নিজের বাঁধা শোলোক অনেক অনেক মানুষের সামনে গাইবার জন্যে কেরামত কাঙাল হয়ে ওঠে, নিজের দাম বাড়াবার ইচ্ছা জলাঞ্জলি দিয়ে সে বলে ওঠে, আজই যাবেন? চলেন। রিলিফের এই টিনটা যতীনবাবুর বাড়িত দিয়াই আমি আসিচ্ছি। এক ঘড়িও লাগবি না।
দুধ তো গোলাবাড়িতও দরকার। ওটা না হয় লিয়াই চলো।
দুধের বড়ো টিন হাত করে কেরামতকে সঙ্গে নেওয়ার ইচ্ছা কালাম মাঝির আরো তীব্র হয়। মাঝিপাড়ায় সে বড়ো একা পড়ে গেছে। নিজের পরিবার পর্যন্ত মুখ গোমড়া করে থাকে তার সামনে। বৌয়ের চাচাতো বোনের ভাসুর আর খালাতো বোনের ছেলে বিলের ঘটনায় হাজত খাটছে। গোটা মাঝিপাড়ায় একটু আরাম পাওয়া যায় বরং কুলসুমের ঘরে গেলে। বিলডাকাতির কোনে কথাই সে তোলে না। মাঝিবংশের মেয়ে তো নয়, হাজার হলেও চেরাগ আলি ফকিরের নাতনি। তমিজের বাপ নাকি প্রায়ই তার কাছে আসে। এসব কথায় কালাম তেমন আমল দেয় না। কিন্তু কয়েকদিন হলো তার কথা সে খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। তমিজের বাপের কথা বলতে বলতে কুলসুমের লম্বাটে মুখ কেমন জ্বলজ্বল করে। দূর সম্পর্কের এই চাচিকে কালাম মাঝি দেখে আসছে কতোদিন থেকে, তার বাঁশঝাড়ের ভেতরেই তো সে বড়ো হলো দাদার সাথে। তারপর মেয়েটির বিয়েও হলো তারই সম্পর্কের চাচার সঙ্গে। কিন্তু এই মুখে এরকম আলো তো কালাম আগে কখনো খেয়াল করে নি।
আরার ওই আলো দেখে তার কেমন ভয় ভয় করে, একলা ঐ ঘরে ঢুকে কখন কী করে ফেলে সে নিজেই বুঝতে পারে না। মাঝিপাড়ার মানুষের কাছে দিনদিন সে ছোটো হয়ে যাচ্ছে, কালাম মাঝির নিজের ওপর নিজের দখল যেন কমে যাচ্ছে। কেরামত আলিকে আজকাল সে আর কাছছাড়া করতে চায় না। তার বাড়িতে নতুন ওঠানো চারচালা খানকা ঘরে তার থাকার ব্যবস্থাও সে করে দিয়েছে। বাঁশঝাড়ের পেছনে চেরাগ। আলির জন্যে যে ছাপরাটা ভোলা হয়েছিলো, ঐ ভিটাটা এখনো খালিই রয়ে গেছে। কেরামতের জন্যে ওখানে একটা ঘর তুলে দেওয়া এমন কোনো ব্যাপারে নয়। কিন্তু এই কবি শালা মানুষটা বড়ো ছটফটে, কখন কেটে পড়বে, হয়তো কাদেরের এক ডাকেই কুত্তার মতো চলে যাবে কালামকে কিছু না বলেই। তবে থাক, খানকা ঘরেই থাক। যতদিন থাকে, ততোদিনই লাভ। কালাম মাঝি এখন তার সঙ্গে, গপ্পো করতে পারে, তাকে নিয়ে হাটে যায়, বাজারে যোরে। আবার লোকজনের সামনে তার ওপর একটু তম্বিও করতে পারে।
কুলসুমের জন্যে কেরামতের টানটা কালামের কিন্তু ভালৈই লাগে। কুলসুমের সঙ্গে একা একা কথা বলতে তার যতোই ভালো লাগুক, ভয়ও করে। কেরামতটা থাকলে নিরাপদ।
কালাম মাঝির বাড়িতে সকালে পান্তা বা কড়কড়া ভাত, দুই সন্ধ্যা মাছ দিয়ে গরম ভাত খেয়ে এবং সময় অসময়ে কালাম মাঝির সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কেরামতের সময় কাটে, কিন্তু মাথার পদ্যটা তার ফোটে না। কুলসুমের দেখা পেলে এ্যাদ্দিনে গান বাঁধা হয়ে যেতো। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কালাম মাঝি হুট করে তুমি একটু আগাও, হামি আসি বলে কুলসুমের ঘরে ঢোকে, কেরামত ধীর পায়ে চলে কালামের খানকা ঘরে। আবার কেরামতের সঙ্গে কালাম কুলসুমের গপ্পোও করে। বলে, কেরামত কি সারাটা জীবন এমনি বাউণ্ডেলে হয়েই থাকবে? বিয়ে শাদি করবে না? কুলসুমটাও এই বয়সে ব্লাড়ি হয়ে থাকবে আর কতোদিন? কালাম মাঝি সরাসরি না বললেও ইঙ্গিতটা কেরামত ঠিকই বোঝে। কিন্তু কালাম তাকে কুলসুমের ঘরে ঢুকতে দেয় না কেন?
