মেলার পর মানুষজন চলে গেছে। কিছু কিছু দোকানের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছে দোকানদাররা। আলো জ্বলে নটিপট্টিতে। আর এখানে সন্ন্যাসীর বেদি ঘেঁষে বটগাছের নিচে পশ্চিমা সন্ন্যাসী শুয়ে রয়েছে জনা ছয়েক। আর যারা এসেছিলো তারা কেটে পড়েছে। এই ছয়জন ঘুমিয়ে থাকে চারটে কম্বলের নিচে। সন্ন্যাসীরা নিজ নিজ নাভিমূল থেকে ব্রহ্মাকে টেনে হিচড়ে বার করে দিচ্ছে যার যার নাক দিয়ে। একেকজনের নাক ডাকার একেকরকম আওয়াজ বৈকুণ্ঠের কানে বড়ো এলোমোলো ঠেকছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ওই গোলমেলে ধ্বনিতে একরকম বিন্যাস তৈরি হয়। ভবানী পাঠকের আশীর্বাদে ওই আওয়াজ থেকে নাক ডাকার শব্দ আড়ালে চলে যায়। অচেনা তাল ও লয়ের বাজনা। শুনে বৈকুণ্ঠ বোঝে, এখনি শুরু হবে চেরাগ আলি ফকিরের গান। ঠাকুরের থানে মাথা রেখে সে জিগ্যেস করে, একেবারে নতুন কিসিমের গান বান্ধিছছা ফকির?
মনুষ্যের কী সাধ্য এই সংগীত রচনা করে?-এরকম কঠিন সমস্কৃত কথা চেরাগ আলির জিভে আসবে কী করে?—চমকে উঠে এবং খানিকটা ভয় পেয়েও বটে, বৈকুণ্ঠনাথ গিরি ধোয়া ও উৎকণ্ঠা, নেশা ও উদ্বেগ এবং ভয়ে ও উত্তেজনায় ভারী মুণ্ডু ওপরে তুলে দেখে, তার নয়নের সুমুখে জটাশির, বিভূতিমণ্ডিত ও ঊধ্ববাহু সন্ন্যাসীর বিশাল মূর্তি। সন্ন্যাসীর হাতের ত্রিশূলের তিনটে কাঁটা কুয়াশা ফুড়ে ঢুকে গেছে আকাশের খোপের ভেতর। কাঁটার আঁকশি তিনটেতেই আলো জ্বলে, তিনটেতেই মাছের নকশা জ্বলে জ্বল জ্বল করে। ত্রিশূল দিয়ে সন্ন্যাসী ঠাকুর বিজলি শিকার করবে নাকি? এই মাছের নকশা সন্ন্যাসী কি চেয়ে নিয়েছে মুনসির পাণ্টি থেকে? না-কি মুনসিই ত্রিশূল থেকে একটি এনে বসিয়ে দিয়েছে তার পাণ্টির মাথায়? মাছ কেন? বিজলির কি মাছের লালচ একটু বেশি যে তাকে ধরতে মাছের টোপ লাগাতে হয়? সন্ন্যাসীর মস্ত মাথা নিজের মাথায় নিয়ে বটগাছ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা পোড়াদহের মাঠ জুড়ে। বৈকুণ্ঠনাথ চোখ বুজলে তার কানে বেজে ওঠে : সুখনিদ্রাপরিত্যাজে জাগো মৃগরাজতেজে
মীন জাগে তরু জাগে জাগো গিরিগণ।
তোমরা সুপ্ত শয্যাপরি গৃহে প্রবেশিল অরি
বান্ধিল শৃঙ্খলে তোমরা ড্রিাতে মগন।
ভবানী হুঙ্কারে জাগো জাগো গিরিগণ।।
বৈকুণ্ঠের সারা শরীর কাঁপে থরথর করে, এই শাস্তর তো চেরাগ আলির নয়। এরকম শক্ত শক্ত কথা চেরাগ আলির পেটে যদি কোনোদিন থেকেও থাকে তো তার গলা পর্যন্ত আসতে না আসতে তা গলে গেছে, জিভে চড়ার বল তার হয় নি। চেরাগ আলির গলা ভারি, কিন্তু নদীর পানিতে, পানির বাতাসে আর বাতাসের হিমে ও তাপে সেই স্বরে ভাঙনের চিহ্ন, চিড় খাওয়ার দাগ। সেখানে বিজলির এরকম রাগী গর্জন নাই। এই গর্জন আসছে বটগাছের অনেক ওপর থেকে। বটগাছের নিচে দাঁড়ালে বৈকুণ্ঠ টের পায়, সন্ন্যাসীর গান হুঙ্কার দিতে দিতে চলে যাচ্ছে উত্তর পশ্চিমে। এই গানের নিচে নিচে সে চলতে শুরু করে।
হাঁটার জন্যে দুই পা ফেলতে পায়ের নিচে পড়ে বটফল, হাঁটুতে আর কোমরে ঠেকে বটগাছের কচি চারা। একটা দুইটা তিনটা চারা। বটগাছের কচি চারা গায়ে লাগলে তাঁর সর্বাঙ্গ শিরশির করে। ঐ পাতার ছোঁয়া কাটাতে এবং ঐ পাতাওয়ালা চারা থেকে বল পেতেও বটে, বৈকুণ্ঠ তার হাঁটুসমান একটা বটের চারা উপড়ে নেয় বেশ জোরে টান দিয়ে। না, এই অন্ধকার কুয়াশার রাতে খালি হাতে সে যাত্রা করে কীভাবে?
