আবদুর কাদের রাগ করলেও হেসে ফেলে, তোর বাপু এতো কথাও মনে থাকে? তোক এম এল এ করা লাগে। কাদের হো হো করেই হাসে। হাসিটা তার এখনো ইসমাইল বা ইয়াকুব বা এদের বাপের মতো অতোটা উচ্চকণ্ঠ না হলেও বেশ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সেই খানদানি হাসির অনুশীলন করতে করতেই জানায়, দুই বছর আগে এ্যাসম্বলিতে জমিদারি উচ্ছেদের বিল উঠলে বর্গাদারদের সম্বন্ধে ঐ ধরণের একটা কথা ছিলো। ঐ বিল তো আবার উঠিছে, এই তো কয়দিন আগেই উঠলো। এবার বর্গদারের বথা বাদ দিছে।
বাদ দিছে? তমিজের হাত থেকে মিহি করে সার মেশানো মাটি পড়ে যায় ঘাসের ওপর। এক আইন আবার দুইবার দুই রকম হয় কি করে? হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না,-ভদ্দরলোকদের এই বচন কি ভদ্দরলোকরাই খারিজ করে দিচ্ছে?
কাদের তাকে তাড়া দেয়, দেখ তো বাপু, বুড়া সায়েবকে খবর দে একটু।
কথাটি তমিজের কানে ঢোকে না, সে জানতে চায়, তেভাগা হলেও কাম হয়। তেভাগা তো হচ্ছেই, না?
এ কথা সে কথা, দে বুড়ি আলাপাতা। কাদের তমিজের একটি ব্যাপারেই লেগে থাকা নিয়ে হাসে, তোর খালি এক কথা। উগলান তো সব শ্যাষ হয় গেছে বাপু। নাচোলের দিকে এখানো মাথা গরম কিছু চ্যাংড়া।
লাটোর? জায়গাটার নাম জানা থাকলেও এর অবস্থান সম্পর্কে তমিজের ধারণা অস্পষ্ট, কিন্তু সেটা সে স্বীকার করবে কেন? লবাবগঞ্জ তো? চিনি না? জয়পুরেত যখন ধান কাটিচ্ছিলাম তখনি তো ওটি জোতদাররা সব দৌড়াচ্ছিলো পাছার কাপড় তুল্যা।
উগলান দিন শ্যাষ। এখন বাপু বাড়ির মধ্যে খবরটা দে। হামি বারান্দাত বসি।
খিড়কির দরজা দিয়ে তমিজ বাড়ির ভেতরে গেলে কাদের বারান্দার চেয়ারে বসে বাড়ির লনটা দেখে। চোখ জুড়িয়ে যায়। খোলা গেটের ওপারে চওড়া কাঁচা রাস্তা। ঐ রাস্তা ধরে মিনিট দশেক হাঁটলেই নদী, খেয়া নৌকায় নদী পার হলেই জমজমাট টাউন। এদিকে একটা জমি কিনে বাড়ি করতে পারলে হতো। আবদুল আজিজ বাড়ি কিনলো। টাউনের আরেক প্রান্তে ঘিঞ্জি এলাকায়। চারদিকে হিন্দু বাড়ি। পার্টিশনের আগে ওখানে তো মোসলমানকে বাড়ি ভাড়াও দেওয়া হতো না, এখন দুই একটা মোসলমান বাড়ি কিনে কিংবা দখল করে ঢুকতে শুরু করেছে। তবে শরাফত মণ্ডল ঠিকই বলে, হিন্দু প্রতিবেশী থাকা ভালো। উঁচু জাতের শিক্ষিত হিন্দু পাড়ায় থাকলে বাড়ির ছেলেমেয়েরা বয়ে যায় না। আর পাকিস্তানে হিন্দুরা তো একটু ছোটো হয়েই থাকবে, ওদের দাপটটা সহ্য করতে হবে না। নতুন যারা আসবে, তাদের বেশির ভাগই লুটপাটের পাট্টি, পাড়াটা নষ্ট করে দেবে।
এই শহরতলী এলাকায় এম টি হোসেন বেশ মাথা উচু করেই আছে। এ দিকেও সব বামুন কায়েত আর বৈদ্যের বসবাস; কিন্তু পাড়ার ক্লাবঘরটা এই বাড়িতেই। ক্লাবে আসে তো উচু জাতের হিন্দুই বেশি। কী সুন্দর হিন্দু মেয়েদের সঙ্গে ইয়াকুব হোসেনের খাতির!
