চান্দ জাগে বাঁশঝাড়ে একটা একটা ডিম পাড়ে
ভাঙা ডিমে হলুদবরণ হইলো সকল ঠাঁই।
উঁকি দিয়া চায়া দেখি ফকির ঘরত নাই।।
না গো, এ তো চেরাগ আলির গলা নয়। তার গলার স্বর তমিজের বাপের মতো এতো ভালো করে চেনে আর কে? গিরিরডাঙায় আসার পর চেরাগ আলির গান প্রায় সব সময় শুনতে সেই মানুষটা কে?-তমিজের বাপ ছাড়া আবার কে? আর থাকতো চেরাগ আলির নাতনি কুলসুম। তা কুলসুমের বয়স তখন কম। দাদার গান শুনে সে নিজেও গাইতো, কিন্তু এইসব গানের কথা বোঝার বয়স কি তখন তার হয়েছে? এখনি কি গানের ভেতরের কথা কিছু ধরতে পারে নাকি? কালাম মাঝির বাশঝাড়ের ছাপরা ঘরের ভেতর বসে গুনগুন করতে করতে মাটিতে দাগ কেটে কেটে লোকটা কতো মানুষের খোয়াবের তাবির বলতো তার আর লেখাজোকা নাই। খোয়াবের মানে খোঁজার ফাঁকে ফাকে কিংবা খোঁজার জন্যেই ফকির একটার পর একটা শোলোক গাইতো। আবার। গোলাবাড়ি হাটে দোতারা বাজিয়ে গান গেয়ে গেয়ে সে মানুষ জমাতো, মানুষজন জমা হলে শুরু হয়েছে তার স্বপ্নের বয়ান। তার রঙবেরঙের কাপড়ের তালি দেওয়া ঝোলা থেকে বার হতো হেঁড়াখোড় বই, সেই বইয়ের লেখা কি ফকির পড়তো, না-কি তার পাতায় পাতায় আঁকা চৌকো চৌকো সব রেখাগুলো শুনতো তা অবশ্য তমিজের বাপ জানে না। তবে ঐ দাগগুলো সে আঁকতো ঘরের জমিনে। দাগ কেটে কেটে সে মানুষের স্বপ্ন বুঝে ফেলতো। কতো মানুষের কতো কিসিমের খোয়াব!-গোয়াবে কেউ একটা গোরু দেখলো, গোরুটা মোটাতাজা হলে তার মানে এক রকম, আবার রোগা হলে মানে.. অন্য রকম। গোরু জবাই হতে দেখলে তাবির পাল্টে যাবে। স্বপ্নে কাউকে কুকুর তাড়া করেছিলো শুনে চেরাগ আলি হাসতো, লোকটার শত্রু জব্দ হবে। আবার শুধু কুকুর দেখা মানে কঠিন বিপদের আলামত। বাঙালি নদীর ওপারে কোনো এক গাঁয়ের এক জয়িফ বুড়া এক দিনের রাস্তা হেঁটে এসে উপুড় হয়ে পড়েছিলো চেরাগ আলির পায়ে। কী ব্যাপার?—না, সে নিজের বেটার বৌয়ের সঙ্গে জেনা করার স্বপ্ন দ্যাখে সপ্তাহে অন্তত একবার। হাজার তওবা করেও কুলকিনারা করতে না পেরে চেরাগ আলির কাছে ধন্না দেয়। তারপর ধরো কালাম মাঝির নামাজের জামাতে ইমামতি করার স্বপ্ন খুব জোরেসোরে রাষ্ট্র করা হয়েছিলো। কিন্তু কালামের অন্য অনেক খোয়াবের বৃত্তান্ত জানে। এক কালাম আর চেরাগ আলি। শরাফত মণ্ডলও গোলাবাড়ি হাটে একদিন চেরাগ। আলিকে আড়ালে ডেকে খুব গোপনে তার এক স্বপ্নের কথা বলেছিলো। তবে ফকির কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন কারো কাছে ফাঁস করে দেয়নি। বৈকুণ্ঠ তো প্রায় নিত্যি নতুন নতুন স্বপ্নের কথা শোনাতো। নিজের স্বপ্নের কথা শুধু বলেনি তমিজের বাপ। তবে তার আর দোষ কী?—আবোর মানুষ, রাতভর ঘুমের ভেতর যা দেখে আকাশ ফর্সা হলে তার কিছুই মনে থাকে না। গোলাবাড়ি হাটে বৈকুণ্ঠ ছোঁড়াটা প্রায়ই বলতো, তমিজের বাপ, তুমি কথা কও না কিসক? তুমি কী দেখিছো, কও তো? এমনিতে কথা বলতে গেলে তমিজের বাপের সব তালগোল পাকায়, স্বপ্নের কথা সে বলে কী করে? এই বৈকুণ্ঠই ফকিরের ঘরে একদিন চেপে ধরলো, তোমার আজ কওয়াই লাগবি তমিজের বাপ। তুমি বলে দরজার হুড়কা খুল্যা কোটে কোটে যাও? তোমাক ডাক দেয় কেটা, কও তো? কী স্বপন দেখ্যা তুমি বারাও? আজ তোমাক কওয়াই লাগবি।
তখন মাটিতে চৌকো চৌকো দাগ কেটে চেরাগ আলি খুঁজছিলো বৈকুণ্ঠের স্বপ্নের মানে, গুনগুন করে শোলোক বলা স্থগিত রেখে একেকবার বৈকুণ্ঠকে সে কী জিগ্যেস করে আর তাকে জবাব দেওয়ার ফাকে ফাকে বৈকুণ্ঠ খালি খোঁচায়, ক্যা গো, তমিজের বাপ, কল্যা না?
