কী গো, তোমরা সব কোটে গেছো? তমিজ কোটে? কিন্তু শরাফতের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেয়ে তাকে আপ্যায়নের গুরুত্ব হুরমতুল্লার কাছে অনেক বেশি। ফের মেয়েকে ডাকতে শুরু করলে ক্লান্তি ও উত্তেজনায় তার গলার। স্বর বেরোয় না, পিঠে কাঁটা বেঁধার ঝুঁকি নিয়েও কুলগাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে সে বিড়বিড় করে, কী জ্বালা, কানোত কথা সান্দায় না। এতো ডাক পাড়িচ্ছি, কেউ আসে না।
এর মধ্যে মোষের দিঘির ওপার থেকে ফিরে আসে তমিজ, তার হাতে মাটির সানকিতে পান, শুপারি, চুন ও তামাক পাতা। শরাফত নিজেই পান সেজে মুখে দিলে তমিজ জানায়, ফুলজানের ছেলেটা খেতে বসে হঠাৎ বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলো, তার মুখের কষে ফেনা বেরিয়ে যায়। ফুলজান, নবিতন ও ফালানির সমবেত আর্তনাদ শুনে হুরমতুল্লা ও তমিজ দৌড়ে গিয়েছিলো। তমিজের বুদ্ধিতেই চার বছরের ছেলেটির মাথায় পানি ঢালা হলো অনেকক্ষণ ধরে, এখন সে অনেকটা সুস্থ, ফুলজান এখন তাকে ভাত খাওয়াচ্ছে।
কাদের বলে, বেহুঁশ হয়া গেছিলো? ভালো কথা নয় তো। তোমার নাতির না কালাজ্বর শুনিছিলাম। চিকিৎসা করাও না?
হুরমতুল্লা প্রথমে তার নসিব ও নিরুদ্দিষ্ট দায়িত্বহীন জামাইকে গালি দেয় এবং কাদের তার প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেওয়ার জন্যে তাগাদা দিলে সে তার নাতির চিকিৎসার একটি বিবরণ ছাড়ে, আর বছর লাঠিভাঙার যতীন কোবরাজের ওটি হামি লিজে যায়া বড়ি লিয়া আসিছি, ছয় আনা খচর কর্যা ওষুধ লিয়া আলাম, দুটা বড়ি খায়া আর খালো না। আর বড়িগুলান ফেরত দিবার গেলাম, কোবরাজ বড়িও লেয় না, পয়সাও দেয় না। তিন মাস আগেও পীরসাহেবের, মহাস্থানের শাহসাহেবের পানিপড়া লিয়া আসিছি দুইবার, সাড়ে চার আনা দিলাম মাজারত, আসা যাওয়ার খরচ-তাও তিন আনা চোদ্দ পয়সা,কতো হলো?
আরে থোও তোমার পানি পড়া! ওষুধ না দিলে ব্যারাম সারে? ছাইহাটার সাকিদারবাড়ির ইমান আলি সাকিদারের বেটা করিমকে দেখাও। এল এম এফ ডাক্তার, নতুন পাস করা আসিছে। নাতিক নিয়া একদিন যাও। দেরি করো না।
বাড়ির কাছে হরেন ডাক্তার থাকতে ছাইহাটা যাওয়ার দরকার কী? ডাক্তার নির্বাচনে শরাফত ছেলের পরামর্শ অনুমোদন করে না, হরেন কি আজকের মানুষ? এদিককার রোগীপত্তর তো সবই তার হাতে।
হরেন ডাক্তার অনেকদিনের লোক ঠিকই, কাদের জোর দিয়ে বলে, কিন্তু একটা মোসলমান ছেলে নতুন প্র্যাকটিস করতে বসিছে, কোয়ালিফায়েড় ছেলে, তাকে একটু হেলপ না করলে কি চলে?
