একটা মানুষ নাই। কয়টা মানুষ একত্তর হলে মশারি ছিড়ে ফেলতে কতোক্ষণ লাগে? কয়টা মানুষ জোট বাঁধলে যমুনার ফণা আটকাতে কতক্ষণ! কেউ নাই। বৈকুণ্ঠের পায়ের তলায় সন্ন্যাসীর মালিকানায় সাধারণ্যের ব্যবহারের নিমিত্ত ৭ শতক জমি দেখতে দেখতে ছোটো হয়ে আসছে; ৭ শতকের একটু একটু চেটে নিচ্ছে জলের ঢেউ। জলের ঝাপটায় বৈকুণ্ঠের পায়ের পাতা ভেজে, দেখতে দেখতে পায়ের পাতা ড়ুবে যায়, জলের ঝাপটা ছড়িয়ে পড়ে হাঁটু পর্যন্ত। জালের শোঁ শোঁ শব্দে বৈকুণ্ঠ গিরির ঘুম ভেঙে যায়।
ঘরে ঘনঘোট অন্ধকার। টিনের ফুটো দিয়ে টপটপ করে পড়া জলে ভিজে গেছে তার হাঁটু পর্যন্ত। বাইরের আওয়াজটা কি যমুনার স্রোতের না আকাশের অবিরাম ধারার, তা ধরতেও তার কেটে যায় অনেকটা সময়। একটু আগে দেখা স্বপ্ন শিরশির করে বাজে টিনের ওপর অবিরাম বৃষ্টিপাতে এবং স্বপ্ন দেখার ভয় তার বাড়তে বাড়তে স্বপ্নটা পর্যন্ত খেয়ে ফেলতে শুরু করে। তখন তার ভয় হয় : এই ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে স্বপ্নটা আবার ভুলে যাবে না তো? তা হলে চেরাগ আলি ফকিরের ঘরে স্বপ্নের মানে সে জানতে চাইবে কোন ভরসায়? স্বপ্নটার ভয়ে না কি স্বপ্ন ভুলে যাবার উৎকণ্ঠায়। বৈকুণ্ঠের খুব পিপাসা পায়। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে কুঁজো থেকে কাঁসার গেলাসে জল গড়িয়ে খেয়ে বিছানায় বসলে তার বুক ধুকধুক করে : মানষে এমন স্বপনও দেখে? এমন স্বপন দেখলে মানুষ কি বাঁচে? এই স্বপ্নের মানে কী? তখন বহুকালের ওপার থেকে শোনা যায় চেরাগ আলি ফকিরের গলা :
ফকিরে খোয়াব দেখে কালনিদ্রাবশে।
কাঁপে পানি ফাটে খাক ফোসায় আতশে।।
দুনিয়ায় যাহাদের জনম মরণ।
বুকে বল নাহি দেখে এমত স্বপন।।
হয়তো গেলাসভরা জল খেয়েই কাঁপন তার কমে। সৃষ্টির কোনো জীব যে-স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না, সেই ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখার গর্বে তার ভয় কিন্তু এতোটুকু ভোতা হয় না, বরং আরো চেপে চেপে আসে। একবার মনে হয়, এটা বোধহয় তার স্বপ্নের খোয়ারি। আরেকটা স্বপ্ন দেখলে খোয়ারি ভাঙে এই আশায় তক্তপোষ একটু সরিয়ে বৈকুণ্ঠ ফের শুয়ে পড়ে।
কিন্তু ঘুম তো আর আসে না। দরজায় চোখ পড়লে অন্ধকারেও বোঝা যায়, বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়েছে হাওয়ায়-কাঁপা কপাটের ফাঁক দিয়ে, জলের ঘঁটে ভিজে যাচ্ছে জিরার বস্তা। এমনিতে জিরা আর মরিচের অনেকগুলো বস্তা বৈকুণ্ঠ বেচে খেয়েছে, যা আছে তাও নষ্ট হলে বাবু ফিরে এসে তাকে আর আস্ত রাখবে না। বাবু আসতে দেরি করে তাকে যে কী মুসিবতে ফেলেছে। কালাম মাঝি আজ বিকালে টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যেই ঘরে ঢুকেছিলো মাঝিপাড়ার কয়েকটা ছোঁড়াকে সঙ্গে নিয়ে। খুব শাসিয়ে গেলো, মালাউন শালা, ঘর ছাড়। তোর বাবু আসার আগেই ঘরের দখল লেমো। তার সাটাসাটি শুনে গফুর কলু এলে কালাম মাঝি ঘর থেকে বেরোয়, গফুরকে বলতে বলতে যায়, শালা মণ্ডলে কতো খাবি রে? শালার প্যাট ফ্যাটা যাবি না? বৈকুণ্ঠকে কড়া করে হুকুম দেয়, বস্তা যানি আর না কমে। কয়া থুলাম।
