বাপ তো তার কামের মানুষ। যেখানেই লাগুক, সে একাই একশো। খালি একটা কথা,কামটা তার জুত মতো হতে হবে। বিলের মধ্যে যেসব ডাঙা ফুটে উঠছে। সেখানে বর্গা করার সুযোগ পেলে তমিজের বাপ কাম দেখাতে পারে। মণ্ডল এই বিল পত্তন নেওয়ার আগে তমিজের বাপ বিলের যেখানে জাল ফেলেছে, মাছ উঠেছে সেখানেই। মানুষটার হাতে জাল ফেললেই মাছ। বিলের স্বভাবচরিত্তির তার চেয়ে ভালো জানে কে? বিলের পানি থেকে ওঠা জমিও তার বশেই থাকবে। এই যে রাতে নিন্দের মধ্যে আন্ধারে মান্দারে মাঠেপাথারে হেঁটে হেঁটে বিলে যায়, সে কি এমনি এমনি? বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছ থেকে মুনসি তাকে যদি একটু কোল দেয় তো বিলের জমিজিরেত কি তার হাতে না এসে পারে?
কিন্তু হুরমতুল্লা হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দৌড়াতে শুরু করলে তমিজের বাপ তো তমিজের বাপ, এই কালাহার বিল আর তার দুই পাশের গ্রামগঞ্জের সবার বাপ মুনসি পর্যন্ত রোদে মিলিয়ে যায়। বুড়ার হলোটা কী? মোষের দিঘির ওপারে নিজের বাড়ির দিকে মুখ করে বুড়া হাত দেখায় বিলের ওপারে পুবের রাস্তার দিকে আর উর্ধশ্বাসে চাঁচায়, ক্যা রে ফুলজান, ক্যা রে নবিতন, ক্যা রে ফালানি, দ্যাখ দ্যাখ কেটা আসিচ্ছে দ্যাখ।
গোলাবাড়ি থেকে দক্ষিণে নেমে কালাহার বিলের পুব দিয়ে মণ্ডলবাড়ি ছুঁয়ে কলুপাড়া পর্যন্ত চলে-যাওয়া রাস্তায় একটা টমটম ছুটছে। টমটমের পেছন পেছন ছুটছে এক দঙ্গল ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে। এদের বেশির ভাগের কোমরে তাবিজ আর কানাপয়সা ঝোলাবার তাগা ছাড়া শরীরের সবটাই খালি। ৪/৫টি মেয়ের পরনে কেবল গামছা, তাদের গলায় অবশ্য তাবিজও ঝুলছে। মাঝে মাঝে টমটমের চাকায় কাঠি ঠেকানোর ফলে টরররররর আওয়াজ উঠছে, ঘোড়ার খুরের শব্দের সঙ্গে সেই আওয়াজ শুনে একটু দূরের ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে বৌঝিরা, তাদের প্রত্যেক্যের কোলে একটা একটা ন্যাংটা শিশু।
টমটমের সওয়ারিকে চিনতে পারলে হুরমতের লাফালাফি ও উত্তেজনার কারণ বোঝা যায়। বিলের ওপারে স্পষ্ট নজর দেওয়া সোজা নয়। তবু টমটমের ওপর কাঁথা পেতে বসা আবদুল আজিজকে সনাক্ত করা গেলো। তার পাশে সবুজ এন্ডির ব্যাপারে জড়ানো বালকটি নিশ্চয়ই আজিজের ছেলে। তাদের উল্টোদিকের মেয়েটি আজিজের মেয়ে ছাড়া আর কে হবে? টমটমের নাগাল পেতে হুরমত দৌড় দিলো বিলের পাড়ে, কোষা নৌকা নিয়ে সে যদি ওপারে যায়ও তো গাড়ি ততোক্ষণে চলে যাবে মেলা দূর। ফিরে এসে হুরমত তাই মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে উঠে যতোটা পারে টমটমটা ভালো করে দেখতে লাগলো।
ওদিকে হুরমতের মেয়েরাও এসে দাঁড়িয়েছে দিঘির পাড়ের ওপর। বড়ো মেয়ের কোলে তামাটে হলুদ ছেলেটি ঘ্যানঘ্যান করে কেঁদেই চলেছে, টমটমের দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে তার মায়ের সবরকম চেষ্টাই একেবারে ব্যর্থ। হুরমতের ছোটো মেয়েটি নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে, কিন্তু তার বড় বোেন এক হাতে খামাখা তাকে আটকাতে গেলে ছেলেটি তার কোল থেকে একরকম গড়িয়ে নামে নিচে এবং ওখানেই বসে কাঁদতে থাকে চিষ্কার করে। কিন্তু গলার জোর একেবারেই কম, তার পেটের পিলে মনে হয় তার গলার ভেতরটাও কুরে কুরে খেয়ে ঢাউস হয়ে উঠেছে।
