কৈ, কেউ তো নাই। অথচ কুলসুম কার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে, তোমার বেটার বৌ তো পোয়াতি হছে গো। উনিক গেছিলাম।
সত্যি সত্যি কে যেন ঘরে ঢোকে, কেরামতের গা তার গতির বাতাসে কাঁপলে সে একটু সরে বসে। কিন্তু মানুষটাকে দেখা যায় না কেন? কুলসুম তার সঙ্গে কথা বলেই চলে, ঘেগি হলে কী হয়, বৌটা মানুষ ভালো। আমাকে বোয়াল মাছের সালুন দিয়া ভাত খিলালো। ওপরে এ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে একটা কথা বার করে কুলসুম সামনে এগিয়ে ধরে, বৌ হামাক খ্যাতাখান দিলো। একটা কোণ অল্প একটু ছিড়া গেছে, তাও দুইটা শীত পাড়ি দেওয়া যাবি, লয়? এগিয়ে দেওয়া কাথার একটা কোণ শূন্যে একটু ওপরে উঠলো, কেউ হাত দিয়ে ধরে ছেড়ে দিলো। কুলসুম বলে, বৌয়ের বোন খ্যাতা সেলাই করিছে। কী সোন্দর খ্যাতা গো, লকসা দেখিছো? অদৃশ্য লোকটি দেখে, কেরামতও দেখে, সারা কাঁথা জুড়ে লাল নীল ও হলুদ সুতায় বরফি আঁকা, মাঝে মাঝে চাঁদ তারার ছবি। একেকটা চাঁদ পিছু তিনটে তারা।
কিন্তু তমিজের বাপের হাজিরা অনুমান করে, ঠিক করে বললে বলতে হয়, টের পেয়ে কেরামত শুকনা টোক গেলে। সবটা ঘরে বিলের কাদাপানির গন্ধ, পানির আঁশটে গন্ধ।
কেরামত আর কথা না বলে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে আসছে, দেখা হয়ে যায় কালাম মাঝির সঙ্গে। কালাম হঠাৎ এতো গম্ভীর হয়ে গেলো কেন? তমিজের বাপের ঘরে গিয়েছিলো শুনে স্থির চোখে সে তাকায় কেরামতের দিকে।
তবে বিকালবেলাতেই কালাম তাকে জানায়, কাল বুধবার না? হাটবার। কালই। তোমার গান হবি।
কালই? গান তো পুরা বান্দা হয় নাই। শুক্কুরবার দিন হাটবার আছে না?
বালের গান বান্দো! আজ রাতের মধ্যেই গান বান্দা রাখবা।
মুকুন্দ সাহার দোকানের বারান্দায় তক্তপোেষ পাতা হলো। তক্তপোষ ঘর থেকে বার করে দিলো বৈকুণ্ঠ নিজেই। আড়তে ঢুকে কালাম চোখ দিয়ে জরিপ করে বলে, ক্যা রে, মরিচের বস্তা না উদিনকা দেখলাম আটটা। আজ ছয়টা কিসক? জিরার বস্তা খালি একটাই আছে? সব বেচ্যা দিছু?
কালামের কথায় নয়, মুকুন্দ সাহাকে হিসাব দিতে হবে বলে বৈকুণ্ঠ মুখ কাঁচুমাচু করে। বাবুর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে ও যে দাম পায় তাতেই মাল ছেড়ে দিচ্ছে। খরচাও করছে দেদার। সকালে চিড়া খায় আধসের রসগোল্লা দিয়ে, দুইবেলা ভাত খাচ্ছে বড়ো মাছ রান্না করে। তা ছাড়া সারাদিন তার মুখ চলছেই। হাটে কি আর খাবারের অভাব থাকে সেদিন গোসাইবাড়ির মেলায় গিয়েছিলো, নটিপাড়ায় পয়সা ঢেলে এসেছে খুশিমতো।
কিন্তু কালাম তাকে শাসায় অন্য কারণে, সাহা বায়না লিছে, দোকান হামাক দিবি মালশুদ্ধা। তুই বামাক মাল বেচলে লোকসান কার?
