মনে রাখার চেষ্টাও করে কি-না সন্দেহ। এই খাটনিটা ধানজমির পেছনে খাটলে গিরিরডাঙা আর নিজগিরিরডাঙার চাষাদের চোখ জুড়িয়ে যেতো ফসলের ফলন দেখে। টাউনের ভদ্দরলোকদের মাথায় কী পোকা যে আছে তমিজ তার হদিস করতে পারে না। ধান, নয়, পাট নয়, পেঁয়াজ রসুন নয়, আলু নয়, আনাজ তরকারি নয়, খালি ফুলের পেছনে এতো টাকা নষ্ট করার কোনো মানে হয়? মাটিতে সার মেশাতে মেশাতে তমিজের হাত আলগা হয়ে আসে : এবার হুরমতুল্লার ভিটার পেছনে পেঁয়াজ রসুন তোলার পর সে আউশ বোনার হাউশ করেছিলো। এখন ওই জমি তৈরির সময় চলে যাচ্ছে। জীবনে পেঁয়াজ রসুন ছাড়া হুরমতুল্লা ওই জমিতে আর কিছু আবাদ করে নি। চাষার ঘরের মানুষ বলে তাদের এতো ােেয়াব, কিন্তু জমির রঙ দেখে এই তমিজই প্রথম বোঝে, ওখানে আউশের খন্দ ভালো হবে। বিয়ের রাতেই ফুলজানকে ওই জমিতে লাঙল দেওয়ার কথা সে বলেছিলো। ফুলজানের মনে থাকলেও কাজ হয়।
বিকালবেলা ইয়াকুব হোসেন বোঝায়, তোমার ঐ চাষাড়ে হাত দুটো একটু নরম করে। এই সার মেশাতে হয় মিহি করে। তার হাতে চাষার লক্ষণ দেখায় তমিজ ইয়াকুবের দিকে তাকায় গদগদ হয়ে; কিন্তু তার সব ক্ষমতা কি ফুরিয়ে যাবে এই ফুল গাছের তোয়াজ করে করে?
ঘড়ি লাগানো কবজির নিচে লম্বা লম্বা ফর্সা আঙুল-জোড়ানো লালচে হাতে মিহি করে সার মেশাবার কৌশল শেখায় ইয়াকুব। বলে, নিবারণকে একদিন খবর দিলেই ও এসে তোমাকে দেখিয়ে দেবে।
ভাইজান, আরে আপনে মাটিত হাত দেন? তমিজ করে কী? এই অনুযোগ শুনে ইয়াকুব পেছনে তাকালে দেখতে পায় আবদুল কাদেরকে। কিন্তু তার মনোযোগ অব্যাহত থাকে কেবল তমিজের দিকেই। তাকে নতুন কাটা কেয়ারির অসমান রেখা দেখিয়ে বলে, কোদাল কোপাবার আগে খুরপি দিয়ে লাইন কেটে নিতে বললাম না?
আবদুর কাদের বলে, তমিজ, ইয়াকুব ভাই মিলিটারির অফিসার আছিলো রে, তার কামোত ফাকি দিবার পারবু না। এটি কয়দিন থাকলে কাম শিখবার পারবু, তখন গাঁওত যায়া আর নাঙল ঠেলা লাগবি না।
ইয়াকুব আবদুল কাদেরের দিকে তাকিয়ে একটু হেসেই ঠোঁটজোড়া গুটিয়ে ফেলে। এদের সে বেশি পাত্তা দেয় না। বড়দার কাছে এসব লোক যখন তখন আসে বলেই বাড়ির বাগানটার হাল এই হয়েছে। তবে বড়দা তো ঢাকায় ইয়াকুবের হাসি মুখে এই ঠাণ্ডা খবরে কাদেরের খুব একটা এসে যায় না। সে আজ দেখা করতে এসেছে এদের। বাপের সঙ্গে, হেঁ হেঁ, জ্যাঠো, মানে আপনার পিতার সাথে একটু দেখা করার দরকার ছিলো। মানে—
ও। বলে ইয়াকুব ধীরেসুস্থে হেঁটে বারান্দায় উঠে বাড়ির ভেতরে চলে গেলে কাদের আরাম পায় : ইসমাইল ভায়ের এই ভাইটা এমনিতে ভালো, ব্যবহার বেশ ভাললাই, কিন্তু গাঁয়ের মানুষের সঙ্গে বেশিক্ষণ মিশতে পারে না। এখনি হৃষিকেশ মৈত্রের ছেলে অনিল কি আজিজ ডাক্তার আসুক, তাদের সঙ্গে ইয়াকুবের গলার হো হো হাসি শোনা যাবে একেবারে টাউনের মাঝখান থেকে। সে বাপু যাই হোক, এম টি হোসেনের সঙ্গে কথা না বলে কাদের আজ এখান থেকে নড়ছে না।
