তমিজের বাপের ঘুম-ভাঙা গলার এইসব ছোটো ছোটো বাক্য মনোযোগ দিয়ে না শুনলে এগুলোর মধ্যে সম্পর্ক ঠিক করা মুশকিল। তমিজের ঘুমে-ভারি মাথাতেও শমশেরের ভিটার বীজতলা কচি কলাপাতা রঙে ঢেউ খেলাতে লাগলো। এতে তার ঘুম নামে আরো কেঁপে।
কুলসুম এদিকে নিজের ঘরের দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত ঠেকিয়ে চিৎকার করে তমিজের কথার জবাব দেয়, হামি না হয় ফকিরের বেটি। তোমার বাপের জমিদারি আছে তো, আমি তাই জমি আর খন্দের বিত্তান্ত সবই শিখ্যা লেমো, না? তোমার মাও তো তামান দিন বলে মণ্ডলবাড়িতই পড়্যা থাকিচ্ছিলো। জোতদারের বাড়িত গতর খাটায়া তাই জমিজমার ব্যাক কথা শিখ্যা লিছিলো, না? ঐ বাড়িত কাম করা তাই খুব সুখে আছিলো, না? ওংকা সুখ আমি চাই না। ওংকা সুখের পাছাত হামি নাথি মারি।
তমিজের বাপ কিন্তু এর মধ্যেও শমশেরের বীজতলার কথা বলেই চলছিলো। ঘুমভাঙা ঘর্ঘর-করা পুরুষ কণ্ঠের সঙ্গে চড়া মাত্রার মেয়েলি গলা মিলে এমন আওয়াজ তৈরি হয় এবং কলাপাতা রঙের ঢেউতে তা এমনভাবে ঢেউ খেলায় যে তমিজের ঢুলুঢুলু চোখের ভেতরে ঢুকে পড়ে তাই তাকে গড়িয়ে দেয় আরো গভীর ঘুমের পরতে।
০৯. কুলসুমের গলার তেজে
কুলসুমের গলার তেজে বরং ঘুমের রেশটুকু কেটে যায় তমিজের বাপের। ঘুমিয়ে আর দিনমান শুয়ে ক্লান্ত শরীরে বৌকে ধমক দেওয়ার বলও সে পায় না। মেঝেতে বসে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকালে তারার টিমটিমে আলোয় জবুথবু বাইরের উঠানটা একটু করে বাড়ে, কিন্তু তার নিজের জবুথবু ভাব আর কাটে না। সামনের ডোবাটাও মাথা গুঁজে দিয়েছে এই উঠানের ভেতর। ডডাবায় কি ডাঙা জেগে উঠলো? তমিজ কি ডোবা-ফুড়ে-ওঠা এই ডাঙাতেও একদিন লাঙল দেওয়ার নিয়ত করে নাকি? তখন তো এটা চলে যাবে মণ্ডলের দখলে। তমিজ কি তখনো মণ্ডলের বর্গাচাষী হয়েই জীবন কাটাবে? ওদিকে কালাহার বিলে এই যে রোজ রোজ জমি জেগে উঠছে, বিল হয়তো একদিন এই ডোবার মতোই আরেকটি ছোট্টো ডোবার মধ্যে গুটিসুটি হয়ে ধুকতে থাকবে।–তমিজের বাপ জানে, এসব আসলে শালা মণ্ডলের কারসাজি। মণ্ডল মনে হয় উত্তর সিথানের পাকুড়গাছ দখলের তালে আছে। তমিজের বাপের চোখ হঠাৎ করে খচখচ করে, সেখানে কি পড়লো বোঝা যায় না। খচখচ-করা চোখের বন্ধ দুই মণির। মাঝখানে ঠাঁই নেয় কালাহার বিল। ভাদ্রের ভরা বিলে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে,তাতে তার মাথার ভেতরটা চুলকায়। হতে পারে চোখ সাফ করে চোখের কাঁটা তার পৌঁছে গেছে মাথার ভেতরে। সেখানে টনটন করে : ভাদ্রের মেঘের উল্টা টানে কা ৎলাহারের সব পানি বুঝি মেঘ হয়ে হয়ে ওপরে উড়ে যাচ্ছে। উড়তে উড়তে, রাতভর উড়তে উড়তে বেলা উঠবে, সূর্যের তাপে মেঘ আগুন হয়ে জ্বলে ঝুলতে ঝুলতে শুষে নেবে বিলের শেষ জলবিন্দুটি। তারপর আসমান থেকে আগুনের গোলাগুলো দেখবে যে, পানিহারা বিলে শরাফত মণ্ডলের বর্গাচাষীরা হাল বাইছে।