বৈকুণ্ঠ অবশ্য খুব একটা কানে নেয় না, সে মহা ব্যস্ত কেরামতের জন্যে মঞ্চ সাজাতে। দুটো হ্যারিকেন জ্বালিয়ে ঝুলিয়ে দিলো বারান্দার টিনের ছাদের সিলিঙে। নিজের দোকান থেকে কালাম একটা হাতলওয়ালা চেয়ার নিয়ে আসে বুধাকে দিয়ে। বৈকুণ্ঠ আরেকটা চেয়ার নিয়ে এলে কালাম মাঝি বলে, একটাই হবি। কবি বস্যা থ্যাকা গান করবি নাকি? চেয়ারে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে কালাম হুকুম করে, উগলান পরিস্কার কর। বৈকুণ্ঠ বুঝতে না পারলে সে দেখিয়ে দেয় দরজায় ঝোলানো লক্ষীপূজার সোলার সরা আর দড়িতে বাঁধা আমপাতার দিকে। বৈকুণ্ঠ বলে, উগলান তো লক্ষীপূজার।
যা কই শোন। বুধা দূরজা সাফ কর। মামার হুকুমে বুধা দরজার সোলার সরা আর আমপাতা সরাতে গেলে হাঁ হাঁ করে ওঠে বৈকুণ্ঠ আরে করো কী? করো কী?
না, ধরেন, পূজার জিনিস, যি সি মানুষ ধরা হয় না।
হামরা হাত দিলে দরজা লষ্ট হয়? শালা হামারই ঘরের দরজা, হামার ভাইগ্না হাত দিবার পারবি না?
না, তা কই নাই। ধরেন পূজা বলে কথা। বেজাতের মানুষ হাত দিলে– বলতে বলতে বৈকুণ্ঠ নিজেই ওসব সরিয়ে ফেলে। তখন কালাম মাঝি ফের হাঁক ছাড়ে, ক্যা রে বুধা, আগরবাতি কুটি?
ছোটো দুটো চালের মালসায় আগরবাতি গুজে বুধা মালসা দুটো রাখে মঞ্চের সামনে। কালাম মাঝি দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়, নারায়ে তকবির। তেমন জোরে সাড়া না পেয়ে সে ধমক দেয়, আল্লার নাম মুখোত লিতে আটকায়? জোরে কন। এরপর সে কয়েকবার নারায়ে তকবির ও পাকিস্তান বলে চিৎকার করলে সন্তোষজনক জবাব পায়। বেরাদারানে ইসলাম সম্বোধন করে কালাম মাঝি শুরু করে তার বক্তৃতা। মাসখানেক আগের একটা দৈনিক আজাদ তার চশমা-পরা চোখের সামনে ধরে সে শুরু করে ইনডিয়ার মোসলমানদের ওপর হিন্দুদের জুলুম ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিবরণ। মনে মনে বানান করে ফের চেঁচিয়ে পড়তে তার কষ্ট হয় বলে কাগজটা হাতে রেখে নিজেই পেশ করে ভারতীয় মোসলমান নিধনের ভয়াবহ কাহিনী। বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস তার নাই; টাউনে রিফিউজি ক্যাম্পে ঘুরে ও এর ওর কাছে শুনে যেটুকু সে জানে তাই বলে যায় অগোছালো ভঙ্গিতে। ভাষা তার তেজোদীপ্ত না হলেও মোসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, পাইকারি হারে তাদের ধর্ষণ, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ভিটা থেকে তাদের উচ্ছেদ প্রভৃতি বিবরণে শ্রোতারা উৎসাহিত, এমন কি উত্তেজিত হতে থাকে। তারা বারবার ফিরে তাকায় পালপাড়ার শ্রোতাদের দিকে। আর এইসব শ্রোতাদের মাথা নিচু হতে হতে প্রায় মাটি স্পর্শ করে। কালাম মাঝি এবার ইশারা করে কেরামতকে, তোমার গান শুরু করো।
কালাম মাঝির বেপরোয়া বর্ণনায় কেরামত একটু উসখুস করছিলো। এরপর তার নতুন গান কি আর জমবে? সে তাই স্মৃতি থেকে শুরু করে, যাহার হাতে নাঙল, ফলায় ফসল অন্ন নাই তার পাতে।
