দেবতা ও জমিদার দুই জনের প্রতিই নায়েববাবুর ভয় ও ভক্তি সমানভাবে বরাদ্দ, কর্তাবাবু তো তোমাদের জন্যে সর্বদাই খুব ভাবে, বুঝলে না? তাঁর প্রজাপাটের দশ আনাই মোসলমান, তোমার জাতের মানুষ। চার আনার বেশি নমশূদ্র। তার নিজের জাতের মানুষ আর কয়জন?-এই এস্টেটে বামুন কায়েত কতো তা তো জানোই। আর কর্তাবাবুর ছেলেরা তো জাত একরকম মানেই না, তাদের খাদ্যিখাওয়া ওঠাবসা সব সায়েবদের সাথে। জমিদারতনয়দের বৈপ্লবিক জীবনযাপনে নায়েববাবু যেমন গর্বিত দেবদেবীর প্রতি তার ভক্তিও তেমনি সীমাহীন। সে বলে, কিন্তু কথাটা বোঝো, ভালো করে বুঝে দেখো। কথাটা অন্যভাবে নিও না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নায়েববাবু চোখজোড়া আধবোজা করে, মহাদেবের নিজের হাতে কাটা দিঘি, তাও কাটলেন মা দুর্গার কথায়, এই দিঘিতে ব্রাহ্মণও কোদাল বসাতে সাহস পায় না। আর অন্য জাতের হাতের কোদাল পড়লে কৈলাসনাথ সহ্য করেন কীভাবে? বলো, তুমিই বলো।
কৈলাস এখান থেকে কতো দূরে সে সম্বন্ধে শরাফতের ধারণা না থাকলেও ওখানকার বাসিন্দাদের ভক্ত নায়েববাবুকে সে ভালো করেই চেনে। আহলে হাদিস জামাতের মানুষ সে, মাঝি কলু কি হানাফি জামাতের অন্যসব মানুষের মতো হিন্দু দেবদেবীর নামে সে কখনো মানত করে না। কিন্তু ভয় একটু পায়। জমিদারের কাছারিতে বসে নায়েববাবু ও অনুপস্থিত মহাদেবের সঙ্গে বেয়াদবি করার ইচ্ছা কিংবা সাহস তার একেবারেই নাই। যতোক্ষণ ওখানে ছিলো ভয় ও ভক্তিকে সে এক মুহূর্তের জন্যে কাছছাড়া করে নি। দিঘিটা যে মহাদেবের কাটা তাও সে জীবনে প্রথম শুনলো। কোম্পানির গোরা সেপাইদের কেটে ভবানী সন্ন্যাসী তার খাড়াটা ধোবার জন্যে এই পুকুর কাটে বলে ছোটোবেলা থেকে সে গল্প সে শুনে আসছে সেটা কি তবে ঠিক নয়? তবে নায়েববাবুকে চটিয়ে তার লাভ কী? কথাটা না তুলেই সে কাছারি থেকে ফেরে।
গোলাবাড়ি হাটে ভুটিয়া ঘোড়া থেকে নেমে শরাফত এদিকে ওদিক তাকাতেই গফুর কলু ছুটে আসে কাদেরের দোকান থেকে। গফুর ঘোড়া ধরলে সে বলে, দোকানের পিছনে ছায়া দেখ্যা বান্ধ্যা রাখ। বিকালবেলা কাউকে দিয়া বাড়িত পাঠায়া দিস।
গফুরকে হুকুম দিতে দিতে কাছারির ভয়টা তার তরল হয়। দোকানের ভেতরে ক্যাশবাকসের পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কাদের। বাপকে দেখে দাড়ালো তা কিন্তু নয়। লীগের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো। তার পেছনে–টিনের দেওয়ালে সাঁটা আগামী রবিবার টাউনে মুসলিম লীগের মিটিঙের পোস্টার। পোস্টারের একেবারে ওপরে আড়াআড়িভাবে আঁকা মুসলিম লীগের নিশান, তার ওপরে লেখা, পাকিস্তান জিন্দাবাদ ও মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ। অন্য তিন দিকে টিনের বেড়ায় পুরোনো দৈনিক আজাদের ওপর গাঢ় নীল কালিতে লেখা পোস্টার। ঘরের এক দিকে টিনের বেড়া ঘেঁষে কেরোসিন তেলের টিন সাজানো, অন্য দিকে খালি টিন একটু এলোমেলোভাবে রাখা। খালি টিনগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে শরাফত গত দুইদিনের বিক্রির পরিমাণটা আন্দাজ করে নিলো।।