সেই বস্তাগুলো ঠেলে সরাতে সরাতে বৈকুণ্ঠ শোনে, দরজার বাইরে কে যেন কপাট আচঁড়াচ্ছে। তুমুল বর্ষণ এই আঁচড়াবার আওয়াজটিকে ঝাপসা করে ফেললে তার মনে হয়, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে হাটের বেওয়ারিশ নেড়ি কুত্তাটা; এখানে জিরার বস্তার আড়ালে ওটাকে একটু ঠাঁই দেয় তো কার লোকসান? বাবু কি আর দেখতে আসছে নাকি? এদিকে পেচ্ছাবও চেপেছিলো বৈকুণ্ঠের। স্বপ্ন ও স্বপ্নের ভয়ে এতোক্ষণ . টের পায় নি, এখন জিরার বস্তা সরাতে তলপেটে একটু ধাক্কা লাগায় জায়গাটা টনটন। করে ওঠে। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করবে এবং নেড়ি কুত্তাটাকেও ভেতরে টেনে নেবে বলে দরজার ছিটকিনি, হুড়কো এবং বাঁশের ডাঁশা খুলতেই হুহু বাতাসে তার গায়ে লাগে বৃষ্টির ঝাপ্টা। ধুতির কোচা খোলার আগেই ভিজে চপচপে দুই জোড়া হাত দুই দিক থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেরে দেয় মেঝের ওপর।
বৈকুণ্ঠ গিরির স্বপ্ন ও স্বপ্নের ভয়ে ভারী মাথাটা পড়েছিলো মোটাসোটা একটা ইঁদুরের ওপর, আহত ইঁদুর ক্ষীণ গলায় মরণের ডাক ছেড়ে ছিটকে পড়ে একটু তফাতে।
বাবা গো! বলে বৈকুণ্ঠ চিৎকার করে উঠলে তার আর্তনাদ হারিয়ে যায় বাইরের প্রবল ঝড়ের ভেতরে। সন্ন্যাসীর ত্রিশূলের আঁকশি এড়িয়ে বাজ পড়লো বটপাকুড়ের জোড়া শরীরে, তার আওয়াজে ধরিত্রী কাঁপে। কিন্তু মুনসির পান্টিটাকে ছড় বানিয়ে চেরাগ আলি কি এই আওয়াজে নিজের জবান ফোঁটাতে পারে না? বৈকুণ্ঠ কোথাও কোনো সাড়া না পেয়ে শরীরের সব শক্তি বুকে নিয়ে প্রবল বেগে ঝাকি দিলে চারটে হাতের দুটো অন্তত একটু আলগা হয়। কিন্তু গা ঝাড়া দেওয়ার চেষ্টা করতেই হাত দুটো ফের ফিরে আসে তার গলায়, একটা হাত চেপে ধরে তার মুখ। একটি প্রাণী এর মধ্যে বসে পড়ে তার বুকের ওপর। প্রচণ্ড কষ্টে বৈকুণ্ঠ হাঁসফাঁস করে। কিন্তু হাঁসফাঁস করাটাও কঠিন হতে হতে কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ে পড়ে অসম্ভব। কষ্টের মোচন হয় তার গলার নিচে খুব ভারি ছুরির সবটাই একেবারে গেঁথে গেলে। তার মুখের ওপরকার হাত সরে যায়। বৈকুণ্ঠ তার চোখজৈাড়া মেলে যতোটা পারে খুলে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কী যে হলো, গলায় ছুরি বসার পর এতো হাট করে খুলে রাখা চোখেও সে কিছু দেখতে পায় না। বুক থেকেও ভার নেমে গেলে শরীরটা বেশ হালকা ঠেকে। চোখ তার অকেজো হয়ে গেছে, বৈকুণ্ঠের নজর তাই চলে যায় একেবারে ভেতরের দিকে। সেই নজরে ধরা পড়ে আধময়লা লালপেড়ে শাড়ি পরা মাথাভরা কালো চুলে লাল সিঁথির আলো-জ্বালানো একটি মেয়েকে। বৌটি তাকে বকে, বাবা, দিনমান কোটি কোটে ঘুরিস, কোটে বেড়াস বাবা? কার ঘরত যাস, কী কী খাস, বাড়িতে অ্যাসাই ঢুকলু ঠাকুরঘরের মধ্যে? বৈকুণ্ঠকে টেনে এনে যুবতি শাড়ির ময়লা আঁচলে তার মুখ মুছে দেয় আর বকেই চলে, খালি রোদের মধ্যে ঘোরে, খালি রোদের মধ্যে ঘোরে। ময়লা আঁচলে তার মুখ মোছে,. মুখ মোছে, তার ঘামে চটচটে মুখটা মোছে আর সেই মোছায় মোছায় বৈকুণ্ঠের মুখ ছোটো হয়ে আসে। মুখের সঙ্গে খাপ খাওয়াতেই কি-না কে জানে, ছোটো হতে থাকে। তার বুক, পেট, হাত পা, হাতের আঙুল সব। লালপেড়ে শাড়ি পরা যুবতির কোলে শুয়ে এক দৃষ্টিতে বৈকুণ্ঠ দেখে তার কপালের লাল টুকটুকে গোল চাঁদ। ময়লা আঁচলের ছায়ায় চাঁদের আলো একটু ময়লা হয়, আবার নরমও হয়। সেই আলোয় বৈকুণ্ঠের চোখে নামে চোখভরা ঘুম। ঘুমের মধ্যেই শোনা যায় তাদের সন্যাসীপাড়ার পশ্চিমে খোল করতালের বোল। এই বাজনার সঙ্গে ঠোট মেলায় ময়লা আঁচলে বুক ঢাকা মেয়েটি :
