরি বড়ি আর চ্যবনপ্রাসের দুটো কৌটা এবং ওষুধ খাবার খলনুড়ি। কিছুই ভাঙে না, এমন কি কৌটাগুলোর ঢাকনিও খুলে পড়ে না। তবে কাদেরের বুকটা কাপে। অনেকটা সময় নিয়ে ভালো করে ঝেড়ে থার্মোমিটার সে গুঁজে দেয় হুমায়ুনের বগলে। তার মাথায় পানি ঢালার বিরতি ঘটে এবং এতে এই ঘরের উদ্বেগ উৎকণ্ঠা উঠান পেরিয়ে ঘা দেয় পুবদুয়ারি ঘরে। বড়োবিবি তার নালিশ ফের চড়িয়ে দেয় গালাগালিতে, এই কিপটা বুড়া কারো ব্যারাম হলে একটা পয়সাও খরচ করবি না। কঞ্জুস বুড়া পয়সা জমায় কার জন্যে? হামি কিছু বুঝি না, না? বুড়া বয়সে জোয়ান বৌ আনিছো ঘরত, তার নামে ব্যামাক সম্পত্তি লেখ্যা দেওয়ার মতলব করে। হামি বুঝি না? চান্দে চান্দে কাছারিত যায় কিসক, আমি বুঝি না? কার নামে ব্যামাক দলিল করিচ্ছে, হামি ইগলান বুঝি না? তোমার বেটাবেটি লাতিপুতি মরলে তুমি খুশি, ব্যামাক সাফ হয়া যাক, তুমি থাকো তোমার জোয়ান বৌ লিয়া!
তার অভিশাপ পৌঁছে যায় রোগীর ঘরে এবং অ বৌ, ধরো তো বলে পানির বদনা হামিদার হাতে দিয়ে ছোটোবিবি ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা হয়ে উঠানে নামে এবং দুই হাত কোমরে রেখে দাঁড়ায় পুবদুয়ারি ঘরের দিকে মুখ করে। তারপর শুরু করে তার একটানা কথা, মুখ সামলায়া কথা কও আজিজের মাও। তোমার বুড়ার সম্পত্তিত হামি প্যাশাব করি, প্যাশা করি। বলতে বলতে তার কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত সে এমনভাবে দোলায় যে মনে হয়, তার সংকল্পটি এক্ষুনি কার্যকর করতে যাচ্ছে। তবে বর্ষণ না হলেও গর্জন তার চলতেই থাকে, হামার বাপের ট্যাকা লিয়া বুড়া কতো জমি কিনিচ্ছে, সেই খবর তুমি রাখো? হামার নামে জোত করার কথা কয়া বাপজানের কাছ থাকা ট্যাকা লিয়া দলিল করে লিজের নামে। আজই বুড়া চোখ মোঞ্জে তো সম্পত্তি ভোগ করবা তুমি আর তোমার বেটাবেটি।
শরীরের রাগ ভালোভাবে ঝেড়ে ফেলে ঘরে এসে রোগীর শিয়রে বসে ছোটোবিবি কাঁসার বদনাটা ফের নিজের হাতে নেয় এবং আগের মতো একই ধারায় পানি ঢালতে থাকে হুমায়ুনের মাথায়।
কিন্তু থার্মোমিটারে জ্বর দেখে মুখ অন্ধকার করে আবদুল কাদের আড়চোখে তাকায় হামিদার দিকে, এতো পানি ঢালার পরেও ছেলেটার এতো জ্বর? বিচলিত হয়ে বড়ো বড়ো পা ফেলে খোলা থার্মোমিটার হাতেই সে চলে যায় খানকা ঘরে। সেখানে জলচৌকিতে আসরের কাজা নামাজ পড়তে বসেছে শরাফত মণ্ডল। কাদের দাড়িয়ে ছটফট করে। টের পেলেও শরাফতের নামাজের বিরাম নাই, রাকাতের পর রাকাত নামাজ সে পড়েই চলে। অনেকক্ষণ ধরে মোনাজাত করে উঠে দাঁড়িয়ে জায়নামাজ ভাজ করতে করতে শরাফত বলে, তুমি সাইলেকটা লিয়া যাও। হরেনেক সব বুঝায় বললে হরেনই সাব্যস্ত করবি; আর কোনো ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগে কি-না ওই কয়া দিবি। তবে ওক একবার লিয়া আসবা। বলতে বলতে শরাফত বারান্দায় যায়। বাইরে উঠানের আমতলায় বুলুর বেটাকে ডাংগুলি খেলার কাঠি চেঁছতে দেখে তাকে সে ধমক দেয়, এই ছেড়া, খালি খেল্যাই বেড়াস। গোরুর প্যাট ওঠে না কিসক রে? তখন দেখি বকনাটা চারির তলা চাটিচ্ছে, জাবনা কি তোর প্যাটত সান্দাছু? প্রায় একই স্বরে একটু নিচু গলায় ছেলেকে নির্দেশ দেয়, কামলাপাট লিয়া যাও। কাছারি থ্যাকা আসার সময় দেখলাম অজিত সাইকেল লিয়া পশ্চিমমুখে যাচ্ছে। কালুর বাপ না হয় ঘোড়াটা লিয়া তোমার সাথে যাক। হরেনের সাইকেল ঘরত না থাকলে ওই ঘোড়াত চড়া আসবি। হরেন আর বছরও ঘোড়াত করাই রোগী দেখবার গেছে, সাইকেল কিনলো তো উদিনকা।