কোলের ছেলে নিচে নেমে পড়ায় হুরমতুল্লার বড়ো মেয়ের মুখ বুক এখন তমিজ স্পষ্ট দেখতে পায়। তামাটে রঙের গোলগাল মুখের নিচে ফুলজানের ঘ্যাগটা একটু বড়োই দেখায়। শরীরটা তার মোটা, তবে কোমর অতোটা মোটা না। সারা শরীরে শক্ত মাংস ঠাসা। এই শরীরের মেয়ে জমিতে কাজ করবে না তো করবে কে? আহাম্মুক স্বামীটা তার বুঝতে পারলো না! নইলে এই বৌকে নিয়ে সে তো জমি বর্গা চাষ করতে পারে কোনো কামলা ছাড়াই।
হাঁপাতে হাঁপাতে জমির আলে কুলগাছের নিচে ফিরে এসে হুরমতুল্লা হাঁপায় এবং হাতের কাছে পানি ভরা বদনা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের দিকে তাকিয়ে চাঁচায়, পানি লিয়া আয়। পরের মুহূর্তেই সে নির্দেশ পাল্টায়, ওটি খাড়া হয়া বেহায়ার লাকান কী দেখিস? যা, ঘরত যা।
তার হুকুম মেয়েরা পালন করলো কি-না না দেখেই হুরমত বলে, মণ্ডলবাড়িত একবার যাওয়া লাগে গো। কিসক আসলো, কী সমাচার শুন্যা আসি। ঘাড়ের গামছা দিয়ে পিঠ ও বুক মুছতে মুছতে সে টমটমের সওয়ারিদের মধ্যে আবদুল আজিজ ছাড়া আর কে কে থাকতে পারে তাই নিয়ে নানারকম অনুমান করে, অনুমানটি নিয়ে সংশয় হয় তার, তখন অনুমান বাতিল করে ও ফের নতুন অনুমানটি জানায়। টমটমে আবদুল আজিজকে বাড়ি আসতে দেখে হুরমতুল্লার এরকম উত্তেজনা তমিজের পছন্দ নয়। কিন্তু এই অপছন্দ জানানো দূরের কথা, এটিকে বেশিক্ষণ পুষে রাখাও তার পোষায় না। হুরর্মত হলো আজিজের পেয়ারের মানুষ। শরাফত মণ্ডলের বাপ এই গ্রাম থেকে বাস উঠিয়ে নেওয়ার আগে হুরমত তাদের পড়শি ছিলো, তাদের মধ্যে আত্মীয়তাও থাকতে পারে। তমিজের এই জমিটাও আজিজ হুরমতকেই বর্গা দিতে চেয়েছিলো। তার কথা, পুরানা আমলের মানুষ। পুরানা চাল ভাতে বাড়ে। কিন্তু শরাফত মণ্ডলের কী হয়েছে, বিল পত্তন নেওয়ার পর থেকে সে জমি বর্গা দিতে। শুরু করেছে মাঝিদের কাছে। এই নিয়ে আবদুল আজিজ বেশি কিছু বলতেও পারে না। হাজার হলেও সে থাকে বাইরে, গাঁয়ের খুঁটিনাটি ব্যাপার সে আর কতোটাই বা জানে? তবে হিসাবনিকাশের কাজে বড়ো ছেলের ওপর মণ্ডলের আস্থা বেশি। ফসল কাটার সময় তাকে তাই ছুটি নিয়ে একবার বাড়ি আসতেই হয়। আবদুল আজিজ মাথার ওপর দাড়ালে আধিয়াররা ফাঁকি দিতে পারে না, তাদের ফন্দিফিকির কিছুই খাটে না। কিন্তু এখন তো ধান কাটার সময় নয়। আবদুল আজিজ হঠাৎ করে বাড়ি এলো কেন? লোকটা কি তবে তাদের জমিতে জমিতে ফসলের সম্ভাবনা অনুমান করতে এসেছে? তমিজ। একটু ভাবনাতেই পড়ে মাঝির বেটা লাঙল ধরে কোথায় কী অকাম করলো তাই তদন্ত করতেই যদি সে গ্রামে এসে থাকে তো তমিজের কপালে দুঃখ আছে।
১১. মোষের দিঘি
ত্রিশূল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মহাদেব নিজের হাতে মোষের দিঘি খুঁড়েছেন এক রাতের মধ্যে। তাও আবার মা দুর্গার আবদারে। দেবমহিমায় নায়েববাবুর ঘন ভুরুতে গেরো পড়ে : এই দিঘিতে জাত-বেজাতের মানুষের হাত পড়লে ভোলানাথ আবার দ্বিতীয় একটা দক্ষযজ্ঞ করতে পারে, সেই ভাবনায় নায়েববাবু বড়ো কাতর। তার ভক্তিখচিত কাতরধ্বনি শুনতে শুনতে শরাফত সোজা হয়ে বসে চেয়ারের ওপর, মহাদেবের কিংবা তার ভক্তের বেসামাল রাগের ভয়ে তার শিরদাঁড়া একটু একটু কাঁপে।