–মণ্ডল যদি পাকুড়গাছ পর্যন্ত লাঙল চালায় তো কী হবে? সবটাই মণ্ডলের দখলে গেলে মুনসির পোষা গজার মাছগুলো হয়তো নতুন-ওঠা মাটির তলায় কেঁচো হয়ে কিলবিল করবে। না-কি সেগুলোকে ভেড়ার আকার দিতে না পেরে মুনসি তাদের লোহার আংটা করে গড়িয়ে নিয়ে গেঁথে রাখবে। নিজের গলার শেকলে? অতো সোজা লয়!–চেরাগ আলি বলে গেছে, চেরাগ আলির রুহে ভর করে মুনসিই জানিয়ে গেছে, গজারগুলোকে কেউ উৎপাত করলে এই দুনিয়ার ভাত তার চিরকালের জন্যে উঠে যাবে। গজার মাছের ওপর জুলুম করা অতো সোজা নয়।-তমিজের বাপের সারা শরীরে রক্ত চলাচলের গতি বাড়ে, এই চলাচলের আওয়াজ সে শোনে এইভাবে:
মুনসির হুকুম দরিয়াতে গরজিলে।
কোম্পানি সিপাহি চোক্ষে দ্যাখে আজরাইলে–
কিন্তু ফকির নাই, মুনসির হুকুম আসবে কার মুখ দিয়ে? কতোদূরে কোন কোন গাঁও, কতো চর, কলোকায়েমি চর, কতো নতুন জেগে-ওঠা বিরান চর পেরিয়ে যমুনার সাত স্রোতের টানে টানে, ঊনপঞ্চাশ ঢেউয়ের তালে তালে চেরাগ আলির গান উছলে পড়ে বাঙালি নদীর পানিতে, সেখানে কয়েকটা ড়ুব দিয়ে উঠে মানুষের জোতজমি, জোতদারদের সাথে লাঠালাঠি করা বর্গাচাষাদের রক্তে পিছলা জমির আল পেরোতে পেরোতে মুনসির গান কমজোর হয়ে গড়িয়ে পড়ে কালাহার বিলে। বিলের পানিতে হাবুড়ুবু খেয়ে উঠে এই গিরিরডাঙায় আসতে আসতে গান ঝাপসা হয়ে পড়ে। বৃষ্টিভেজা তারার আলোয় তমিজের বাপের বাড়ির খুলিতে তার ছায়া পড়ে। এই ছায়া ছায়া আলোয় ঐ গান এসেছে কার গলায় সওয়ারি হয়ে ভালো করে খেয়াল করলে ছায়াটিকে পাকুড়তলার সাদা ঘোড়া বলে ঠাহর করা যায়। সারা অঙ্গে তার দুষমনের তীর বেঁধা, সওয়ারি নেওয়ার জন্যে অস্থির সাদা ঘোড়ার গায়ের তীরের ডগাগুলো তিরতির করে কাঁপে। অতো অতো তীরের মধ্যে মুনসি বসবে কোথায় তা ভালো করে বুঝতে না বুঝতে ঘোড়া ছুটতে শুরু করে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাজিয়ে তোলে চেরাগ আলি ফকিরের গান :
চান্দ কোলে জাগে গগন পাশে বিবি নিন্দে মগন
খোয়াবে কান্দিলো বেটা না রাখে হদিস।
(ফকির) না রাখে হদিস।
(হায়রে) সিথানে পড়িয়া থাকে কার্পাসের বালিস।
দুয়ারে দাঁড়ায়ে ঘোড়া করিলো কুর্নিশ।
(ফকির) ঘোড়ায় চড়ি বাহিরিলো নাহিকো উদ্দিশ।।
এখানে কে গান করে গো? ফকির চেরাগ আলি কি ফিরে এলো নাকি? বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে তমিজের বাপ হয়তো বুঝতে পারতো, কিন্তু হাঁটু ভেঙে বসে দাড়িওয়ালা মুখটা হাঁটুর ওপর রেখে চোখ বন্ধ করে কান বন্ধ করে সে এক মনে গান শোনে :