ফুলজানের বাপের সাথে কথাবার্তা ছিলেন ভাইজান? জমি দেওয়ার ওয়াদা করিছিলো। তমিজ ব্যাকুল হয়ে হুরমতুল্লার জমি সম্বন্ধে জানতে চাইলে কাদের এই কয়েক মিনিটের মধ্যে তাকে দ্বিতীয়বার ধমক দেয়, আরো রাখ। যদ্দিন পারিস এটি থাক। এস পি সায়েবেক অনেক ধরাধরি কর্যা পুলিসেক আটকা রাখা হছে। এটি থ্যাকা বারালেই তোক থানার মধ্যে তুলবি। ও দিকে কালাম মাঝি আটো হছে, মাঝিপাড়ার মানুষ তাক আর দেখবারই পায় না। মুকুন্দ সাহার দোকান দখল করার তালে আছে, তার লিজের মানুষই তার সাথে কেউ নাই।
এসব কথা তমিজের কানে ঢোকে কি-না সন্দেহ। সে বলে, আর কয়টা দিন গেলে আউশের জমিত নাঙল দেওয়ার সময় পার হয়া যাবি না? তমিজের কথায় কাদের বিরক্ত হয়, আবার ছোঁড়াটার ওপর মায়াও হয়। ইসমাইল হোসেন এই ছেলেটা সম্বন্ধে একটু দুর্বল।-ভোটের আগে তমিজ জেলে না থাকলে তার মুক্তির জন্যে ওয়াদা করা যেতো কীভাবে? মাঝিপাড়ার ভোট সব তার বাকসে পড়েছে এই ছোঁড়াটার জন্যে। এবার তার পেছনে লেগেছে কালাম মাঝি। কালাম মাঝিটা যেভাবে বেড়ে উঠেছে, তাতে ইসমাইল হোসেনের আর কী এসে যায়, কিন্তু কাদেরকে একটু হুঁশিয়ার তো থাকতেই হয়। সামনে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ইলেকশন, সেখানে কালাম মাঝি ছাড়া কাদেরের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে আর কে? তমিজটাকে কাদের হাতে রাখলে কালাম মাঝি গ্রামে দূরের কথা নিজের আত্মীয় স্বজনের ভোট পর্যন্ত পাবে না। ইসমাইল ভায়ের হাতে পায়ে ধরে, এটা ওটা বুঝ দিয়ে কাদেরই তমিজকে নিয়ে এসেছে এখানে। এখন দেখা যাচ্ছে এই বাড়িতে তার খাতির বেশ ভালোই। ইয়াকুবের সঙ্গে সঙ্গে বাগান করে। বাড়িতে মূলতানি গাই আছে দুটো, তাদের যত্ন নেওয়ার ভারও পেয়েছে তমিজ। গোবু দুটোর জন্যে ইসমাইল হোসেনের মায়ের বড়ো দুরদ। সেই দরদের সামান্য হিস্যা যদি তমিজের কপালে জোটে তো এই বাড়িতে তার কায়েমি আসন টলায় কে? অথচ দেখো, তমিজের বাপের বোকা বেটাটা মরার জন্যে বাড়ি যেতে পাগল হয়ে উঠেছে। কাদেরের রাগই হয়, বাড়িত গেলেই তোক জমি দিবি কেটা? তুই হুরমতুল্লার বেটিক বিয়া করলু, বাপজান সামনের খন্দ হুরমতুল্লাক করবার দেয় কি-না কওয়া যায় না। তখন হুরমতুল্লাক নিজের জমি আবাদ করা লাগবি না?
কিন্তু তমিজটা একেবারে নাছোড়বান্দা, আপনেরা না কছিলেন জমির উপরে বর্গাদারের হক কায়েম করার আইন জারি হবি? ফুলজানের বাপেক আপনের বাপজান জমি থ্যাকা উঠায় ক্যাংকা করা?
