জি, ইসমাইল ভায়ের শ্বশুরের বংশই। মেয়ের বাপকে আপনে চেনেন। আজহার তালুকদার। পুরানা ঘর।
আর পুরানা ঘর! এখন টাকা হলে পুরানা ঘর বংশ সব কেনা যায়।
মনটা একটু ছোটো হয়ে গেলেও কাদের হাত জোড় করে আরজি করে, এম টি হোসেন সাহেব তকলিফ করে তাদের সঙ্গে মেয়ের বাড়িতে যদি একটু তশরিফ নেয় তো কাদের একজন খানদানি, বিচক্ষণ ও বিবেচক মুরুব্বি পায়। তার বাবা শরাফত মণ্ডল নিজে এসে তাকে নিয়ে যাবে। সব মিলিয়ে ঘণ্টাখানেকের ব্যাপার।
এম টি হোসেন এক কথায় রাজি হলে আবদুল কাদের তাদের মজহাবের। রেওয়াজের বাইরে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে কদমবুসি করে এবং তার স্বভাবের বাইরে তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। চোখের সঙ্গে সঙ্গে কানেও পানি জমে থাকতে পারে, কারণ এর পর ঐ সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের কোনো কথাই সে শুনতে পায় নি।
বাড়ির গেটে কামিনী গাছের গোড়ায় তমিজকে বসে থাকতে দেখেও কাদেরের আবেগ উথলে ওঠে, তমিজ, এটি আছিস, ভালো করা থাক। ইসমাইল ভাইয়ের বাপ তো ফেরশতার লাকান মানুষ রে। এংকা মানুষ হয় না। হুশিয়ার হয়া থাকিস। দেখি। তোর নামে মামলাটা খারিজ করার চেষ্টা তো করিচ্ছি। ইসমাইল ভাই ঢাকা থ্যাকা আসুক। আর শোন। এটা রাখ। পকেট থেকে আস্ত একটা আধুলি তমিজের হাতে দিতে গিয়েও ফিরিয়ে নেয়, না। এটা আমার কাছে থাক। পাকিস্তানের নয়া আধুলি। হুকুমতে পাকিস্তান কিছুদিন আগে নতুন টাকা ছেড়েছে, আস্তে আস্তে পুরোনো টাকা তুলে নেওয়া হবে।
মুগ্ধ চোখে চকচকে আধুলিটা দেখে পকেট রেখে কাদের তমিজের হাতে তুলে দেয় দুটো সিকি, কি ভেবে ফের একটা দুআনিও খুঁজে দিলো।।
লুঙির কোচড় থেকে তমিজ বার করে পাঁচ টাকার একটা আস্ত নোট; সেই নোট আর রেজকি গুনে কাদেরকে দিতে দিতে বলে, আগে আপনার কাছে রাখিছিলাম তিন আনা কম সাত টাকা, আবার এখন আপনে দিলেন দশ আনা, আবার হামি এখন দিচ্ছি আট টাকা ছয় আনা,কতো হলো? সাতে আটে পনেরো আর ওদিকে।
হিসাবটা কাদের তাড়াতাড়ি করতে চায, পনেরো টাকা এগারো আনা।
ক্যাংকা কর্যা? তমিজ ফের প্রথম থেকে যোগ করে এবং যোগফল কাদেরের হিসাবের সঙ্গে মিলে গেলে নিশ্চিন্ত হয়, হুঁ, পনেরো ট্যাকা এগারো আনা। আপনে আর পাঁচ আনা পয়সা দিলে ষোলো ট্যাকা সই সই হয় ভাইজান!
