গল্প শুনে নায়েববাবু হাসে, এই গল্প শুনে লোকটা অনেকবার এমনি করে হেসেছে। তার সঙ্গে হাসে শরাফত মণ্ডল। হিন্দুদের এইসব গালগল্প সে বিশ্বাস করে না। তবে মাঝি আর কলুদের কথা আলাদা, তারা কতোটা মোসলমান তাই নিয়ে মণ্ডল প্রায়ই এটা ওটা বলে। আর তার আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও সব কেচ্ছা বলার লোকের অভাব নাই। তবে আজকাল কাত্রা টাতরা আর ওঠে না, উঠলেও কেউ দেখতে পায় কি-না সন্দেহ।
এ গ্রামবাসীর অজ্ঞতা ও কুসংস্কারে নায়েববাবু দুঃখিত হয়। নায়েববাবু বলে, আরে, মহাদেবের দিঘিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন নমশূদ্ররা চালিয়ে দেয় সন্ন্যাসীর নামে। তাঁর দুর্গার সখের দিঘিতে বেজাতের মানুষের হাত পড়া কি দেবতা সহ্য করবেন? এই পাপ কি গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙার প্রজাদের, এমন কি এদের কলকাতাবাসী জমিদারবাবুকেও স্পর্শ করবে না?
কিন্তু কাদেরকে তো শরাফত মণ্ডল সব খুলে বলতে পারে না। মাথাগরম ছেলে তার, এসব শুনে আবার কী করতে কী করে ফেলে! না বাবা, জমিদারের কোপে পড়লে কাৎলাহারের এপার-ওপার জুড়ে বিস্তীর্ণ জোত করার সাধ তার কখনো মিটবে না। নায়েববাবুকে সে চটায় কী করে? নায়েব এখন কলো নরম মানুষ হয়েছে এই মানুষের রাগ কাদের কি কিছু দেখেছে? শরাফতের বাপচাচাকে কাছারির কোনো নায়েব তুইতোকারি ছাড়া ডাকে নি। অনেক আগে শরাফতের জ্যাঠা পিয়ারুল্লা মণ্ডলকে আগের নায়েব ডাকতো শিয়ারুল্লা বলে, এই নায়েবের আমলে সে পরিচিত হলো শিয়ালু বলে এবং মরার পরও ওই নাম থেকে জ্যাঠা তার রেহাই পায় নি, তার ছেলেমেয়ে নাতি নাতনি সবার বাপদাদার নাম এখনো লেখা হয় শিয়ালু মণ্ডল। সেই লোকের ভাইপো হয়েও শরাফত নায়েবাবুর কাছে আসল নামে স্বীকৃত এবং তুমি বলে সম্বোধিত হয়। হবে না কেন? আল্লায় দিলে শরাফত কিছু জোতজমি করেছে, গিরিরডাঙায় বাপের ছনের ঘর ভেঙে টিন দিয়ে সব ঘর তুলেছে বড়ো বড়ো। তার দুই ছেলের একজন ম্যাট্রিক পাস করে সরকারি চাকরি করে, আরেকজন বছর তিনেক কলেজে পড়েছে। সব তো জমির কল্যাণেই। আর নায়েববাবুর নেক-নজরটা না থাকলে জোতজমি কি আর হেঁটে হেঁটে তার হাতে আসে?