ভোতা চোখে তমিজের বাপ এদিক ওদিক দ্যাখে। অনেকক্ষণ স্থির তাকিয়ে থাকে ঘরের বাইরে। বাঁশঝাড়ের ওপারে বেগুনখেতের বেড়া ডিঙাবার চেষ্টা করে না পেরে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালাম মাঝির মাদি ছাগলটা। তমিজের বাপ ওর চোখে কী দ্যাখে? দেখতে দেখতে তার চোখ বুজে খুঁজে আসে। আগের রাতে দ্যাখা স্বপ্নটা মনে করতে সে কি কয়েক পলক ঘুমিয়ে নেবে নাকি? বৈকুণ্ঠের তাগাদায় শেষ পর্যন্ত তাকে মুখ খুলতেই হয়, কাল। বলে সে চুপ করে। কিছুক্ষণ পর স্বপ্নের ভেতর কথা বলার মতো বিড়বিড় করে, না, গো কাল লয়। ঊদিনকা! কিন্তু ঠিক কোন দিন সেটা উল্লেখ না করেই সে ফের বলে, বেনবেলা পান্তা খানু মরিচপোড়া দিয়া, না আঁইটা কলাও বুঝি আছিলো। না, কলা খাছি তার আগের দিন। কলা খাবার দিনটাও ঠিক মনে করার জন্যে সে ফের চুপ করে। কুলকিনারা না পেয়ে বৈকুণ্ঠের দিকে বোবা চোখে তাকালে বৈকুণ্ঠ হেসে ফেলে, কী হলো কও। তমিজের বাপ চমকে উঠে গড়গড় করে বলে, উদিনকা বেনবেলা খাপি জালখান লিয়া বিল গেনু। কয়টা ট্যাংরা পাওয়া গেলো, সাথে দুটা ছাতান আর একটা বেল্যা আছিলো। তমিজের বাপ থামলে তার এই সংক্ষিপ্ত স্বপ্লবয়ানে বৈকুণ্ঠ হতাশ হয়, দুর, ইটা তোমার স্বপন হবি কিসক? তুমি তো লিত্যি কালাহার বিলত যাচ্ছে। বিলত মাছ ধরো না তুমি?
শরাফত মণ্ডল তখনো বিল ইজারা নেয়নি। সুতরাং তমিজের বাপের এটা স্বপ্ন হতে যাবে কেন?
তা হলে ঐদিন রাতে সে দেখলো কী?—মাথা নিচু করে তমিজের বাপ মেঝেতে বসেই থাকে, তার তখন-পর্যন্ত-কালো দাড়ি আরো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্বপ্নের কথা ভাবতে ভাবতে তার ঘুম পায়, ঘুম ঘুম চোখে তার স্বপ্নের লেশমাত্র নাই। তার কানে ঝাপসা হয়ে বাজে, চেরাগ আলির শোলোকের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে বৈকুণ্ঠ গিরি। বৈকুণ্ঠের মুখ ভরা মুড়ি, গানের তোড়ে তার সামনে মুড়ির গুড়ার কুয়াশা। চেরাগ আলির ঘরে আসার সময় কেঁচড় ভরে সে মুড়ি দিয়ে এসেছে। তার মুড়ি খাচ্ছে সবাই,—চেরাগ আলি, কুলসুম, এমন কি তমিজের বাপও। মুড়ি খেতে খেতে আর কথা বলতে বলতে গলা কাঠ হয়ে এলে বৈকুণ্ঠ কুলসুমকে ডাকে, এ কুলসুম, তোর হাতের আমটা দে।