আবদুল কাদেরের দিকে মুখ করে দুটো বেঞ্চে গাদাগাদি করে বসেছিলো ১২/১৪ জন ছেলে, কাদের এদের সঙ্গেই কথা বলছিলো। শরাফত মণ্ডল আজকাল যখনি। দোকানে আসে এক দঙ্গল ছেলে দেখতে পায়। দিনরাত এরকম দরবার করলে ব্যবসা হবে? মণ্ডলের মেজাজটা খিচড়ে যায়, হিন্দুদের সঙ্গে লাগতে চাও;—দেখো হিন্দুর বাচ্চা কী করে ব্যবসা করে। এই তো কয়েজ গজ পরেই মুকুন্দ সাহার আড়ত, চার চালা টিনের ঘর, বাপের আমলে যেমন ছিলো তেমনি আছে, একটা টুলও বাড়ায় নি। অথচ ব্যবসা। চালাচ্ছে চুটিয়ে! আজ হাটের দিন নয়, তবু আড়তের সামনে বাঁধা ৪/৫টা ঘোড়া, আদা রসুন জিরা নিয়ে এসেছে পাইকাররা। দোকানে বসে সাহা কি কখনো আড্ডা মারে? আর কাদেরের ঘরে এতোগুলো ছোকরা, বিড়ির ধোঁয়ায় ঘর অন্ধকার। মুরুব্বি গোছের খদ্দেরদের এখানে ঢুকতে কি একটু বাধো বাধো ঠেকবে না?
তবে কিছুক্ষণের মধ্যে এই ক্ষোভ ও বিরক্তি শরাফত সামলে নেয়, তাকে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে-পড়া ছেলেদের দেখে একটু চাঙাই হয়ে ওঠে। পিপাসা না পেলেও সে তখন এক গ্লাস পানি খেতে চায়। শুধু তার জন্যেই দোকানে রাখা বড়ো কসার গ্লাস হাতে গফুরকে বাইরে টিউবওয়েলের দিকে যেতে দেখে সে বলে, এখন থাক। কাদের তখন গফুরের হাত থেকে গ্লাস নিয়ে ওটা এগিয়ে দেয় গিরিরডাঙার চাষীপাড়ার একটি ছেলের দিকে। এবার পানি খাওয়া স্থগিত রাখার দরকার হয় না শরাফতের। পানি খেয়ে আরামের নিশ্বাস ছেড়ে সে বলে, মোষের দিঘিত নালা কাটা যাবি না। ওই দিঘি বলে দেও দানবে কাটিছে, লায়েববাবু কয়, মহাদেবের লিজের হাতে কাটা দিঘি, মোসলমানে কোদাল ধরলে ঠাকুর কোদ্দ হবি।
দেবতার ক্রুদ্ধ হবার কথায় জ্বলে ওঠে কাদের, মোসলমানের ভালো দেখলেই হিন্দুর গাও জুলে। এই বাক্য তার একটু আগে বলা কথার জের হিসাবে চালানো যায়, প্রসঙ্গটি অব্যাহত রাখতে তাই তার অসুবিধা হয় না, হিন্দু জমিদার ফুটানি মারে মোসলমান প্রজার রক্ত চুষে। পাকিস্তান না হলে মোসলমানের জান মাল ইজ্জত সব বিপন্ন।
এর মধ্যে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বৈকুণ্ঠ গিরি। কাদেরের কথা সে শুনছে খুব মন দিয়ে। কাদেরের কথা শেষ হলেও সে সরে না, বরং ফের পান মুখে দেওয়ায় জর্দার গন্ধে তার অবস্থান আরো শক্ত হয়। শরাফত মণ্ডল ও কাদের বাড়ি যাবার জন্যে পা বাড়ালে বৈকুণ্ঠ এগিয়ে মণ্ডলের কাছে এসে বলে, কাকা, আপনের সাথে বাবুর কী দরকার, কী নাকি কথা আছিলো।
