কালাম মাঝি ধমকে বলে, ইগলান প্যাচাল বাদ দেও। মোহাজের লিয়া গান ধরো।
বৈকুণ্ঠ গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে, বারান্দার নিচে থেকেই জিগ্যেস করে, তুন গান বান্দিছো?
এ কালাম মাঝির হুকুমে এক রাতেই নতুন গান লিখলেও এটা নিয়ে কেরামত খুঁতখুঁত করছিলো। এখন কী আর করা যায়? পকেট থেকে রুল টানা কাগজ বার করে সে পড়তে শুরু করে,
শোনো শোনো শোনো রে ভাই হিন্দু মোসলমান।
মোহাজেরের দুষ্কু কিছু করিব বয়ান।।
বাস্তুভিটা হইতে বিতাড়িত মোহাজের।
পাকিস্তানেতে তারা হইয়াছে হাজের।।
তাদের ঘর ছিলো বাড়ি ছিলো ছিলো পুষ্করিনী।
খোদার ফজলে তারা ছিলো নাকো ঋণী।।
আল্লা ও রসুলে তারা রেখেছে ইমান।
ইমান রাখিতে গিয়া দিলো শত জানা।।
তাকে থামিয়ে দিতে, কিংবা তার গানে অনুপ্রাণিত হয়েও হতে পারে, কালাম জিভে এচ এচ করে,বলে, মোসলমান জান দিয়া লিজের ইমান ঠিক রাখে! কতো মানুষ যে মরিচ্ছে। কোনো বাজনা ছাড়া পয়ারের একঘেয়ে ছন্দে বৈকুণ্ঠ মাথা দোলায়, কোথাও তাল কেটে গেলে মাথা নাড়া টললেও গানে মনোযোগ তার একটুও চিড় খায় না। কেরামত ফের গান ধরে,
কাফের হস্তে মায়েবোনে হারালো ইর্জত।
সব্বোশ্রান্ত হইয়া হেথায় করিলো হিজরত।।
হেথা হইতে যায় চলিয়া হিন্দু ভাইগণে।
মাতৃভূমি ত্যাগে বড়ো দাগা পায় গো মনে।।
স্বর্গদর্পে গড়িমসি এহি জম্মভূমি।
পিতাপিতামহ রহে এহি মাটি চুমি।।
তাহাদের মনোকষ্টে আল্লা হয় নারাজ।
কেরামত কোনো ভুল কথা বললো কি-না না জেনেও নিজের কথা বলার বেগ প্রবল হয়ে ওঠায় কালাম মাঝি তাকে থামিয়ে দেয়, রাখো। তারপর সে তার বক্তৃতার উপসংহার টানে, ভাইসব, পাকিস্তান শুধু মোসলমানের নয়, হিন্দুরও দেশ। হিন্দু ভাইগণ যদি এই দেশকে আপন মনে না করে, এদেশের মালসম্পত্তি সামান যদি ঐপারে পাঠায় তবে পাকিস্তানের বুকে ছুরি মারা হয়। হয় কি-না বলেন? হিন্দু হোক আর মোসলমান হোক, দেশের সয়সম্পত্তি নষ্ট করলে পাকিস্তানের পাক জমিনে তার জায়গা নাই।
কিন্তু শ্রোতারা তার কথায় তেমন কান না দিয়ে উঠে যেতে শুরু করলে এবং বিশেষ করে মাঝিপাড়ার লোকজন পানি আসবি গো, বাড়িত চলো। বলে ডাকাডাকি শুরু করলে কালামকে থামতে হয়। বৈকুণ্ঠ শুধু কেরামতের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে, শ্যাষ করবা না?
কালাম মাঝি তাকে মুখ ঝামটা দেয়, মোসলমান তোর ঘরত হাত দিলে ঘর নষ্ট হয়, মোসলমানের শোলোক শুনলে কান দুইখান তোর পচ্যা যাবি না?
বৈকুণ্ঠ কৈফিয়ত দেয়, না, না কি যে কন! লক্ষ্মীপূজার সরা তো? বেজাতের মানুষ হাত দিলে–।
মোসলমানে বেজাত হলো? মালাউনের বাচ্চা তুই কোস কি রে? কালাম মাঝি রাগে কাঁপে, ভাত খাস তুই পাকিস্তানের আর মোসলমানক তুই গাল পাড়িস জাত তুল্যা?
পালপাড়ার বিষ্ণু পাল তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে প্রচণ্ড ধমক ছাড়ে, বৈকুণ্ঠ, হুঁশিয়ার হয়া কথা কোস। না হলে তোর দাঁতের পাটি দুইটাই একো চড়ে ফালায়া দিমু কলাম। তার হয়ে সে মাফ চায় কালাম মাঝির কাছে, এটা একটা পাগলা চোদা, অর কথা হামরা কি ধরি?
