খুব ভোরে অন্ধকার থাকতে খাল পেরিয়ে গিয়ে বুলু মাঝির বাড়ির পালান থেকে আমটা কুড়িয়ে এনেছে কুলসুম। বৈকুণ্ঠের আবদেরে হুকুমে মুখটা কালো করে সে তার হাতে আম তুলে দেয়। আমের নিচের দিকটা দাঁতে কেটে বৈকুণ্ঠ চুষে চুষে খায় আর বলে, টক আম রে। টকের টক।
কুলসুম মুখ ঝামটা দেয়, হামি তোমাক সাধিছিনু? টক আম তোমাক খাবার কছে। কেটা?
তিয়াস লাগিছে রে ছুঁড়ি। এতোগুলা মুড়ি খালাম, জলতেষ্টা হবি না?
মুশকিল কি, চেরাগ আলির ঘরে বৈকুণ্ঠ জল খেতে পারে না। তার জাত তো আলাদা, পিপাসা পেলেও জাত বাঁচাতে তাকে জলতেষ্টা মেটাতে হয় আম খেয়ে।। এদের ঘরে বৈকুণ্ঠ বসতে পারে, মুড়ি খেতে পারে,-গুড় দিয়ে তো পারেই, এমন কি নুনতেল দিয়ে মাখালেও দোষ নাই। কিন্তু পারে না কেবল জল স্পর্শ করতে। জাতের দোষ হয়ে যাবে। কুলসুম আর একবার মুখ ঝামটা দিলে বৈকুণ্ঠ বলে, ভগবান জাত সিষ্টি করিছে, আমরা সিটা লষ্ট করবার পারি?
তোমার ভগবান মানষের ঘরত আম খাবার হুকুম দিছে, না? ভগবানের লালচ বেশি, পানি খাবার দিবি না, আমেত আপত্তি নাই।
উগলান কথা কওয়া হয় না, কওয়া হয় না। তোর আল্লা যা, হামার ভগবানও তাই। ফারাক খালি নামের। লয় গো ফকিরের বেটা?
আল্লা ও ভগবানের অভিন্ন সত্তা সম্বন্ধে বৈকুণ্ঠের এই সিদ্ধান্তকে ঘাড় নেড়ে অনুমোদন জানাতে জানাতে চেরাগ আলি মেঝেতে আরো কয়েকটি দাগ কাটে এবং নতুন দাগের দিকে কয়েক মিনিট চুপ করে তাকিয়ে থেকে বৈকুণ্ঠকে জিগ্যেস করে, তুই খৈ খাওয়ার স্বপন দেখলু বেনবেলা বেলা ওঠার আগে?
হুঁ। তোমাক আর কী কই, বাবু বাড়ির দিকে ঘাটা ধরিছে আত তখন লওটা বাজে। না-কি দশটাই হবি? না গো, এগারোটার কম লয়। দোকান থেকে তার মনিবের বাড়ি যাবার সময় নির্ণয় করতেই সে অনেকটা সময় নেয়। তারপর তার খলসে মাছ দিয়ে এবং পরে তালের রস আর দুধ দিয়ে ভাত খাবার বিবরণ চলে অনেকক্ষণ ধরে। তারপর হরির নাম দিয়ে শোয়া এবং নিঝুম হাটে মুকুন্দ সাহার দোকানে তার দুই চোখের পাতা কিছুতেই এক করতে না পারার কষ্ট সম্বন্ধে বলতেও তার উৎসাহের কোনো সীমা নাই। এসব খান্ত করে তারপর আসে তার স্বপ্নের প্রসঙ্গ। সকালে মুড়ি খেতে খেতে গত রাতে দেখা স্বপ্নের যে বিবরণ সে দিয়েছিলো এখন তার সঙ্গে যোগ করে মেলা খুচরা ঘটনা। এতে চেরাগ আলির কোনো বিকার নাই, বৈকুষ্ঠের নতুন নতুন সংযোজন শোনে আর মাটিতে তার দাগের সংখ্যা বাড়ে। এর মধ্যে বৈকুণ্ঠ জানায়, স্বপ্নে বৈকুণ্ঠ খৈ খেয়েছিলো মশারির ভেতরে বসে। চেরাগ আলি জানতে চায়, মনে করা কোস। মশারির মদ্যে খৈ খালৈ একরকম, ধারেত বস্যা খাস তো তার মাজেজা আলাদা। খোয়াব ঠিক মতো কবার না পারলে ফুল, খারাপ কলাম। যা দেখিছু ঠিক ঠিক বুঝা শুন্যা কবু।
