তমিজের বাপের ঘুমের মধ্যে চেরাগ আলির গান কিছুমাত্র মিইয়ে যায় না, বরং ফুটতে থাকে আরো কলকল করে। ঐ শোলোক গাওয়া হয়েছিলো বৈকুণ্ঠকে লক্ষ করেই। দ্বিতীয়বার যখন গাওয়া হয় তখন বৈকুণ্ঠও গলা মেলালো তমিজের বাপের সঙ্গে। তার মনিবের ব্যবসার সম্ভাব্য লোকসান কিংবা জাপানিদের বোমা পড়ার ভয় ভুলে সে বেশ জাঁকিয়ে বসেছিলো আসন পেতে। তিন দিন আগে দেখা নিজের স্বপ্ন সে ভুলে গেছে কিংবা ঐ স্বপ্ন চলে গেছে তার নতুন কোনো স্বপ্নের আড়ালে। তমিজের বাপকে নতুন শোলোকটা বারবার গাইতে বললে তমিজের বাপ হঠাৎ খুব গম্ভীর হয়ে যায়, বেশ জোর দিয়ে বলে, বৈকুণ্ঠ, পয়সা কয়টা দিয়া দে। স্বপন তোর ভালো লয় রে।
সে কথায় কান না দিয়ে বৈকুণ্ঠ জিগ্যেস করে ফকিরকে, গানটা লতুন শুনলাম। লতুন বান্দিছো? আগে তো শুনি নাই।
গান তো হামি বান্দি না বাবা, কতোবার না তোক কছি। ইগলান হামাগোরে মাদারির গান। ইগলান পাওনা গান। হামরা পাই নাই, হামরা কি আর পাওয়ার মানুষ ইগলান পাছে আগিলা জামানার মুরুব্বিরা। চেরাগ আলির কথার মাঝখানে বৈকুণ্ঠের দিকে তাকিয়ে প্যানপ্যান করে কুলসুম, পয়সাটা দ্যাও না? তোমার জানের মায়া নাই? চার আনাই তো পয়সা। দ্যাও না কিসক?
পয়সা দিলে তোক দিমু। উদিনকা তুই যা টক আম খিলালু, তার দাম শোধ করা লাগবি না? সুদে আসলে ধরলে তোক আধুলি একটা পুরাই দেওয়া লাগে রে।
বৈকুণ্ঠের এইসব ইয়ার্কি মারা কথায় কুলসুমের রাগ হয় না, তার ভয় করে। —মানুষটার কি জানের ভয়ডর কিছু নাই? কাছেই বসে সেদিন কুলসুমের চোখের সেই ভয় দেখছিলো তমিজের বাপ। সে কি আজকের কথা গো? অথচ দেখো, শালা গিরির বেটার জন্যে কুলসুমের সেই সেদিনকার উদ্বেগ এতোকাল পর তমিজের বাপের মাথায় কুটকুট করে কামড়ায়। এই পোকাটিকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতেই সে কাত হয়ে, শোয়, তার মাথা লাগে কুলসুমের বুকে। ঐ বুকে বৈকুণ্ঠের মশারির স্বপ্ন দেখায় তার জন্যে কতোকাল আগেকার উদ্বেগের ছিটেফোঁটা রেশ আছে কি-না, থাকলেও তমিজের বাপের কানে সেটা লাগে কি-না বোঝা মুশকিল। তবে তমিজের বাপের মাথায় ও ঘাড়ে, পাতলা চুলে ও ঘন দাড়িতে কাদার গন্ধে কুলসুমের স্তনজোড়া কেবলি ফুলতে থাকে। কিন্তু তমিজের বাপের মাথায় চেরাগ আলির শোলোক বাজে শিরশির করে, শোলোকের সঙ্গে বৈকুণ্ঠ গিরি গলা মেলাচ্ছে বলেই হয়তো তার মাথার ভেতরটা ভারি হয়ে গড়িয়ে পড়ে কুলসুমের বুক থেকে। সেখানে খট খট করে বাজে শরাফত মণ্ডলের কাঠের খড়মের আওয়াজ। এই আওয়াজে মুনসির মস্ত কালো জাল কি গুটিয়ে পড়ছে নাকি? মুনসি কি কিছুই খেয়াল করে না? পাকুড়গাছে বসে মুনসি এখন করেটা কী?—একবার দেখা দরকার। মুনসিকে এক নজর দেখতে বিলের দিকে যাবার জন্যে তমিজের বাপ মাচা থেকে নামে টলতে টলতে।
