গিরিগণ নামে জলে : যতনে লইল তুলে
যেন কৃষ্ণ দেহ কোলে শত রাই।
পাষাণে হিরদয় বান্ধো কান্দো গিরিগণে কান্দো
ভবানী পাঠক ভবে নাই।।
খোল করতালের আওয়াজ আর সেই সুরে মেয়েটির গুনগুন গলা মেলানো বৈকুণ্ঠের কানে আবছা হয়ে আসে। তার ঘুমে-ভারি চোখে মেয়েটির মুখে মেঘের ছায়া পড়ে মুখটা কালো আর লম্বাটে হতে থাকে। তার কপালের লাল গোল চাঁদ ঢাকা পড়ে মস্ত কোনো গাছের আড়ালে। কিন্তু এতেও গুনগুন করা তার থামে না,
চান্দ জাগে বাঁশঝাড়ে বিবিবেটা নিন্দ পাড়ে
ফকির উড়াল দিলো কোনঠে দিশা নাহি পাই।
হায়রে ভবানী পাঠক ভাবে নাই।।
মেঘলা ছায়া-পড়া মুখে সেই মেয়েটি গুনগুন করতে করতে থেমে হঠাৎ করে চোখ। রাঙায় তার দিকে, হামার আম খাবার পারো, আর এটি পানি খালে তোমার জাত যায়। কি?—মেয়েটি কে গো? চেনা চেনা ঠেকে। তার দিকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলে, এ কে গো? বৈকুণ্ঠের চোখ ভরা জলে রক্ত মিশলে চোখের লাল পর্দার এপার থেকে তাকে দেখতে দেখতে আস্তে করে সে হাত দুটো বাড়িয়ে দেয় মেয়েটির দিকে। কিন্তু হাত তার এতোটুকু উঠলো না। মেয়েটিকে ঠাহর করতে বৈকুণ্ঠের বড়ো দেরি হয়ে গেছে। তার হাট করে খোলা চোখে আরো রক্ত জমলে এবং রক্ত জমতে জমতে কালচে হয়ে গেলে সবই তার আড়াল হয়ে যায়।
সকালে বৃষ্টি থামে, আকাশে মেঘ সেঁটেই থাকে। পায়ের পাতা পানিতে ড়ুবিয়ে পা। টেনে টেনে টিউবওয়েলের দিকে যেতে যেতে গফুর কলু মুকুন্দ সাহার দোকান খোলা দেখে ডাকে, ও বৈকুণ্ঠ, কি ঝড়টা হলো রে! মুখ খুয়ে বদনায় খাবার পানি নিয়ে ফেরার সময় সাহার দোকানের দরজা অমনি খোলা দেখতে পেয়ে সে ফের ডাকে, ক্যা রে বৈকুণ্ঠ। সাড়া না পেয়েও সে চলে যাচ্ছিলো, কিন্তু খোলা দরজার ঠিক ওপাশেই মরিচ আর জিরার বস্তা এলোমেলোভাবে পড়ে থাকতে দেখে সে বারান্দায় উঠে ঘরে ঢোকে। বৈকুণ্ঠের বুক আর মুখ জুড়ে জমাটবাঁধা রক্ত, সে সটান পড়ে রয়েছে মরিচের বস্তা আর জিরার বস্তার এক ধারে। তার মাথা থেকে হাতখানেক তফাতে একটা থ্যাঁতলানো মোটা ইঁদুর।
৫৩. রাতভর ঝড়ের মাতম
বৈকুণ্ঠ, এই বৈকুণ্ঠ।
রাতভর ঝড়ের মাতম, তার মধ্যে তমিজের বাপ নিজের ঘরে এসে ডাকে, বৈকুণ্ঠ। এই বৈকুণ্ঠ। এতো ডাকিচ্ছি, কানোত কথা ঢোকে না?-তমিজের বাপের হাঁকডাকের মধ্যেই তমিজের শূন্য ঘরের চালে কাঁঠালগাছের মাথাটা ভেঙে পড়লো মড়মড় করে। এখন তো বোঝাই যাচ্ছে, নিজের এতো সাধের খাজা কাঁঠালের গাছটার মাথা মটকে। দিয়ে তমিজের বাপ বৈকুণ্ঠের মরণের কথা জানান দিয়ে গিয়েছিলো। তা, এই আলামত দেখাতে বুড়াটা কুলসুমের কাছে আসে কেন? মরার পরেও মানুষটার আক্কেল হলো না। পাকুড়তলার চোরাবালি থেকে মুকুন্দ সাহার দোকান কী অনেকটা ঘাটা?
