কিন্তু বুড়ার কাছে তমিজ কথাটা পাড়ে কীভাবে?—শুরু করা যয় তার পালিয়ে-যাওয়া জামাইকে খোজ করার পরামর্শ দিয়ে।—না, ওসব কলকাতা দিল্লি কিংবা আসাম কি জলপাইগুড়ি দিনাজপুরের কথা বাদ দাও বাপু, জামাই তোমার খিয়ারের দিকেই গেছে।—আরে, হিসাব তো সোজা।–টাউনে গিয়ে ট্রেনে চাপো, তারপর যে স্টেশনেই নামো, চোখে পড়বে খালি ধানখেত আর ধানখেত। বর্গাচাষাদের উৎপাতে অতিষ্ঠ কোনো জোতদার হুরমতের জামাইকে ঠিক কাজে লাগিয়ে দিয়েছে নিজের খাস জমিতে। আধিয়ারদের হাঙ্গামা বাড়ার পর কামলার মজুরি সেখানে বেড়ে গেছে।—কেন? মজুরি বাড়বে কেন?—কাজে অনেক ঝুঁকি নিতে হয় তো, তাই। বর্গাচাষারা সেখানে একজোট, জোতদারের মানুষদের তারা যে কোনো সময় হামলা করতে পারে। তমিজ তো ঐ এলাকা থেকেই ঘুরে এসেছে এই মাস তিনেক। তিন মাস, কিন্তু মনে হয় কালকের ঘটনা। আধিয়ারদের তাড়া খেয়ে কাটা ধান ফেলে সে দৌড় দিলো। দৌড়, দৌড়, দৌড়। তার গায়ে তীর বিধছিলো একটার পর একটা, তমিজ শুনেছে সাঁওতাল চাষারা নাকি জোতদারদের মারে তীর দিয়ে। তা তীরের খোঁচায় টিকতে না পেরে তমিজ একটা জমির আলে দাঁড়িয়েছিলো বাবলা গাছের নিচে। তা ঐ রোগা বাবলা গাছ তাকে আর আড়াল দেবে কোত্থেকে? উপায় না দেখে তমিজ তখন কাঁটাওয়ালা বাবলাডাল ভেঙে ভেঙে ছুঁড়ে মারতে লাগলো ঐ চাষাদের দিকে। কিন্তু কোন শালা কি মন্ত্র পড়ে দিয়েছে, বাবলাডাল একটার পর একটা গিয়ে লাগে। জোতদারের গায়ে। শরাফত মণ্ডলের গলার ঠিক নিচে বাবলাকাটা লেগে রক্ত বেরুচ্ছে। বাপের পেছনে দাঁড়িয়ে আবদুল আজিজ আবদুল কাদের দুই ভাই। অন্তত আবদুল আজিজের মুখ বরবার কাঁটাওয়ালা মোটা একটা বাবলাল লাগাবার জন্যে তমিজ নানাভাবে চেষ্টা করে, কিন্তু জুত করতে পারে না। তমিজ আরো ডাল ভাঙতে লাগলো। জোতদার শালা ঝাড়েবংশে হারামজাদা, শালার একোটা মাক্কুচোষা। তমিজের এতো কষ্ট, এতো মেহনত, এতো কষ্টের মেহনতের ফসল সব নিয়ে তুলতে হবে শালাদের মোটা মোটা গোলায়।-জমির আলে কুলগাছের ডাল মুঠি করে ধরায় হাতের তালুতে ও আঙুলে কাঁটা ফুটলে মাথা ঝাকিয়ে তমিজ চারদিকে তাকায়; তার পাশের জমিতে মরিচের চারা বুনে চলেছে হুরমতুল্লা। এখানে বাবলা গাছ কোথায়? খিয়ারে কাজ করতে গিয়েও তো তমিজ কখনো বাবলা গাছের ডাল ভাঙেনি। খিয়ারে চাষাদের তাড়া খেয়ে সে আবার রুখে দাঁড়ালো কবে? একদিন কেবল আধিয়ারদের হামলায় পালিয়ে এসে জোতদারের বাড়ির উঁচু ভিটা থেকে সাঁওতালদের তীর ছুঁড়তে দেখেছে। কিন্তু তাই বলে সে-ও তাদের দলে ভিড়ে যাবে কেন? তওবা, তওবা! ছি! ছি! শরাফত মণ্ডল কিংবা তার ছেলেদের গায়ে সে কি কখনো ভুলেও হাত তুলতে পারে? সে কি এতোই নেমকহারাম হয়ে গেলো যে এসব ভাবনা এসে দানা বাঁধে তার মাথায়? আবদুল কাদেরের সুপারিশে আর শরাফত মণ্ডলের মেহেরবানিতে তমিজ দিনমজুর থেকে আজ বর্গাচাষী। অথচ এই ভর দুপুরবেলা মণ্ডলেরই জমিতে দাঁড়িয়ে জেগে থেকে সে এসব কী দেখে? বাপের ব্যারাম কি তার ওপরে ভর করলো নাকি? ব্যাপারটা ভালো করে বোঝবার আগেই সে শুনতে পায় হুরমতুল্লার ডাক, ক্যা গো। ওটি খাড়া হয়া কী তামসা দ্যাখো? নিড়ানি হলো? মাটি বলে শুকনা। বানও এবার জুতের হলো না গো!