১০. ভাদ্র গেলো, আশ্বিন গেলো
ভাদ্র গেলো, আশ্বিন গেলো, কার্তিক আর যায় না। আমনের বাড় এবার ভালোই; কিন্তু মাটি একটু শুকনা, ধানের গোড়ার নিচে নিচে মাটিতে চিকন চিকন রেখা। আশ্বিনের শুরুতে এই উঁচু জমিতে একটু পানি ছিলো। পানি নেমে যাবার আগে এক রাতে হুরমতুল্লা চুরি করে তমিজের আল কেটে পানি টেনে নিয়েছে নিজের জমিতে। বুড়ার জমির মাটি এখনো কেমন কালো কুচকুচে, আলে দাঁড়ালে সোঁদা গন্ধে তমিজের বুকটা ভরেও যায়, একটু জ্বলেও ওঠে। বুড়া তার জমিতে এখন মরিচের আবাদ করে।
এদিকে তমিজের জমিতে চিড় ধরার আভাস; পানির পিপাসায় জমির ঠোট একটু একটু ফাঁক হচ্ছে, ফাঁকটুকু হাঁ হতে আর কততক্ষণ?—হাঁ হলেই ধানের চারাগুলো আস্তে আস্তে হেলে পড়বে। তখন?—তখন?—নিড়ানি দিতে গেলেই তমিজের বড়ো পিপাসা পায়। হুরমতের কাছে বদনা ভরা পানি, তার কাছে পানি চাইলেই সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। তমিজ ঠিকই বোঝে, মাঝির বেটাকে নিজের বদনা থেকে পানি খেতে দিতে বুড়ার বাধো বাধো ঠেকে। পানি খেতে তমিজকে তাই যেতে হয় মোষের দিঘির ধারে। কিন্তু এখন জমির পিপাসায় তমিজের গলা কাঠকাঠ, দিঘির অতো উঁচু পাড়ে ওঠানামা করার ধৈর্য তার নাই। দিঘির পুব ধার দিয়ে হেঁটে চয়ে যায় হুরমতের ঘরের দিকে। ক্যা গো, বাড়িত কেউ আছো? পানি খিলাবার পারো? তমিজ হাঁক দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁসার বদনা হাতে এসে দাঁড়ায় হুরমতের ছোটো মেয়ে। কিন্তু তমিজ ভাবছিলো। বড়ো মেয়েটি আসবে। খুব ভোরে এসে তমিজ রোজ তাকে চুপচাপ জমি থেকে চলে যেতে দেখেছে, তার পেছনটা তমিজের একরকম চেনাই। তা মেয়েটির মুখ দেখার তাগিদ হয়তো তমিজের ছিলো। আবার আশ্বিন মাসে ওর জমি থেকে আল কেটে পানি নেওয়ার সময় বাপের পাশে দাড়িয়ে সেও কোদাল ধরেছিলো; এই সুযোগে তাকে বেশ দুটো কথা শুনিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ছোটো বোনকে দেখে তমিজের এসব আর মনে পড়ে না। তার পানির পিপাসাও তখন হঠাৎ প্রকট হয়, বদনার নল উঁচু করে ধরে সে পানি খায় ঢক ঢক করে।।