কিন্তু হুরমতুল্লার নাতির চিকিৎসা সংক্রান্ত আলাপে সময় নষ্ট করা শরাফতের পক্ষে সম্ভব নয়। সে তাই তোলে পানি সেঁচার কথা, তমিজ তোর জমিত তো ফাটা ধরিছে। আর কয়টা দিন গেলে।।
তমিজ তো এই প্রসঙ্গটির জন্যেই ব্যর্থ হয়ে ছিলো। মোষের দিঘিতে কোদালের কোপ পড়তে না পড়তে কাজটা বন্ধ হয়ে গেলো, এর ভেতর হুরমতুল্লার কোনো ফন্দি আছে কি-না কে জানে? তবে হুরমত সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ ঘুণাক্ষরেও যাতে তার মুখ দিয়ে না বেরোয় সে ব্যাপারে সে খুব হুঁশিয়ার, একটু ভেবে বলে, নালা কাটা হলে আপনার ব্যামাক জমিতই ফসল ভালো হবি। আমি তো খিয়ারেত অনেক–।
না রে, মোষের দিঘি কাটা হবি না শরাফতের এই কথায় কাদেরের উত্তেজনা বাড়ে, প্রস্তুতি নিয়ে সে আরম্ভ করে, শালা জমিদাররা প্রজার ভালো দেখলে–।
তার পাকিস্তান প্রসঙ্গ আসার আগেই শরাফত তাকে থামিয়ে দেয়, তমিজকে বোঝায়, ওই দিঘি তো হামি পত্তন নেমো, বুঝছিস? আগেই নালা ক্যাটা এমন সোন্দর দিঘিটা লষ্ট করি! নালা কাটলেই বর্ষার ঘোলা পানি সান্দাবি। নায়েববাবুক সেই কথাই কবার গেছিলাম।
আবদুল কাদির হাঁ করে বাপের কথা শোনে। এখন নায়েববাবুর শয়তানির কথা চেপে যাচ্ছে দেখে বাপকেও তার দুটো কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু রাফত এখন তার দুই বর্গাচাষার সঙ্গে কালাহার থেকে নালা কাটার আলাপে নিয়োজিত। কিছু বলতে না পারায় কাদেরের রাগ তাই বেড়েই চলে, সে কেবলি থুথু ফেলতে থাকে।
১২. বালিশের নিচে মানকচুপাতা
বালিশের নিচে মানকচুপাতা দিয়ে আবদুল আজিজের ছেলের মাথায় পানি ঢালছিলো শরাফত মণ্ডলের দ্বিতীয় বিবি। হুমায়ুনের ভিজে মাথায় চুলে সে বিলি কাটছে বা হাতে। ঠাণ্ডা পানির অবিরাম ধারায় ছেলেটি চোখ বন্ধ করে রয়েছে, ঘুমিয়েও পড়তে পারে। কিন্তু শরাফত ও কাদের ঘরে ঢুকতেই সে চোখ মেললো। চোখ তার টকটকে লাল, লাল রঙে যন্ত্রণার দাগ। কাদের কথা বলতে পারে না, তার খিদাও মনে হয় মরে গেছে। শরাফতের ছোটোবিবি স্বামী ও সৎ ছেলের দিকে একবার তাকিয়েই পানি ঢালা অব্যাহত রাখে। বিছানায় ছেলের শিয়রে বসেছে আজিজের বৌ হামিদা, কিছুক্ষণ পর পর আঁচলে মুখ চেপে সে কান্না সামলাচ্ছিলো। শ্বশুর ও দেওরকে দেখে ভিজে আঁচলটা মাথায় বেশি করে চাপাতে চাপাতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে এবং ফোঁপাতে ফোঁপাতেই বলে, এই অজপাড়াগাঁয়ে ছোলেক থুয়্যা কোথায় গেলো, এখন কী করি?
অসুস্থ ছেলে এবং একমাত্র মেয়েকে বাড়িতে রেখে আবদুল আজিজ চলে গেছে কর্মস্থলে। বৌ তো তার আগে থেকেই বাড়িতে ছিলো, ভাদ্র মাসে আউশ উঠলে এসেছে, আমন ধান তোলা পর্যন্ত থাকবে। এ্যানুয়াল পরীক্ষা দিয়ে ছেলেমেয়েরা বাড়ি আসবে, এই কয়েকটা মাস মাকে ছাড়াই তাদের থাকার কথা। এখন ছোটো ছেলের ঘুসঘুসে জ্বর চলতে থাকায় তার সেবাযত্ন করা আজিজের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব কি পুরুষমানুষের কাজ? ওদিকে জয়পুরে আবার মাছ ভালো পাওয়া যায় না। এক পটলটাই যা মেলে, আবার পটল আর আলু ছাড়া আর সব তরকারি সেখানে নিরেস। বাজারের তরকারিতে কি আর স্বাদ হয়। এখানে বাড়িতে নিজেদের বিল, উঠানে হাঁসমুরগির লেখাজোকা নাই। মায়ের কোলে বসে দিন কয়েক শিংমাগুরের ঝোল আর ঘরের মুরগি আর খেতের তরকারি খেয়ে ছেলে ঝরঝরে হয়ে উঠবে,-এই ভরসাতেই আজিজ তাকে বাড়িতে রেখে গেলো। তা এখানে এসে ভালোর দিকেই তো যাচ্ছিলো। মেয়াদের জ্বর ঘণ্টা তিনেকের বেশি থাকে না, কটা দিন তো দুপুরের জ্বর আসতে আসতে আসরের ওক্ত পেরিয়ে যাচ্ছিলো। ছেলেটা দাদীর ন্যাওটা। অনেক রাত্রে জ্বর ছেড়ে গেলে মায়ের পাশ থেকে উঠে সোজা এসে শুয়ে পড়েছে দাদীর ঘরে, তার কোল ঘেঁষে। রোগ তো তার সেরেই যাচ্ছিলো, দাদী তাকে চুপচুপ করে এক দিন ইলিশ মাছের সর্ষেবাটা দিয়ে ভাতও খাইয়ে দিয়েছে। তাতেও কিন্তু জ্বর তখন তার বাড়ে নি।