বাইরে শ্রাবণের মেঘপালানো আকাশ রোদ ঝাড়ে চড় চড় করে, ঘরে তাপ ঢোকে সেদিনকার ঝড়ে নেতিয়েপড়া চাল ফুড়ে; দরজা বন্ধ রেখেও রোদের আঁঝ সামলানো দায়। ভ্যাপসা গরমে কুলসুম না পারে বসতে, না পারে একটু শুয়ে থাকতে। এটার গন্ধ শোকে, ওটার গন্ধ শোকে। একটি গন্ধের অভাবে ঘরে তার খা খা করে : ঘরে চেরাগ। আলির খোয়াবনামা নাই। এই কেতাবের টানেই তো বৈকুণ্ঠ বারবার এসেছে তার। ঘরে। ও ফকির, দেখো তো তোমার বইখান দেখো। কী ব্যাপার?—কাল অনেক রাতে, দশটা হবি, না গো, এগারোটা, না, বারোটার কম লয়। চোখেত হামার নিন্দ আসলো ঝাপা। গাওখান চোকির উপরে ঠেকায় কেবল চোখ মুঞ্জিছি তো দেখি। বাঁশঝাড়ে ফকিরের ছাপরা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বাইরে থেকেই বৈকুণ্ঠ গতরাতে দেখা স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলতে শুরু করলে মাটিতে রেখা টানার কাঠি-ধরা উঠিয়ে চেরাগ আলি তাকে থামায়, রাখ বাপু। বোস। পরে শুনিচ্ছি।
টাউন থেকে আসা এক অসহায় মানুষের জিনে-ধরা বৌয়ের কথা শুনতে চেরাগ আলি তখন ব্যস্ত। ডাক্তার কোবরাজ হাকিম বদ্যি ব্যামাক ব্যাটা খাওয়াছে, ফল হয় নাই। এখন আসিছে হামার কাছে। দেখি হামার মুনসি কী করবার পারে।
টাউনের খদ্দের পাওয়ার দাপটে, ডাক্তার কবিরাজের ব্যর্থতার সুখে ও বৈকুণ্ঠকে দেখার খুশিতে দাদাজানের গলায় তখন ভাত উথলাবার শব্দ। সেই রোগী না-কি রোগীর স্বামী বিদায় হওয়ার আগেই বৈকুণ্ঠের স্বপ্নের আদ্দেক কাহিনী বয়ান শেষ। ফকির একটা একটা সওয়াল করে আর বৈকুণ্ঠ নিজের স্বপ্ন বাড়াবার সুযোগ নেয় যোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা। বলতে বলতে সে ঘোরের মধ্যে পড়ে, মনে হয় স্বপ্নটা যেন সে। তখনি দেখছে। মাটিতে ফকিরের কঞ্চির রেখা একটা একটা বাড়ে, সেই সাথে লম্বা হয় বৈকুণ্ঠের স্বপ্নটা। আসলে তার ছিলো ফকিরের শোলোক শোনার বাই। শোলোক শুনলে তার স্বপ্নের গল্পও পাল্টে যেতো। শোলোক শুনে-শুনেই কি-না কে জানে, চেরাগ আলিকেও সে ঠাঁই দিয়েছে তার স্বপ্নের মধ্যে। চেরাগ আলি নাকি পাকুড়গাছের মগডালে বসে মুনসির পাণ্টিখান নিতে আবদার করছে আর মুনসি রাগ করার বদলে মিটিমিটি হাসছে। যে পাণ্টি উঁচিয়ে মুনসি শাসন করে গোটা কাৎলাহার বিল, বিলের গজার মাছ যার ইশারায় পায় ভেড়ার সুরত, সেই জিনিসে হাত দিলে মুনসি সহ্য করবে?-ফকির কি তা জানে না? আসলে জেনেও সে খুশি।-কেন-না, বৈকুণ্ঠের স্বপ্নে মুনসির হাসি পড়েছে তার এই পাকা দাড়িওয়ালা মুখের ওপর।-এই খুশিতে সে মাতোয়ারা। আর সন্ন্যাসীর ঘরের এই ছোঁড়াটাই বা কেমন? দাঁত-পড়া, পাকা দাড়ি মানুষটাকে পর্যন্ত স্বপ্নে দেখে, অথচ কৈ, কোনো স্বপ্নে তো কুলসুমকে কখনো সে দেখতে পায় নি তো! বৈকুণ্ঠের খোয়াব দেখার মুরোদ কুলসুমের জানা আছে। তার ছিলো জাতের ব্যারাম। এই বাড়িতে এসে আম খেয়েছে, মুড়ি খেয়েছে, গুড় পর্যন্ত খেয়েছে আঙুল চুষে চুষে।। কিন্তু মুখে পানি তোলে নি কোনোদিন। জাতের ব্যারাম থাকলে খোয়াব আর কদুর যাবে? দেখো না, কুলসুম তাকে চেরাগ আলির খোয়াবনামাটা নিতে সাধলো। অতো, বড়ো একটা সম্পত্তি, এর টানেই তো চেরাগ আলির কাছে সে আসতো, অথচ বইটা বৈকুণ্ঠ তাকে ফিরিয়ে দিলো। কেন, ওই বই নিতে তার অসুবিধাটা কী? খোয়াবনামা থাকলে কি ঐ মাকুচোষা হারামখোর মুকুন্দ সাহার দোকানঘর এঁটো হয়ে যায়? আসলে ভুলই হয়েছে। সেদিন জোর করেই ওই বই বৈকুণ্ঠের হাতের ভেতরে একেবারে খুঁজে দিলে ঠিক হতো। বৈকুণ্ঠের বিছানার সিথানে চেরাগ আলির বই থাকলে ডাকাতরা ঘরে ঢুকে তাকে কি এমনি করে জবাই করতে পারে?–ঝড়ের রাতে ঢুকে মানুষটাকে তারা জবাই করলো! জবাই করলো!—কুলসুমের চোখের পানি সরে যায়।