তমিজের পেছনে শুকনা কলাপাতা ঝোলানো পর্দা, পর্দার ওপার থেকে কচি কলাপাতায় এক টুকরা গুড় এগিয়ে দিলো একটা কালো হাত। কচি কলাপাতা তমিজ হাতে তুলে নিলো এবং অন্যের জমির আল কেটে পানি-চুরি-করা মন্দা কিসিমের মাগীর পর্দার বাহারকে মনে মনে গাল দিয়ে গোগ্রাসে গিলে ফেললো গুড়ের টুকরা। গুড় মুখে বদনার বাকি পানিটুকু গিলতে তার বড়ো ভালো লাগে, এবার পানির স্বাদ বেড়ে গেছে। শত গুণ। নিজের জমিতে ফিরতে ফিরতে তার ছোটো একটা ঢেকুর ওঠে, এই ঢেকুরে আখের গুড়ের গন্ধের সঙ্গে উগরে ওঠে চিনচিনে হিংসা : কার্তিক মাসে মানুষের ভাত জোটে না, আবার চাষার ঘরে দ্যাখো গুড়ের ফুটানি! বাপটা তো কিপটের একশেষ, জমির আলে কুলগাছতলায় সানকি ভরা পান্তা মরিচ দিয়ে ডলে খেতে খেতে একবার মুখের কথাটাও বলে না, ক্যা গো, খাওয়া দাওয়া হছে? আর এ কঞ্জুসের বেটি গুড়ের ফুটানি মারে। গুড় যখন দিলোই তো পর্দার বাহার দেখাবার দরকারটা কী? রাত্রিবেলা। বাপের সঙ্গে আল কেটে তমিজের জমির পানি চুরি করার সময় পর্দার বাহাদুরি ছিলো কোথায়?–তা দুই বছরের ওপর বাপের বাড়িতে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে, বাপের জমিতে কাম না করে তার উপায় কী? তমিজ সব খবরই রাখে আকালের বছর হুমতুল্লার জামাই নিজের বৌ, বছর দেড়েকের একটা বেটা আর ছয় মাসের একটা–বেটি শ্বশুরবাড়িতে গছিয়ে রেখে সেই যে ভাগলো,—বেটিটা মরলো বছর না পুরতে, পেটফোলা বেটাটার পেট দিনদিন আরো ফুলছে তো ফুলছেই, তার তামাটে মুখ রোজ রোজ হলদে হয়, চোখের হলুদ ছোপ গাঢ় হয়ে আসছে। আর খেতে না পেয়েও বৌটার পাছা হয়ে উঠছে ধামার সমান।—তা সেই মানুষটার কোনো পাত্তাই নাই। ওদিকে ঐ জামাই বেটার গায়ের আদ্দেকের বেশি মানুষ নাকি আকালে সাফ হয়ে গেছে, যারা ছিলো তাদের বাড়িঘর খেয়ে ফেলেছে যমুনা। কিন্তু হুরমতুল্লার জামাই নাকি বেঁচে থেকেই কোথাও উধাও হয়ে গেছে কেউ বলতে পারে না। হুরমত শুনেছে জামাই তার রংপুর না আসাম না কুচবিহার না জলপাইগুড়ি না দিনাজপুর কোথায় চলে গেছে, কাউকে ঠিকানা দিয়ে যায়নি। সে নাকি আবার গান লেখে; হুরমতুল্লা বলে, তার গানের এতোই চাহিদা যে গান লিখতে তাকে হয়তো কলকাতা না হয় ঢাকা না হয় দিল্লি চলে যেতে হয়েছে। তমিজ এসব বোঝে! ঐ লোকটা নির্ঘাৎ পাড়ি দিয়েছে খিয়ার এলাকায়। কামলার মজুরি ওদিকে বেশি, এই কার্তিক মাসেও সাড়ে পাঁচ আনা ছয় আনার কম নয়। কাজও পাওয়া যায় ওদিকে, মেলা কাম। জমির তদারকি ওদিকে বেশি, জমিতে ওরা মেহনতও করে খুব। খিয়ারে তো নদী একরকম নাই বললেই হয়, বড়ো বড়ো সব দিঘি আছে, দিঘি থেকে নালা কেটে ওরা জমিতে পানি সেঁচে দোন দিয়ে। কামলাপাটের নাকমুখ খুঁজে পান্তার শেষ আমানিটুকু চুমুক দিয়ে খাবার মতো জমি চুপচাপ শুষে নেয় দোনের পানি। এখানে নিজের জমিতে পানি সেঁচতে পারলে কাজ হতো। হুরমতুল্লাকে ভালো করে বোঝাতে পারলে সে-ই শরাফত মণ্ডলকে বলে মোষের দিঘি থেকে নালা কাটাবার ব্যবস্থা করতে পারবে।
