মেয়েটির কাটা স্তন এবং কুণ্ডবাড়ির একতলা, দোতলা ও ছাদ জুড়ে উর্দু ও দেহাতি হিন্দিতে প্রকাশিত রিফিউজিদের ক্ষোভ, রাগ, বিলাপ ও অভিযোগ ভাষার দুর্বোধ্যতা মুছে ফেলে এবং কেরামতের বাবরি চুল ছুঁড়ে খোঁচাতে থাকে অবিরাম। খোঁচায় খোঁচায় একটি পদ্যের কুঁড়ি তার মাথার চাঁদিতে বেঁধে ছোটো একটি কাটার মতো, কিন্তু কুঁড়িটা ফোটে না। কুণ্ডুবাড়ির সব জায়গায় আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে রিলিফের মাল দিতে দিতে কেরামতের মাথায় পদ্য ফোঁটার বদলে ফুটে ওঠে কুলসুমের মুখ। মুখটা গাঁথা হয়ে যায় বিহারি মেয়েটির ধড়ের ওপর। মাঝখান থেকে কুলসুমের বুকের একটা স্তন খসে পড়ে খাড়ার আঘাতে।
রিকুইজিশন করা যতীন রায়ের বাড়িতে রিফিউজি-ক্যাম্পের জন্যে বড়ো দুই টিন পাউডার দুধ নিয়ে একটি কাদেরের বাড়িতে রেখে এবং আরেকটি রিকশায় চাপিয়ে বাদুড়তলা যাবার সময় কুলসুমের কাটা স্তন কেরামতের চোখে ঝাপসা হতে থাকে। তাই রেলগেটের সামনে এসে নিজের নামটা শুনতে তার অনেকটা সময় লাগে। হঠাৎ চমকে উঠে ডানদিকে তাকিয়ে দেখে, রেল লাইনের ধারে চশমার ডালা থেকে ছোটো আয়না ধরে চোখের চশমা পছন্দ করছে কালাম মাঝি। তার সঙ্গেও রিফিউজিদের জন্যে রিলিফের পাাকেট। কালাম মাঝি তার রিকশায় উঠে বসলে তার চশমাপরা মুখ জীবনে। এই প্রথম দেখে কেরামত তাকে মিনিট তিনেকের মধ্যে দ্বিতীয়বার স্লামালেকুম বলে তাজিম করে। যতোটা সম্ভব বিনয় করে সে জিগ্যেস করে, সোমাচার ভালো?
আর ভালো! ভালো না থাকার কারণ সে বয়ান করে একে একে–। মাঝিপাড়ার কয়েকটা চোরাডাকাতকে পুলিসে ধরে নিয়ে গেছে বলে ইসমাইল অকারণে তার ওপর খাপ্পা হয়ে রয়েছে। আরে নিজের রক্ত পানি করা পয়সায় যে বিল ইজারা নিয়েছে, সে কি চোরডাকাতদের মাছ ধরার জুত করে দিতে? ইসমাইল এই রাগে তকে রিলিফের মাল পর্যন্ত দিলো না। তা তাতে তার বয়েই গেলো! বলতে গেলে এই কারণেই তার দাম। বেড়েছে ডাক্তার শামসুদ্দিন খোন্দকার আর সাদেক উকিলের মতো জাঁদরেল নেতাদের কাছে। ডাক্তার তাকে দুধের টিন দিতে না পারলেও বেশ কিছু শাড়ি আর লুঙি জোগাড় করে দিয়েছে। তবে কি-না ইসমাইল হোসেন একজন এম এল এ এবং গিরিরডাঙা নিজগিরিরডাঙা গোলাবাড়ি এলাকায় এখনো তার পজিশন ভালো। শরাফত মণ্ডলের বেটা কাদের ইসমাইলের কান ভারি করে রেখেছে। মাঝিপাড়াটাও হাত করার তালে আছে মদের। কালাম অনুমান করে, তমিজকে লুকিয়ে রেখেছে এই শালা কাদেরই। কালাম মিনতি করে, কেরামত কি ইসমাইল হোসেনকে তার হয়ে একটু বুঝিয়ে বলতে পারে না?
