পশ্চিমা সন্ন্যাসীও এবার এসেছে অনেক কম। মানতের গাঁজা ঠাকুরের থানের নিচে গড়াগড়ি যায়। কেষ্ট পাল পুরনো মানুষ, যতোটা পারে ধীরস্থির থাকতে চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষটা খুব দমে গিয়েছে : বাবুদের ছায়া না পেলে ঠাকুর আর তুষ্ট থাকবে কতোদিন?
মেলা ভেঙে গেলে অনেক রাত্রে বৈকুণ্ঠ গিরি এসে বসে বটতলায় ঠাকুরের বেদীর নিচে। এ বছরেও ভোরবেলা ভবানী ঠাকুরের দর্শন তার ভাগ্যে জুটলো না। গতকাল রাতে, মেলার আগের দিন, পূজার বটতলা যখন পশ্চিমা সন্ন্যাসীতে, পূজায় আরাধনায়, গাজায়, আরতিতে, কামারে কুমারে, জোলায় কলুতে মাঝিতে গমগম করছে, বৈকুণ্ঠ তখন ফিরছিলো হাটের দোকানে। পরদিন ভোর থেকে মেলা, গোলাবাড়ি হাটের দোকানদারদের বেশিরভাগই আজ রাত কাটাবে পোড়াদহ মাঠে। কেষ্ট পালের ছোটভাই বিষ্ণু বলে, বৈকুণ্ঠ তুই হাটে যা। সাহার দোকান খালি না রাখাই ভালো। মানুষের লজর আছে ওই দোকানের উপরে। ঠাকুরের প্রসাদ কিছু নিয়ে এসেছিলো, তারই খানিকটা খেয়ে বৈকুণ্ঠ শুয়ে পড়ে। এমন সময় ফিসফিসে গলায় বৈকুণ্ঠদা শুনে দরজা খুলে দেখে * তমিজ। সন্ধ্যার পরপরই সে মাঝিপাড়া থেকে পালিয়ে এসে লুকিয়ে ছিলো হাটের কাছেই মুচিপাড়ার পাশে এক ঝোপের ভেতর। রাত হলে গোলাবাড়ি হাটে এসে দেখে কেউ নাই।
তার বিবরণ শেষ করতে না দিয়ে বৈকুণ্ঠ বলে, শুনিছি। মেলার মাঠেত সবই তো শুনলাম। আয় ঘরত আয়।
বাঁ হাতের কনুই তমিজের অসম্ভব ফুলে উঠেছে। পিঠের খোঁচাটা তেমন নয়। দিনমান না খেয়ে ছোঁড়াটা কাবু হয়ে গেছে। বৈকুণ্ঠ তাকে পূজার প্রসাদ দিলে সে গল্প গপ করে খায়। কিন্তু একটুখানি খেয়েই নেতিয়ে পড়ে মুকুন্দ সাহার গদির ওপর। তারপর কোঁকাতে থাকলে তার গায়ে হাত দিয়ে বৈকুণ্ঠ দেখে তার গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। বৈকুণ্ঠ কী আর করে, টিউবওয়েল থেকে পানি এনে সারারাত ধরে তমিজের মাথায় জলপট্টি দেয়। ভোর হওয়ার অনেক আগেই মুকুন্দ সাহার দোকানের দরজায় আস্তে আস্তে আওয়াজ হলে বৈকুণ্ঠ ফিসফিস করে বলে, পুলিস। তমিজ তার হাত ধরে থাকে। একটু পর বৈকুণ্ঠ বেরুবে ঠাকুরকে দেখার আশায়। এই সময় রাতভর বেজাতের মানুষের সঙ্গে হাত ঘষাঘষি কি কি হচ্ছে? কিন্তু উপায় কী? তমিজকে পুলিসে ধরলে ছোঁড়াটার ওপর কী জুলুমটা যে করবে!