কাদের সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাঁচ আনা দিলে সেটাও কাদেরের কাছে রেখে তমিজ বলে, আর বেশি লাগবি না। কিছু জমলেই বাড়ির ভিটাটা কালাম মাঝির কাছ থ্যাকা খালাস করবার পারি। ফুলজানের বাপ জবান যখন দিছে, জমি তো তার দেওয়াই লাগবি। ঐ জমিত দুইটা খন্দ করবার পারি তো ভিটার পিছনের জমিটা আপনাগোরে কাছ থ্যাকা লিবার পারি, না? আপনে কলেই ওটা পাওয়া যাবি ভাইজান। হামার ঐ জমিত আমন হবি খুব ভালো, উঁচু জমি। কয়টা খন্দ করলেই–।
যাই রে। তুই থাক।। কাদের যাবার জন্যে পা বাড়ালে তমিজ ফের বলে, ঐ ট্যাকা থ্যাকা আপনে দুইটা ট্যাকা ফুলজানের হাতোত দিয়েন। আর টাউনের বাজার থ্যাকা হামার বেটির একটা পিরান লিবেন দশ আনার মধ্যে। তাহলে আর কতো থাকে?
তোর বেটি হছে নাকি? এতো বড়ো একটা খবর কাদের জানতো না বলে তমিজ এতোটাই অবাক হয় যে, তার পেটের মধ্যে বুদবুদ-ােলা বেটিটাক চোখের দেখাও দেখবার পারলাম না। কী খায়, কী পরে-কথাগুলো পেটের আরো ভেতরে ড়ুবে যায়, গলা পর্যন্ত আর আসে না। এর বদল বেরিয়ে আসে, বেটির পিরান দশ আনা আর ফুলজানের হাতোত দিলেন দুই ট্যাকা, না আবোরা আট আনা দেওয়া ভালো। কতো হলো?-–
কিন্তু কাদেরের বড়ো তাড়া। বাপ বোধহয় তার এসেই পড়েছে আজিজের বাড়িতে। তাকে নিয়ে দুপুরের পর পরই ফের আসতে হবে এখানে। তারপর মেয়ে দেখতে নামাজগড় যাওয়া। রূপমহল থেকে শরাফত আংটি একটা কিনেছ। মিষ্টি নিতে হবে ভালো দেখে, পরিমাণেও বেশি হওয়া চাই—শিমুলতলার তালুকদারদের বাড়ি। মেয়ের গায়ের রঙ শ্যামলা শুনে কাদেরের মন উঠছিলো না, শ্যামলা বলা মানে কালোই। কিন্তু শরাফত মণ্ডল একেবারে পাগল হয়ে উঠলো; ঐ বাড়ির কালো কেন, খোড়া কানা মেয়েও ঘরে নিয়ে এলে জেলার পুব এলাকার সবখানে তার ইজ্জত বাড়ে। আজহার মিয়া একটু দূরের হলেও তালুকদার বংশেরই তো। বিয়েতে, আকিকায়, ঈদে, বকরিদে, জানাজায় দাফনে সবাই মিলিত হয়। তালুকদারদের সাজানো গোছানো গোরস্তানেও এদের সমান হিসা্য। তা কাদের দেখলো, বাপকে আর এই নিয়ে চটিয়ে। লাভ কী? নামাজগড়ে আজহার মিয়ার মাটির দোতলা বাড়িটা এই মেয়েই পাবে শুনে আপত্তি করার আর কোনো কারণই থাকলো না। আবার বিয়েটা হলে ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে লতায় পাতায় একটা কুটুম্বিতাও হয়।