আপনাক ঘরত বসবার কলো, তমিজের কথায় আবদুল কাদের হলঘরে ঢোকে। ইসমাইল হোসেন ঢাকায়, সুতরাং বাড়ির হলঘর খালি। এই ঘর কাদের কখনো এরকম খালি দেখে নি। দেওয়ালের শেলফ ভরা সারি সারি বই, ইংরেজি বাংলা বইতে শেলফগুলো ঠাসা। পাল্লা খোলা পেয়ে, একটা শেলফের সামনে দাঁদিয়ে কাদের বই নাড়াচাড়া করে। চামড়ায় বাঁধানো ইংরেজি ম্যাগাজিন, পাশে ইংরেজিতে এম টি হোসেনের নাম খোদাই সোনালি অক্ষরে। কাদেরও টাউনে বাড়ি করলে এরকম সাজানো বইয়ের আলমারি করবে।
আরে কাদের নাকি? বসো বসো। এম টি হোসেন ঢুকে প্রথমেই তার খোেলা শেলফের পাল্লা বন্ধ করে, তালাচাবিও লাগায়। কাদের একটু ধাক্কা খেলেও বাঁধানো বই সাজানোটা ভালো করে দেখে নেয়।
এম টি হোসেন কাদেরের কাছে তাদের গ্রামের খবর জানতে চায়। তবে গিরিরডাঙা, নিজগিরিরডাঙা, গোলাবাড়ি এলাকার খবর তার মোটামুটি সবই জানা। আবদুর কাদেরের বাবা মুকুন্দ সাহার বাড়ি কিনেছে পানির দামে, কালাম মাঝি আছে। তার দোকানটা দখল করার তালে, বুড়ার অজানা নাই কিছুই। তার আক্ষেপ, ইসমাইল হোসেন টাউনে কি ঢাকায় একটা বাড়িঘর কিছুই করলো না। বড়ো বড়ো বাড়ি ফেলে রেখে হিন্দুরা চলে যাচ্ছ। এই সময়, ঠিক আছে ন্যায্য দামেই, কিছু সম্পত্তি কেনো। টাকা কম পড়লে এম টি হোসেনই না হয় কিছু দেবে। পরে এই সুযোগ কি আর পাওয়া যাবে?-না, এসবের মধ্যে সে নাই। এতাই যদি সাধু হও তো চেলাচামুণ্ডারা যে লুটপাট করে তাদের তো বাধা দিতে পারো না। তা হলে এই সততার মানে কী?
ইসমাইল হোসেনের চেলাদের মধ্যে কাদের প্রথম চার পাঁচ জনের মধ্যেই পড়ে। বুড়া আবার তার বাপের দৃষ্টান্ত না দেখায় তাই তার আক্ষেপে কাদের পুরো সায় দেয়, ভাইজানের তো লিজের দিকে নজর নই। শামসুদ্দিন ডাক্তার, সাদেক উকিল, সামাদ। খান, মফিজুল হক,-এরা তো সম্পত্তি করিচ্ছে দুই হাতে। তা ধরেন,–।
এর মধ্যে পরোটা ও গোরুর গোশতের ভুনা এসে পড়লে কাদের বলতে গেলে একাই প্রায় সবটা সাবাড় করে। খাওয়ার তৃপ্তিতে ও নিজের আরজি পেশ করার প্রস্ততিতে কাদের দুটো ঢেকুর তোলে। কী ব্যাপার? কাদের জানায়, শিমুলতলার তালুকদার বাড়ি থেকে কাদেরের একটা সম্বন্ধ এসেছে। আজ পয়গাম নিয়ে যাবে তার বাবা শরাফত মণ্ডল। মেয়ে দেখা হবে, পাকা কথাও হবে। সঙ্গে লোকজন যাবে খুব কম। শরাফত মণ্ডল তো যাবেই। কাদেরের মা তো আবার দুইজন, বলে লজ্জায় মাথাটা নিচু করে একটু হেসে লজ্জাটা ফেরে কাটিয়ে উঠে সে জানায়, দুই মা যাবে, আবদুল আজিজ যাবে, আজিজের শালা সম্বন্ধী যাবে জনা চারেক, আজিজের শাশুড়িকেও নিতে হবে। আজিজের বড়ো সম্বন্ধীর বৌ যেতে পারে। কন্যা দর্শনার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা শোনা থামিয়ে ইসমাইলের বাবা বলে, শিমুলতলার তালুকদারদের কার মেয়ে?
