তমিজের বাপ এলেই মেঝেতে মেলা বালু ফেলে যায়, এই ঘরে তাই কুলসুমের চোখে বালি ঝির ঝির করে। কিন্তু এখন সব বালু গলে গলে যায় বৈকুণ্ঠের রক্তের ঝাপ্টায়। ঘর তার ভরে যায় রক্তের ধোঁয়ায়। কিছু দেখা যায় না। কুলসুম তখন হাতড়ে। হাতড়ে গিয়ে ঘরের দরজা খোলে।
রোদে তার চোখের লাল লাল ঢেউ মুছে গেলে কুলসুম শোনে, কয়টা শিঙি মাছ আনিছিলাম, রাখো। ফের দরজার আড়ালে গিয়ে কেরামত আলির হাত থেকে কলাগাছের বাকলের খলুইটা নিয়ে মেঝেতে রাখে। কেরামত আলি ফের বলে, ঘরত একলা থাকো। বেওয়া মেয়েছেলের কতো বিপদ হবার পারে।
কিন্তু কাল থেকে কুলসুম রাত্রে তো আর এখানে থাকে না। কয়েকদিন থেকে কালাম মাঝিও এমনি করেই তাকে বলেছিলো, বিধবা মেয়েমানুষ, বয়সও কম, একলা থাকলে ভালো ঠেকে না, মানুষে নানা কথা কয়। আর গতকাল দুপুরবেলা কালাম একবার কিছুক্ষণ তার সঙ্গে কথা বললো, তার পরপরই কালাম মাঝির বৌ আর বুধার বেটি একরকম জোর করেই নিয়ে গেলো তাকে, ঘর তো আর তার হাতছাড়া হচ্ছে না, দিনের বেলা না হয় এখানেই থাকবে। কিন্তু এই সোমত্ত মেয়েমানুষকে রাতে তারা একা থাকতে দিতে পারে না।
দুপুরে কালাম মাঝি কিন্তু খুব নরম হয়েই কথা বলেছে, তোমার সাথে হামার বিবাদ নাই। তুমি তমিজের বাপের বেওয়া, তার মাজারেত হামি প্রতি জুম্মার দিন মৌলবিক দিয়া জিয়ারত করাই। হামার সাথে দুষমনি করিছে তমিজ, এখনো করিচ্ছে। তা তমিজ তো তোমার বেটাও লয়। তোমাক দোষ দিমু কিসক? কিন্তু একটা কথা।-কী?–মানুষ কয়, তমিজ লিত্যি তোমার ঘরত আসে। ফেরারি আসামিক তুমি ঘরত আসবার দেও কোন সাহসে? থানা থাকা পুলিস আসলে তখন আমি সামলামু ক্যাংকা কর্যা?
কুলসুম অবাক হয়ে বলে, তমিজ? তমিজ তো আসে না।
এই মেয়েকে অবিশ্বাস করা মুশকিল। কিন্তু মাঝিপাড়ার মানুষের কাণ্ডকারখানায় কালাম মাঝি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। টাউন থেকে কতো কষ্ট করে মোহাজেরদের বরাদ্দ রিলিফ নিয়ে এলো কালাম। রিলিফের কাপড় নিতে কারো কিছুমাত্র আপত্তি দেখা গেলো না। অথচ দুধের টিন যেমন এনেছিলো তেমনি পড়ে রইলো। বুধা নিজের কানে শুনেছে, ওই শালা আবিতনের বাপ,-যে-বুড়া শাড়ি নিলো, লুঙি নিলো,-খুব রাষ্ট্র করে বেড়াচ্ছে, কালাম মাঝির ওই টিনের দুধ খেলে মরণ সুনিশ্চিত। যে কি-না নিজের আত্মীয়-স্বজনকে পুলিসের হাতে তুলে দিতে পারে, পুলিসের হাত থেকে ফস্কে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে বিষ মেশানো দুধ তুলে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কী? তারপর ধরো, মাঝিপাড়ার চ্যাংড়াপ্যাংড়া যখন তখন বিলে জাল ফেলে। কালাম মাঝিকে দেখলেই জাল গুটিয়ে দৌড় দেয়, আবার আজকাল কেউ কেউ তাকে না দেখার ভান করে ধীরে সুস্থে মাছ ধরে। মানুষ মোতায়েন করে কালাম আর কতো সামলায়? আবার ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা তাকে দেখলেই একটু দূরে গিয়ে চিৎকার করে, আড় মাছে পাড় দেয়, বেলে মাছ এলে দেয়। এই কথা তো কালাম মাঝি শুনে আসছে ছছটো থেকে; পেঁকিশালে মেয়েরা ধান ভানতে ভানতে কতো কী বলতে বলতে এই শোলোকটাও গায়। কিন্তু এখন বিশেষ করে তাকে দেখে এটা একটু বদলে বলার মানে কী? তমিজের বাপের বাঘাড় মাছ কি এখন ভর করেছে মাঝিপাড়ার চ্যাংড়াপ্যাংড়ার জিভের ওপর?