কিন্তু কুলসুমের একটি কাটা স্তন ও তার গায়ে ফর্সা ছাপ দেখে কেরামত বড়ো বিচলিত, শোলোকের কুঁড়িটা তার মাথায় ফোটে না। অন্যমনস্কভাবে সে জিগ্যেস করে, গোলাবাড়ির দিকে তো রিফিউজি যায় নাই, না? এবং তমিজ এখনো ধরা পড়ে নাই?
প্রশ্ন দুটির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলেও কালাম মাঝি জবাব দেয় দুটোরই, এখাননা যায় নাই, তবে যাতে কতক্ষণ? এবং শালা খুনের আসামী হয়া পলায়া বেড়ায়।
কুলসুম একা একা নিরাপদে থাকে কী করে? কালাম মাঝির দারোগা বেটা কি তার ফোর্স নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না তার ওপর? পুলিস কি তার স্তনে ছুরি বসিয়ে দিলো? তার কাটা স্তনের দুধ ও রক্ত লেগেই কি কুলসুমের কালো মুখ গোলাপি হয়ে গেলো? কালাম মাঝিকে তো আর এসব প্রশ্ন করা সম্ভব নয়। কথাগুলো কেরামতের স্তনবিহীন বুকেই পড়ে থাকে এলোমেলোভাবে। কালাম মাঝি নিজে থেকেই বলে, বেটা তার চোরডাকাত জেলখাটা কয়েদি হলে কী হয়, তমিজের বাপ তো আছিলো ফেরেশতার লাকান মানুষ। হামরা একই বংশের মানুষ। তার বৌয়েক দেখাশোনা করা লাগে হামাকই। হামার ঘরত তাক থাকবার দিছি, দেখাশোনা করা লাগবি না?
কুলসুমের এই দুর্দিনে তার দেখাশোনার ভার নিয়েছে, আহা মানুষটা খুব সওয়াবের কাম করছে গো। কেরামত গদগদ চোখে তাকায় কালামের নতুন চশমা-পরা চোখের দিকে। আবার কুলসুমের দেখাশোনার সুযোগ কালাম মাঝির ভাগ্যেই জুটে যাওয়ায় তার বুকটা একটুখানি চিনচিন করে ওঠে। তার হিংসাটুকু হেঁকে পড়লে তার ভক্তিজৰ্জর দৃষ্টির প্রতিদান দেয় কলাম মাঝি তার কাব্যচর্চায় আগ্রহ দেখিয়ে, কেরামত আলি, তোমার দেখাই পাই না। এখন আর গান বান্দো-না?
টাইম পাই না কালাম ভাই। ব্যস্ত থাকার গৌরবে কেরামতের বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও . চিনচিনে হিংসা কেটে যায়, কিংবা এইসব কাটাতেই সে ব্যস্ত হওয়ার উপায় খোজে, হামার টাইম কোটে? ইসমাইল সাহেব কয়, কেরামতের হাতে রিলিফেরমাল দিলে নষ্ট হবি না। আবার সালেক উকিল ওইদিন কলো, কবি, এখন তোমাগোরে গান লেখার টাইম। পাকিস্তান হলো, এখনো যদি হিন্দু কবিদের কবিতাই পড়া লাগে তো ইসলামি : স্টেট করার ফায়দাটা কী? ঢাকাত যাও, ইসলামি জোশের গান লিখ্যা মানুষের মন পরিষ্কার করো। হামার ঢাকাত যাবার ফুরসৎ কৈ? কিন্তু নতুন শোলোকের কুঁড়িটা ফোঁটাবার ফুরসৎ তো তাকে করে নিতেই হবে। আপন মনে সে বলে, অনেকদিন বাদে গান একটা বান্দিচ্ছি। রিফিউজি লিয়া গান।।
চলো হামাগোরে ওটি চলো। একটা মজলিশ না হয করি। কালাম মাঝির প্রস্তাবে খুশি হলেও নিজের একটু দাম বাড়ায় কেরামত, মাঝিপাড়াত গান শোনার মানুষ কোটে?
মাঝিপাড়াত গান করবা কিসক? ওটি মানুষ কৈ মাঝিপাড়ার মানুষের কাব্যবোধে কালাম মাঝির আস্থা নাই, গান করবা তুমি গোলাবাড়ি হাটেত। মুকুন্দ সাহার দোকান তো আমি লিচ্ছি, সাহাক বায়না দিয়া রাখিছি। ঐ দোকানের সামনে মেলা জায়গা।