ওদিকে দরজায় আস্তে আস্তে ধাক্কার সঙ্গে শোনা যায় এই বৈকুণ্ঠ। এই বৈকুণ্ঠ।
দোকানের শেষ মাথায় মরিচের বস্তার আড়ালে তমিজকে তুলে নিয়ে বৈকুণ্ঠ তাকে, শুইয়ে দেয় মেঝের ওপর। তারপর ফিরে দরজা খুলতেই গফুর কলু ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে ফিসফিস করে বলে, তমিজেক বার কর্যা দে। পুলিস মাঝিপাড়ার দিকে যাচ্ছে। তমিজ এক লম্বর আসামী।
তমিজ কোটে? বৈকুণ্ঠের এই কথায় গফুর রাগ করে, তমিজ তোর এটি ধরা পড়লে পুলিস তোক বত্তাই জবো করবি। কালামের বেটা খবর দিছে আমতলি থানাত। এই দোকানঘর থ্যাকা তোক সরাবার পারলে কালাম মাঝির আর কোনো কাঁটা থাকে না। বলতে বলতে সে নিজেই চলে যায় দোকানঘরের শেষ প্রান্তে এবং মরিচের বস্তার ওপার থেকে তমিজকে ধরে দাঁড় করায়। তোর বরাত! তার সৌভাগ্যের ব্যাখ্যাটা হলো এইরকম : কাদের কিছুক্ষণ আগে গফুরকে খবর দিয়েছে, তমিজ যেন মিছেমিছি পালাবার চেষ্টা না করে। তমিজকে পেলে গফুর নিজেই যেন তাকে নিয়ে চলে যায়। টাউনে, টাউনে কাদেরের বাসায় রেখে আসে। মেলায় কাদেরের বন্ধুদের নিয়ে আসতে গফুরের এমনিতেই তো টাউনে যাবার কথা, ঐ সময় তমিজকে সে যেন সঙ্গে নেয়। চল, হামি তো সাইকেলেত যামু, তুই ভালো করা আলোয়ান গাওত দিয়া নে। ভয় করিস না। পুলিস তো আসিচ্ছে পুব থ্যাকা, হামরা যামু টাউনের দিকে। চল।
বৈকুণ্ঠের খালি আফসোস হয়, ছোঁড়াটাকে নিয়ে আগেই সে টাউনের দিকে ভাগলো কেন? তমিজ তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। গফুর কলুকে সে ভয় পাচ্ছে? গফুর কি তাকে নিয়ে কাদেরের টাউনের বাসায় যাবে, না পুলিসের হাতে তুলে দেবে? কাদেরের মতলবটাই বা কী? তমিজকে দিয়ে সে কি মাঝিপাড়ার মানুষকে খেপিয়ে তুলবে কালাম মাঝির বিরুদ্ধে? কালামকে তো সে সহ্যই করতে পারে না। বৈকুণ্ঠ এখন করে কী?
গফুর বিরক্ত হয়, এই শালা মাঝির জাত, ইগলানেক ভালো করবার গেলেও দোষ হয়। থাক শালা এটি থাক। হিন্দুই হোর লিজের মানুষ হলো? শালা হিন্দুটাকও তো মারবু রে।
তমিজ বৈকুণ্ঠকে জড়িয়ে ধরলে সে আস্তে করে বলে, তমিজ, তুই যা, কাদের ভাইয়ের মেলা ক্ষমতা।
তমিজ গফুরের সঙ্গে টলতে টলতে হাঁটে। দরজা পেরোবার সময় সে বৈকুণ্ঠের দিকে একবার তাকায় তার তপ্ত ও লাল দুই চোখ ভরে। বৈকুণ্ঠের মাথাটা দপ করে ওঠে : তমিজের বাপ যেন চেরাগ আলির দিকে তাকিয়ে কারো কোনো দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা শুনছে।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে গফুর ভেতরে তাকিয়ে দরজা ভালো করে বন্ধ করার ইশারা দেয়। তমিজ কিন্তু আর একবারো ফিরে তাকায় না।
দেখতে দেখতে রোদ উঠে গেলো। এবারও বৈকুণ্ঠের ঠাকুর দর্শন হলো না। এবার বরং ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার দরকারটা ছিলো বেশি। বৈকুণ্ঠ যদি রাত থাকতেই তমিজকে নিয়ে মোষের দিঘির পাড়ে চলে যেতো! বৈকুণ্ঠ তো একরকম ধাক্কা দিয়েই তাকে বার করে দিলো। তমিজকে দেখে মনে হচ্ছিলো, এক পুলিসের হাত থেকে বাঁচাতে তাকে যেন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আরেক পুলিসের কবজায়। তমিজকে নিয়ে বৈকুণ্ঠ যদি মোষের দিঘির ওপর থেকে সন্ন্যাসী ঠাকুরের দর্শন একবার পায় তো ঠাকুরই তাকে বুকে টেনে নিতো। তমিজের বাপের বেটা কি রাগ করে গেলো তার ওপর? ঘর থেকে বেরিয়ে একবারও ফিরে তাকালো না কেন?