আর তাদের বাপচাচাদের শয়তানি আর সহ্য করা যায় না। হাটে তার দোকানে মাঝিপাড়ার মানুষ সওদাপাতি তো করেই না, বরং দোকানের সামনে দিয়ে যেতে যেতে বলে, ওই দোকানের মাল ব্যামাক ভেজাল দেওয়া। তার নিজের বেটা টাউনের দারোগা, কিন্তু তাকে এসব কথা বললে গা করে না। তার কথা, কাদের মিয়াকে চটিয়ে সে কিছুই করতে পারবে না। এম এল এ আর মন্ত্রী মিনিস্টারের সঙ্গে তার দহরম মহরম, খুনের আসামীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতাও তার আছে। মুকুন্দ সাহার দোকান দখলের ব্যাপারেও তহসেন তাকে কিছুই সাহায্য করলো না। তবে হ্যাঁ, বলেছিলো, হিন্দু প্রপার্টি তো, একবার কোনোমতে ওদের খেদাতে পারলে দখল কায়েম রাখার বন্দোবস্ত সে করবে। তা সেটুকু অবশ্য করছে। বৈকুণ্ঠ খুন হবার পরদিন বিকালেই আমতলির পুলিস এসে দোকানে তালা ঝুলিয়ে গেলো, তার একদিন পর তহসেনের কথাতেই তালা খুলেও দিলো। দোকান থেকে গণেশের মূর্তি টুর্তি সরিয়ে সাফসুতরো করে কালাম মিলাদ দিলো, তহসেন সেখানে ঠিকই ছিলো, আবার মিলাদের পর কাদেরের দোকানে গিয়ে গল্পও করলো কিছুক্ষণ। মাঝিপাড়ার মানুষ মিলাদে হাজির ছিলো খুব কম। তবে জিলাপি দেওয়ার সময় সব শালা ভিড় করে। কিন্তু জিলাপি খেতে খেতেই যা বলে গেছে বুধার কানে গেছে সবই; বুধা বলে, মামু, তমিজ ছাড়া ইগলান কথা শালাগোরে আর কেউ শিখায় নাই। কেরামত আলিও একদিন, হয়তো মুখ ফস্কেই বলে ফেলে, অনেক রাতে সে কুলসুমের ঘরে মানুষের কথাবার্তা শুনেছে। কালাম মাঝি সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কোঁচকায়, তুমি রাত করা ওই ঘরত যাও?
জে না। ওইদিক দিয়া আসিচ্ছিলাম, তো শুনি তমিজের বাপের ঘরত মানুষ কতাবার্তা কচ্ছে।?
কেটা? কথা কচ্ছিলো কেটা? কী কথা হচ্ছিলো?
সরল গদ্যে তমিজের একটা কাহিনী বাধতে কেরামত তৈরী ছিলো, কিন্তু কী বললে আবার কী দোষ হয় ভেবে সে চেপে যায়। শুধু জানায়, না। হামি আর খাড়া হলাম না।
সেদিন দুপুরবেলা কুলসুমের কথা কালাম মাঝি অবিশ্বাস করে নি, তবে ফের জিগ্যেস করে, তুমি কল্যা তমিজ আসে না। তা হলে রাত কর্যা তুমি কথা কও কার সাথে মেলা মানুষ শুনিছে, এটি কথাবার্তা হয়।