বটতলা থেকে পোড়াদহ মাঠ পেরিয়ে গান এখন উড়াল দিচ্ছে উত্তর পশ্চিমে। বাঙালি নদীর রোগা স্রোতের ওপর দিয়ে গান ওড়ে, বাঙালির স্রোতে তার ছায়া ফেলে, তার বিনিময়ে গান তার ডানায় মেখে নেয় কুলুকুলু বোল। কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়তলা থেকে গানের প্রতিধ্বনি ফিরে আসে, ফেরার সময় তার পাখায় লাগে পাকুড়গাছের ঝিরিঝিরি কথা আর বিলের ঢেউ আর বাঙালি নদীর স্রোতের ভিজে হাওয়া :
জাগো কাতারে কাতারে গিরিরডাঙা কাৎলাহারে
জোট বান্দো দেখো টেকে কয়টা দুষমন।
জোট বান্দো ভাঙো হাতের শিকল ঝন ঝন।
শিকল মিলায় রৌদ্রে শিশির যেমন।।
এই তো মুনসির গান, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, হাওয়ায় হালকা হয়ে ঝরে পড়ছে চেরাগ আলির ভাঙাচোরা ভারি গলায়। কালাহার বিলের রুই কালা, পাবদা ট্যাংরা, শিঙি মাগুর খলসে পুঁটির আঁশটে গন্ধে, ভেড়ার আদলে জেগে-ওঠা গজারের ভেড়ার লোমের বোটকা গন্ধে ম ম করতে করতে চেরাগ আলির গলায় মুনসির গান বারবার ধাক্কা দিচ্ছে বটগাছের নিচে, সন্ন্যাসীর থানে। আর দেরি করা যায় না। তমিজটা কাদেরের হাতে ধরা দিতে গফুরের সঙ্গে রওনা হয়ে বৈকুণ্ঠের দিকে একবারো ফিরে তাকালো না। ছোঁড়াটা তার কাছে ঠাঁই চেয়েও না পেয়ে কী অভিমানটাই করে গেলো গো। বেটার কষ্টে চোরাবালির ভেতরে বাপটা তার না জানি কী ছটফট করে মরছে।–তমিজের বাপের পাশে একবার বসা দরকার। চোরাবালির দিকে যাবার জন্যে বটের চারা হাতে লম্বা লম্বা কদম ফেলে চলে বৈকুণ্ঠ।
৫০. কামিজের ওপরে ওড়না
কামিজের ওপরে ওড়না, ওড়না ময়লা হলেও একটু খেয়াল করলে বোঝা যায় যে, মেয়েটির একটি স্তন নাই। বিহারে হিন্দুরা মেয়েটির অন্যান্য অঙ্গের সঙ্গে দুটো স্তনই আশ মিটিয়ে চাটা ও চোষার পর একটি কেটে ফেলেছে, খবরটা এই রিফিউজি ক্যাম্পে সবাই জানে এবং এর ফলে তার আত্মীয়স্বজনের রিলিফের হিস্যাটা একটু বেশি। কাদেরের হুকুমে কেরামত আলি একটা শাড়ি তার দিকে এগিয়ে ধরতেই সেটা চালান হয়ে যায় অন্য একটি হাতে। ওড়নার ভেতর থেকে মেয়েটি চোখ মেলে তাকালে ঘোমটা একটু সরে যায়। তার নিশ্বাস নেওয়ার আওয়াজে কেরামতের কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে এবং ঐ নিশ্বাসের আওয়াজে বা নিজের কানের ঝাঁ ঝাঁ গোলমালে কেরামতের বাবরি চুল এলোমেলো হয়ে যায়। এও কি গন্ধ শুকে কে মানুষের ভেতরের কথাবার্তা সব জেনে ফেলবে নাকি? কিন্তু এর গায়ের রঙ তো রীতিমতো ফর্সা, এর নাক তোক টিকালো। কুলসুমের মতো এর চোখ অতো বড়ো নয়, এর চোখে পটলচেরা ভাব।–তা হলে মিলটা কোথায়?