এক মেঘলা ভোরে বাঁশঝাড়ে চেরাগ আলির শূন্য ভিটার দিকে মুখ করে পায়খানা করতে বসে কেরামত হঠাৎ খুব উতলা হয়ে ওঠে। কালাম মাঝি এখনো বাড়ির ভেতরে, তার বেরুতে দেরি আছে। কেরামত ডোবার পানিতে ভালো করে হাত ধুয়ে চলে যায় তমিজের বাপের ঘরে।
ঘরের চৌকাঠে বসে সে কুলসুমকে নিবেদন করে, তুমি তো তোমার দাদার শোলোক শাস্তর সবই জানো। হামাক কলে হামি না হয় লিখ্যা লিবার পারি।
বইতো তোমাক দিলাম। তুমি বলে বেচ্যা দিছো কার কাছে? দাদা অ্যাসা বই উটকায়, পায় না। সেই বই ফেরত পাওয়ার কোনে সম্ভাবনাই কেরামতের নাই। কুলসুম ববাঝে না কেন, কেরামত নিজেই কতো কতো শোলোক বাঁধতে পারে, খোয়াবনামার তুলনায় সেগুলো কম কোনোদিকে? রীতিমতো ছাপা বই, লোকে পয়সা দিয়ে কেনে, পাইকাররা বাড়ি বয়ে এসে নিয়ে যায়।
এখন তার লেখা আসছে না। ওই ছেড়াখোড়া বইটাই যতো অনিষ্টের মূল। একবার হাতে পেয়ে সেখানে কী যে সে পেলো, তার ওপর কী যে আসর করলো, এখন বইটা হাতছাড়া হতেই কলম তার একেবারে শুকিয়ে গেলো। কুলসুম যদি একটু পাশে থাকে, ফকিরের গানগুলো যদি একটু শোনায় তো কেরামত ফের আগের মতো গান বাঁধতে পারে। মরিয়া হয়ে সে বলেই ফেলে, তোমাকে দেখলে হামার গান বান্দা হয়। হাজার হলেও তুমি ফকিরের লাতিন। একটা গান বান্দিচ্ছি, এখনো শেষ করবার পারি নাই। শুনবা?
কাগজ নাই, কলম নাই, তবু তার পদ্যের বীজ মাথা ফেটে বেরোয় এই রকম আওয়াজে :
বাস্তভিটা হইতে বিতাড়িত মোহাজের।
পাকিস্তানেতে তারা হইয়াছে হাজের।।
কুলসুমের দিকে চোখ রেখেই সে পদ্য বলছিলো, কিন্তু তার চোখ দরজার বাইরে। চোখে তার তেজের বদলে একটুখানি হাসির কুচি। কেরামতের শোলোক তার কানে ঢুকেছে বলে মনে হয় না। দরজার বাইরে কুলসুম কাকে দেখে? কেরামত বাইরে চোখ মেললে কাউকেই তো দেখতে পায় না। কেরামতের দিকে তাকিয়ে কুলসুম হঠাৎ বলে, দুয়ার ছাড়ো, আসবার দাও।
