ও হ্যাঁ, শরাফতের হঠাৎ কী মনে পড়লে কাদেরকে বলে, তুমি একটু বসো, মুকুন্দবাবুর সাথে কথাটা সারা আসি।
শরাফত মুকুন্দ সাহার আড়তের দিকে গেলেও বৈকুণ্ঠ দাঁড়িয়েই থাকে, কাদেরকে সে জিগ্যেস করে, দাদা, আপনাগোরে না সভা হবার কথা? সভাত গান হবি তো? গান না হলে সভা কিসের?
গোলাবাড়ি হাটে তখন শেষ দুপুর। বটতলায় একটি ভিখিরিনী বসে পাতা জ্বালিয়ে রান্নার আয়োজন করছে। দোকানপাট সব বন্ধ, একটি দোকানের সামনে বাঁশের মাচায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ৭/৮ বছরের একটি মেয়ে, ওই ভিখিরিনীরই মেয়ে হবে। হঠাৎ করে কার্তিক মাসের ফাজিল মেঘের ছপছপ বৃষ্টি হলেও মেয়েটির ঘুম ভাঙে না, মায়েরও রান্নার খুব একটা ব্যাঘাত হচ্ছে বলে মনে হয় না।
বৃষ্টি থামলেও শরাফতের ছাতা খোলাই থাকে, তবে রাস্তায় নেমে সে বলে, বৃষ্টি আর হবি না। বৃষ্টিরই দরকার, না হলে ফসল মার যাবি।
কিন্তু আবদুল কাদেরের মনোযোগ অন্য দিকে। সারাটা পথ ধরে সে হিন্দু জমিদারদের জুলুম নিয়ে গজগজ করে। আবার বাপের অপমানও তার গায়ে লেগেছে। জিগ্যেস করে, নায়েববাবু কি আপনার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করিছে বাপজান?
আরে না, তুমি কী কও! শরাফত ছেলের ভয়কে উড়িয়ে দিতে চাইলেও বুকের ভেতরটা একটু খচ খচ করে। নায়েববাবুর তলব এসেছিলো সকালে, শরাফত তখন চিড়াদুধকলা নাশতা করে উঠে হাত ধুচ্ছে। কাদের তখনো নাশতা করে নি, সে তার ভাইপোর জ্বর দেখছিলো থার্মোমিটারে। তখন বাড়িতে এসে হাজির হলো নায়েববাবুর খাস পেয়াদা হাতকাটা অসিমুদ্দি। অসিমুদ্দি স্পষ্ট করে কিছু বলে নি, শুধু জানালো মোষের দিঘি থেকে নালা কাটা নিয়ে নায়েববাবু কার কাছে কী শুনেছে, শরাফতের সঙ্গে তাই নিয়ে আলাপ করতে চায়। নায়েববাবুর হুকুম তামিল করতে বাপকে তড়িঘড়ি করে পিরান ও টুপি পরতে দেখে কাদের আড়চোখে তাকিয়ে বলে, হুমায়ুনের জ্বর তো আজ বেশি। হুমায়ুনের মায়ের দিকে থার্মোমিটার এগিয়ে দিয়ে সে নিজের বাকস থেকে বার করে একটা জিন্না টুপি। বাপের সামনে বিছানায় টুপি রেখে কাদের বলে, বাপজান, এই টুপি মাথাত দেন।
শরাফত কিন্তু নিজের কিস্তি টুপিটাই ফুঁ দিয়ে মাথায় চড়ালো, তবে ছেলের নতুন কেনা জিন্না টুপিটা তাকে ফিরিয়ে দিলো না, আজিজের বৌয়ের হাতে তুলে দিয়ে বললো, বাবরের মা, রাখো, বাবরের মাথাত হবার পারে।
এখন ছেলের সঙ্গে বাড়ি ফিরতে ফিরতে শরাফত মণ্ডলের মনে হয়, জিন্না টুপিটা . মাথায় থাকলে নায়েব আরেকটু হুঁশিয়ার হয়ে কথা বলতো। তা বয়স হতে হতে নায়েব এমনিতেই অনেকটা নরম হয়ে আসছে, তার কথাবার্তা আজকাল আগের চেয়ে অনেক ভালো,। আজ এতোদিন পর হঠাৎ এরকম বেঁকে গেলো কেন? মণ্ডল বেঞ্চে বসার আগেই নায়েব বলে, কী মণ্ডল, তোমার তো দেখাই পাই না। তা তোমাদের সাথে আজকাল বড়ো বড়ো মানুষের খাতির, আমাদের তো মনে হয় পোঁছেই না। আমাদের দিন শেষ হয়ে গেলো নাকি?