হুরমতুল্লার এই কথা ধরেই মোষের দিঘি থেকে নালা কাটার ব্যাপারটা তোলা যায়। কিন্তু একটু আগে দিব্যি জেগে জেগে দেখা বেআক্কেলে খোয়াবটা তার আসল কথাটা ভুলিয়ে দিতে না পারলেও কথার ভনিতাটা গুলিয়ে ফেলেছে। কী কথা দিয়ে যেন শুরু করার কথা ছিলো? কিছুতেই আর মনে পড়ে না। মনে পড়ে কোত্থেকে?–মাথার। ভেতরে তার কেবল দিঘি কাটা নালার পানি বইতে থাকে কুলকুল করে। পানি পেয়ে জমি তার গাঢ় সবুজ রঙের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে আকাশ জুড়ে, তমিজের সর্বাঙ্গ কাঁপে সেই হাওয়ায়। হুরমতের বুড়া গতরে তো কাঁপন উঠবে আরো বেশি। বুড়ার মরিচ খেত প্রথমে হয়ে উঠবে ঘন সবুজ। তারপর সবুজ পাতার ভেতরে পাতার সঙ্গে সবুজ মরিচের লুকোচুরি খেলা। তারও পুর সবুজ আঁচল ফেটে বেরুবে পাকা মরিচের লাল টকটকে শিখা। আহা, পাকা মরিচের সেই আগুনে-হাসি দেখে বুড়ার সব দোষ তমিজ মাফ করে দেবে। আর তখন তমিজের আমন হবে এখানে আউশ যা হয়েছিলো তার আড়াই গুণ। এতো এতো ধান তারা খাবে কততঃ দুর! আমন ধানের চিকন চাল দাঁতের ভেতর কেমন ফস্কে ফস্কে যায়, ভাত খাবার জুত হয় না। খাবার জন্যে আউশ ধানের ভাত কতো ভালো। আর অতো খাবার লালচ কেন? আমন বেচে টাকা যা পাবে সবটা পেটের ভেতরে না সেঁধিয়ে জমিয়ে রাখবে। এক জোড়া গোরু, লাঙল, জোয়াল, মই কিনতে পারলে জমি বর্গা পেতে কষ্ট হয় না। বেশি নয়, বছর তিনেক বর্গা করতে পারলে দুটো দুটো ফসল ঘরে তুলে অন্তত ১৫ শতাংশ জমি কেনার টাকা হয়। নিজেদের ভিটার লাগোয়া জমিটা মণ্ডলের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া যায় কি-না একবার চেষ্টা করে। দেখতে ক্ষতি কী? আবদুল কাদেরকে তমিজ একবার বলে দেখবে। মাসখানেক হলো। তো সে রোজই সন্ধ্যাবেলা গোলাবাড়িতে কাদেরের দোকানে যাচ্ছে, লীগের ছেলেদের সঙ্গে এদিকে ওদিক যায়, খুব জোর গলায় স্লোগান হকে। এসব দেখে কাদের নিশ্চয়ই খুশি। কাদের কি আর তার ভিটার জমিটার জন্যে বাপকে একটু বলবে না? মণ্ডল জমি যদি না-ও বেচে তো অন্তত খাইখালাসি দিক। বাপটাকে তমিজ তা হলে ওখানেই লাগিয়ে রাখতে পারে।