বাপজান বোধহয় টাউনে এসেই পড়লো। তমিজের হিসাবনিকাশ কাদেরের কানে ঢোকে না। তবে এম টি হোসেনের প্রতি টইটম্বুর ভক্তির খানিকটা সে খালাস করে তমিজের জন্যে উদ্বেগ জানিয়ে, তমিজ, একটা কথা কই। আজ বাপজান এই বাড়িত আসবি, আসরের নামাজ পড়বি এটি অ্যাসা। ইসমাইল ভায়ের বাপ দাওয়াত করলো, না আসলে বুড়া মানুষটা মন খারাপ করবি। বাপজান আসলে তুই আড়ালে থাকিস। তোক এটি দেখলে আমার সাথে সাটাসাটি করবি। বাপজানেক তো চিনিস।
তমিজ তার হিসাব করেই চলে, ধরেন বেটির পিরান না হয় বারো আনা দিয়াই কিনলেন আর ফুলজানকে ট্যাকা দিলে আপনের কাছে জমা থাকে কতো? আর কয়টা ট্যাকা হলে ভিটার জমিটা খালাস করি। আর আপনে ভালো করা বুঝায়া কন তো আপনার বাপজান। হিসাব নিকাশের নিষ্পত্তি না করেই কাদের রওয়ানা হয় আজিজের বাড়ির দিকে।
৫২. বটতলার সন্ন্যাসীর থানে
বটতলার সন্ন্যাসীর থানে থির থাকা যাচ্ছে না; পোড়াদহের মাঠ ধসে পড়েছে বাঙালি নদীর স্রোতের টানে। এই রোগা নদীর জলে এতো ধার শানায় কে গো? মরা মানাস কি হঠাৎ করে জেগে উঠে উপচে পড়ছে বাঙালি নদীতে? বৈকুণ্ঠের ঠাকুরদার ঠাকুরদা, তারও বাপ, নাকি তার ঠাকুরদা এখানে এসেছিলো ভবানী পাঠকের সঙ্গে, মানাস নদী কি সেই তখনকার গতর, তখনকার তেজ ফিরে পেতে পাগল হয়ে উঠেছে? না-কি সেই সময়কার রোগা পটকা কোপাখাল যমুনা ভূমিকম্পের ধাক্কায় মস্ত যমুনা নদী হওয়ার দেমাকে আরো চওড়া হওয়ার স্পর্ধায় বাঙালি নদীর রোগা স্রোতকে খেয়ে ফেলতে চলে এসেছে পোড়াদহ মাঠ পর্যন্ত? মাগী এখন লকলকে জিভটা তোর বাড়িয়ে দিয়েছিস তোর বাপ, বাপ কি রে শালী, তোর বাপের বাপ, তার ঠাকুর্দা সন্ন্যাসীর থানের দিকে। খানকিটার আস্পর্ধা দেখো। কিন্তু তাকে ঠেকায় বৈকুণ্ঠের সাধ্য কী? মাথার ওপর তার মশারি, সে দাঁড়িয়ে পড়ায় মশারির ছাদ ঠেকেছে তার মাথায় এবং হাত বুক পেট কোমর ঊরু ঢেকে সেটা ঝুলছে তার হাঁটু অব্দি। মুখেচোখ তার সব ঢাকা পড়ায় আশেপাশে সে কিছুই দেখতে পায় না; চোখজোড়া যতোটা পারে ধারালো করে চারদিকে এদিক ওদিক ঘুরিয়েও নজরে পড়ে না একটি জনপ্রাণী। মাথার ওপর সন্ন্যাসীর বটবৃক্ষ, তার সঙ্গে জড়ানো পাকুড়গাছ। কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানের পাকুড়গাছ তা হলে উড়াল দিয়ে শেকড় ঢুকিয়ে দিয়েছে বটবৃক্ষের গায়ে গা ঠেকিয়ে? বটপাকুড়ের দম্পতির পাতায় পাতায় ভবানী পাঠকের মন্ত্রের ধ্বনি। মশারি পেরিয়ে সেই সমস্কৃত মন্ত্রের একটু খানি বোলও তো বৈকুণ্ঠের মাথায় ছুঁতে পারে না। চারদিকে কেউ নাই। মেলা কি তবে ভেঙে গেছে অনেক আগেই? না-কি নায়েববাবু মা দুর্গাকে পিতিষ্ঠা করবে বলে মেলা বন্ধ করার হুকুম জারি করে দিলো? না-কি শরাফত মণ্ডলের ভয়ে তার আত্মীয়স্বজন মেলায় আসতে সাহস পায় না?