কালাহার বিলের কাছাকাছি এসে শরাফতের হাঁটার গতি হঠাৎ করে বাড়ে এবং রাস্তা থেকে সে নেমে পড়ে ডান দিকে জমির আলে। পাকুড়তলার দিকে হাঁটা দিলে তার গতি আরো বাড়ে এবং এতে কাদেরের অস্বস্তি টের পেয়ে সে বলে, হুরমতের জমিটা দেখাই যাই। বুড়া মরিচের কী করিচ্ছে বোঝা দরকার। মুকুন্দ তোদর এবার ভালোই দিবি কলো।
বেলা হেলে পড়েছে, একটু আগে বৃষ্টি হওয়ায় আকাশ এখন মেঘশূন্য, শেষ রোদের তেজ একটু বেশি। খিদায় কাদেরের শরীর এলিয়ে পড়েছে। তার ওপর পাকুড়তলায় বড়ো বড়ো গাছের জঙ্গল, ওদিক দিয়ে এই অবলোয় হাঁটতে একটু গা ছমছম তো করেই। কিন্তু বাপ তার সিদ্ধান্ত একটা নিয়ে ফেলেছে, তাকে নড়ানো অসম্ভব।
ঝোপজঙ্গল পেরিয়ে জমির আলে আলে হেঁটে মোষের দিঘির ধারে পৌঁছে কাদের ফের চাঙা হয়ে ওঠে, বলে, এই দিঘিতে মোসলমানের কোদাল পড়লে দোষ হয়, না? নিজের কথায় তেতে উঠে সে বার করে বিকল্প উপায়, বিল কাটলেই তো হয় বাজান। বিল থেকে নালা নেওয়া যায় না? শরাফত কিছুই না বললে কাদেরের ধৈর্য থাকে না, বিল কাটলে মুনসি আবার লাফালাফি শুরু করবি না তো?
মুনসির স্বভাব নিয়ে এরকম বাঁকা কথা শরাফতের, গায়ে বেঁধে, তার একটু ভয় ভয়ও করে। তবে ছেলের প্রস্তাব সে বিবচেনা করে বৈ কি! কাৎলাহার বিল তো একরকম তার নিজের সম্পত্তিই। এই বিল ইজারা নিতে তার কম ভোগান্তি হয় নি। নায়েববাবুকে সেলামি দিতে হয়েছে দফায় দফায়, লাঠিভাঙা কাছারিতে নানা স্তরের আমলা থেকে মিষ্টি খাওয়াতে হয়েছে পাইক বরকন্দাজ সবাইকে। মনে হয় কুত্তাবিলাইও একটা বাদ পড়ে নি। কালকাতায় জমিদারবাবুকে খাওয়াবার নাম করে নায়েববাবু হাতিবান্ধার দৈ নিয়েছে হাঁড়ি হাঁড়ি। তার পৌঁছানোর খরচা পর্যন্ত জোগাতে হয়েছে শরাফতকে।-এতো কষ্টের বিল তার, জমিতে পানি সেঁচতে সেখান থেকে নালা কাটতে পারবে না কেন? কাদেরের পরামর্শটা ভালো। নালা কাটার কাজে তমিজকে মাগনা খাটানো যাবে, এই ব্যাপারে প্রথম উৎসাহটা তো তারই।
কিন্তু আমনের খেতে তমিজ নাই, পাশে মরিচের জমিতে হুরমতও নাই। আলের ওপর কুলগাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখা হুরমতুল্লার হুঁকা, পাশে তার বদনা ভরা পানি। আবার পাশের জমিতে মাঝে মাঝে কেটে রাখা আগাছার ছোটো ছোটো স্তুপ।-কিন্তু এরা গেলো কোথায়? শরাফত জমিতে মরিচের গাছের বাড় পরীক্ষা করে। এখনো কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো নিজের ঘর থেকে ছুটে আসছে হুরমতুল্লা। পথ সংক্ষেপ করতে সে উঠে পড়েছে মোষের দিঘির উঁচু পাড়ের ওপর এবং তাতে সময় লাগছে আরো বেশি। উঁচু পাড়ে উঠে সে হাঁপায় এবং হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে, ক্যা রে নবিতন, পান লিয়া আয়, পান লিয়া আয়। মেয়ের প্রতি এই নির্দেশে বেশিরকম জোর থাকায় তার গলা চিরে চিরে যায় এবং শুরু হয় কাশি। কাশির দমকে দৌড়ুবার বল পাওয়া যায় না, আবার দৌড়ুবার ফলে কাশির স্বচ্ছন্দ প্রকাশ বিঘ্নিত হয়।
হুরমত শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় শরাফতের সামনে এবং হাঁপাতে থাকে। একই সঙ্গে অনেক কথা বলার উদ্যোগ নিয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে সে ফের চাঁচায়, ক্যা রে নবিতন, কথা কানোত যায় না?