তোমরা ধরবা কিস? তোমার তো জাত তুল্যা কথা কয় না। বিটু পালকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়ে কালাম মাঝি চোখ পাকায় বৈকুণ্ঠের দিকে, শালা মালাউনের বাচ্চা, হামার ঘরত থাকিস, আর হামারই জাত লিয়া মুখ খারাপ করিস? ওঠ, শালা, আজই তোক এই ঘরছাড়া করমু। ঐ দরজাত হামি কলমা লেখ্যা টাঙায়া দিমু। দেখি শালা তোর লক্ষ্মী হামার কি বাল ঘেঁড়ে।
কেষ্ট পালের ভাই বিষ্ণু এবার পিছু হটে। আর কারো বিরোধিতা কিংবা সমর্থন না পেয়ে কালাম মাঝি ধরে এবার তার ভাগ্নেকে, ক্যা রে বুধা, ভাত খাস না? শালা মালাউন জাত তুল্যা কথা কয় আর তুই চুপ করা খাড়া হয়া মজা দেখিস! ওই শালাক কান ধরা বার কর্যা দে এই ঘর থ্যাকা।
বৈকুণ্ঠ এবার ভয় পায়, বাবু তো খবর পাঠাছে, আর কয়টা দিন বাদে আসিচ্ছে।
তোর বাবুর গোয়া মারি। তোর জাতের গোয়া মারি হামি। গতকাল সাহার ফিরে আসার খবর পাবার পর থেকে কালাম তার সঙ্গে সমকামে লিপ্ত হওয়ার সংকল্প ঘোষণা করে আসছে। কিন্তু এতোগুলো মোসলমান কেউ তার হয়ে কিছু বলছে না দেখে সে। আরো ক্রদ্ধ হয়ে উঠলে সামনে এগিয়ে আসে গফুর কলু।
অতো গরম কিসের গো? মাঝির বেটার অতো গরম কিসের? কাদের ভাই কয়া গেছে, মুকুন্দ সাহার দোকানে কিছু হলে, কি তার মানষের উপরে জুলুম হলে ফল ভালো হবি না। হুঁশিয়ার হয়া কথা কবা। বুঝিছো তো? বলতে বলতে গফুর কলু কালামের একেবারে কাছাকাছি চলে এলে কালাম সরে দাঁড়ায়, শালা কলুর বেটা তফাত থাক, তফাত থাক। কলুর স্পর্শ থেকে দূরে থাকতে সে নিজেই আরো পিছে হটে। শালা মাঝির বেটিক লিকা করা মনে করিস, জাভোত উঠিছু, না? অতো সোজা লয়। শালা বুধবার দুপুর বেলা কলুর মুখ দেখিছি, তখুনি বুঝিছি, শনির লজর লাগলো।
বুধবার শনির নজর লাগায় কালাম মাঝি হন হন করে রওয়ানা হয় বাড়ির দিকে। তার পাশাপাশি দূরের কথা, ঠিক পেছনে পেছনে হাঁটতেও বুধাকে দৌড়াতে হয় সারাটা পথ। তবে মামুর কথাগুলো সে শুনতে পায় সবই, মণ্ডল তো সাহার বাড়ি দখল করিছে, এখন দোকানখানও লেওয়ার তালে আছে। হামিও দেখমু।
পরদিন সকালে কেরামতের সঙ্গে কালাম মাঝি নিজের দুঃখবেদনার কথা বলে। মাঝিদের উন্নতি হবে কী করে? এই যে শালা গফুর কলু, কিছুদিন আগেও মাঝিপাড়ার মানুষ ঘেন্না করে তার ছায়া মাড়াতো না। আর কাল সেই কলুর বাচ্চা তাকে বেইজ্জত করলো, মাঝিরা নাকি উত্তরপাড়ায় তাই নিয়ে খুব হাসাহাসি করেছে। মাঝিরাই যদি মাঝির দুষমনি করে তো এই জাতের ওঠার কোনো পথ আছে? মাঝির খাঁটি মুরুব্বি। ছিলো এক তমিজের বাপ। নিজের জাতের জন্যে মানুষটা মণ্ডলের হাতে খড়মের বাড়ি খেয়েছে। তার ছেলেটা পর্যন্ত মাঝির সঙ্গে, নিজের বাপের সঙ্গে বেইমানি করলো। কুলসুমের ঘরে তমিজের বাপের রুহ নাকি রোজই একবার না একবার আসে, কথা কয়, কথা শোনেও। কুলসুমের কাছে বসে নিজের দুঃখবেদনার কথা বলার জন্যে কালাম মাঝির প্রাণটা আইঢাই করে।
৫১. বাড়ির সামনে কনকচাঁপা
বাড়ির সামনে কনকচাঁপা ও গোলঞ্চ, গেটের দুই পাশে কামিনী এবং পুকুরঘাটে জোড়বকুলের গোড়ায় মাটি খুঁচিয়ে, মাটির সঙ্গে নানারকমের সার মিশিয়ে প্রতিদিন দুই বেলা পানি ঢেলে ফাল্গুনের মাঝামাঝি বিশ পঁচিশ বছরের গাছগুলোকে রঙবেরঙের ফুলে সাজিয়ে তোলায় তমিজ এখন ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে খাতির পায়। ম্যাগনোলিয়ার দুটো কলম নিয়ে আসা হয়েছিলো কলকাতা থেকে, চার বছরে সেটার বাড় বুঝতে ইয়াকুব বাড়ি এসে প্রত্যেক দিন স্কেল দিয়ে মাপতো। তমিজকে পেয়ে ইয়াকুব সেটার পেছনে এমনভাবে লেগেছে যে বর্ষার শুরুতে ফুল না ফুটিয়ে গাছ দুটোর আর রক্ষা নাই। শীতের মরশুমি ফুল ভালো করে ঝরে পড়ার আগেই ইয়াকুব সেগুলোকে ঝোপজঙ্গল আখ্যা দিয়ে সাফ করে ফেললো। এখন সেখানে গোল, চারকোণা ও তিনকোণা কেয়ারি কাটা শুরু হয়েছে। মাটি আচ্ছাসে কুপিয়ে গোবরের সঙ্গে মেশাবার জন্যে ইয়াকুব যে কতো কিসিমের সারই নিয়ে আসে তমিজ একশো এক বার শুনেও সেসবের সায়েবি নাম মনে রাখতে পারে না।