চেরাগ আলির এরকম প্রশ্ন, মন্তব্য, হুঁশিয়ারি ও ধমকে উৎসাহিত হয়ে বৈকুণ্ঠ একটিমাত্র রাত্রের স্বপ্নের যে দীর্ঘ ও জটিল বিবরণ দেয় তাতে তমিজের বাপ একেবারে মুগ্ধ। কিন্তু চোখের কোণে ও ঠোঁটের বিচিত্র বাঁকাচোরায় চেরাগ আলি ওর স্বপ্নের যে মাজেজা শোনায় তাতে সবাই বোঝে, খৈ খাবার স্বপ্নে বৈকুণ্ঠের ধনদৌলত রোজগারের যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিলো, একই স্বপ্নে মশারির ভেতর ঢুকে বৈকুণ্ঠ তার বিনাশ তো ঘটিয়েছেই, এমন কি বেশ সংকটেই পড়েছে। সর্বনাশের ইংগিত পেয়ে বৈকুণ্ঠ জোরে শব্দ করে টক আমের রস একেবারে শেষ বিন্দুটুকু চুষে খায়। তার নির্বিকার চেহারায় চেরাগ আলির লম্বা দাড়িওয়ালা মুখে মেঘ নামে। মশারির স্বপ্ন আসলে কবরের ইশারা,–কথাটা বলতে বাধোবাধে ঠেকছিলো চেরাগ আলির। এটা সে সরাসরি জানায় কেবল তমিজের বাপকে, তাও তিন দিন পর গোলাবাড়ি হাটে। ওখানেই বৈকুণ্ঠকে ডেকে ফকির শুধু বললো, বৈকুণ্ঠ তোর খোয়বের মাজেজা ভালো লয় রে! পাঁচ আনা পয়সা মুনসির নামে মানত দেওয়া লাগবি। শুনে বৈকুণ্ঠ হাসলে ফকির ধমক দেয়, হাসিস কিসক রে ছোঁড়া? পয়সা কয়টা দে। বড়ো ফাড়া আছে রে তোর!
পাঁচ আনা পয়সা কম নয়। বৈকুণ্ঠ বলে, পয়সা পাই কুটি? কলকাতাত বোমা। পড়িচ্ছে, সেই খবর রাখো? হামার বাবুর বলে ব্যবসা বাণিজ্য লাটে উঠিচ্ছে, তার চোখোত নাই ঘুম। এখন হামাক পয়সা দিবি?
কলকাতায় বোমা পড়ার খবর এবং জাপানিদের অবধারিত বিজয়ের সম্ভাবনায় হাট জুড়ে সেদিন মহা উত্তেজনা, চেরাগ আলির রোজগারপাতি একেবারেই কম। বৈকুণ্ঠের কাছ থেকে একটা সিকি পেলেও সের খানেক চাল, বেগুন আর তেল নুন কেনা যায়। দরগায় গিয়ে মানত পরে দিলেও চলবে। চেরাগ আলি বলে, ছোঁড়া তুই হাসিস? মশারির স্বপন দেখা এখনো তুই হাসিস? দোতারায় টুংটাং তুলতে তুলতে সে খোয়াবে মশারি দেখার শোলোক গায়,
খোয়াবে দেখিল মুসা শয্যাতে মশারি।
শুনিয়া মজনু কান্দে আছাড়ি পিছাড়ি।।
হায় হায় নাহি মোর পুত্রের হায়াৎ।
কেমনে সহিব পুত্রবিয়োগ আঘাত।।
আজরাইলে তিন বোজ তিন রাত দিবে।
তওবা করা আসো বেটা দরগাশরিফে।।
এতোকাল পর ঘরের মেঝেতে বসে বাইরে তারার আলো-ফেলা আবছা আলোর দিকে দেখতে দেখতে তমিজের মাথামোটা মাথার ভেতরে একটানা ঢেউ ওঠে। ঢেউ ওঠে, ঢেউ পড়ে এবং অবিরাম এমনি হতে থাকলে তার চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে। মেঝেতে সানকিতে বেড়ে-রাখা ভাত ও খেসারির ডালের টান এড়িয়ে সে সটান শুয়ে পড়ে মাচার ওপরে, কুলসুমের গা ঘেঁষে শুতে না শুতে ঘুম নামলো তমিজের বাপের দুই চোখ ঝোঁপে।