শরাফত চুপ করে থাকে, নায়েববাবুর কাছে এর চেয়ে অনেক খারাপ ব্যবহার সে আগে মেলা পেয়েছে। তবে আজ মোষের দিঘির পুবের জমিটা পত্তন নেওয়ার কথাটা আর তোলা যাবে না বলে সে দমে যায়।
নায়েব বলে, তোমার বেটা তো পাকিস্তানের মিটিং করে বেড়ায়। ভালো, বাপু ভালো। আমাদের এস্টেটের একটা ছেলে উঠতে পারলে আমরা খুশি। দেখো না, কাউনসিলে যেতে পারে কি-না। আবার শুনি, জমিদারি নাকি উচ্ছেদ করবে। দেখো। বাপু, জমিদারি আর ধনসম্পদ সব দুইদিনের ভোগ। কর্তাবাবু বলেন, পূর্ণ, এসব কিছুই থাকবে না। দেশটা ছোটোলোকদের অধিকারেই যাবে। কিন্তু আমার অনুরোধ, জাতটা মেরো না। জাত গেলে মানুষের আর থাকে কী?
কী যে কন বাবু, কী যে কন। জমিদারি না জাত,-কোন প্রসঙ্গে শরাফত নায়েববাবুর খেদ ও আকুতিতে সাড়া দিচ্ছে তাও পরিষ্কার করতে পারে না সে।
তোমাদেরই তো এখন দিন! মন্ত্রী বলো, উজির নাজির সবই তো তোমাদের। চাকরি বাকরি তো ভদ্রলোকের ছেলেদের জন্যে বন্ধই করে দিয়েছে। কয়টা দিন গেলে দেশে আর চাষাবাদ করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। চাষারা হ্যাটকোট পরে অফিস কাছারি করবে। তা করুক। অন্নদাতা ভগবান, জীব যখন দিয়েছেন, অন্নও তিনি জোগাবেন। কিন্তু বাপু, জাত মারার ফন্দি করলে-
এই অসমাপ্ত ব্যাক্যের জবাব শরাফত মণ্ডল দেয় কী করে? তাকে উদ্ধার করে নায়েব নিজেই। প্রথমে জানায় যে, মোষের দিঘিতে নালা কাটা শুরু করে শরাফত বিবেচনাবোধের পরিচয় দেয় নি। তারপর নায়েব হঠাৎ করে প্রশ্ন করে, মণ্ডল, তুমি তো বুড়ো হলে। এখানকার সবই তো জানো। এই দিঘি কে কেটেছে, কাটার উদ্দেশ্য কী ছিলো জানো না?
এই এলাকায় এসব আবার জানে না কে? আষাঢ়ের অমবস্যায় রাত্রি আড়াই প্রহরে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে, পাকুড়গাছ থেকে অল্প তফাতে পানিতে একটা কাত্রা ভেসে ওঠে। মণ্ডল এই গপ্পো বলতে শুরু করলে নায়েব ভুরু কোচকায়, কাত্রা? মণ্ডল। বুঝিয়ে বলে, কাত্রা মানে বলি দেওয়ার জন্যে জোড়া কাঠ। মানে–নায়েব হাত তুলে থামায়, যূপকাষ্ঠ? শব্দটির মানে জানে না বলে মণ্ডল চুপ করে থাকলে নায়েব বলে, আরে এসব তো বানেয়াট গল্প। তা বানোয়াট গল্পটাই তো এখানে ঘটে আসছিলো বহুকাল থেকে ওই কাত্রা ভেসে উঠলে সেখানে জোড়া পাঠা বলি দিয়ে শত্রুবিনাশ হয়, বিলের দুই ধারে রোগবালাই থাকে না। তা এখন আর কেউ বলি টলি দেয় না, তাই কাত্রাও বুঝি রাগ করে আর ভেসে ওঠে না।বলি দেবে কোথেকে?-বলির পাঁঠা তো কিনে আনলে চলবে না। সেই রাতে মুনসির পোষা গজারের সবগুলি ভেড়ার আকার পায় না, এক জোড়া গজার মাছকে মুনসি সেই রাতে ভাসিয়ে দেয় সাদা পাঁঠার শরীরে। কবে কয়শো বছর আগে কোন সন্ন্যাসী এদিকে এসেছিলো, মানাস নদীর তীরে লড়াই করতে করতে কোম্পানির গোরা সেপাইদের সে নাকি নিজের হাতে বলি দিয়েছিলো। শেষ পর্যন্ত সন্ন্যাসী মারা পড়ে সেপাইদের হাতেই। তা মরে গিয়ে লোকটা বছরের একটা দিন এখানে আসে, বিল থেকে কাত্রা তুলে নিয়ে মুনসির দেওয়া পাঁঠা বলি দিয়ে সে ঠাঁই নেয় পোড়াদহ মাঠের বটতলায় সন্ন্যাসীর থানে। যাবার আগে বলি দেওয়ার খাড়াটা সে ধুয়ে নেয় মোষের দিঘিতে। ওই রাতে মানুষজন এদিকে আসে না, আসা নিষেধ। কিন্তু পরদিন মোষের দিঘির মাঝখানে গোলাপি রঙের পানি ভাসতে থাকে।
