পাকুড়তলা থেকে উঠে তমিজ ভিকু পাগলা আর মংলুর পিঠে হাত দিয়ে রওয়ানা হয়েছিলো উত্তরপাড়ার দিকে। কালাম তাকে ধরে আড়ালে নেয়। ভিকু পাগলাকেও ডাকে। গলা নামিয়ে বলে, তমিজ, যে নেমকহারামিটা তুই করলু তোর ফাঁসি হলেও হামি আটকাবার পারমু না রে।
উগলান পরে দেখা যাবি। মংলু বলে, দেখি আবিতনের বাপের ঘরত হামরা আগে বস্যা বুঝি।
আবিতনের বাপের ঘরে তমিজ একবার গেলে শালারা জোট বেঁধে এসে হাজির হবে। কালাম বলে, তমিজ তুই ভাগ। পুলিস আসলে ইগলান বুঝাবুঝি কিছু শুনবি না।
পুলিসের কথায় ভিকু পাগলা একটু ঘাবড়ায়, পুলিসকো হামরা সাচ কথা বলেঙে।
এদিকে রাত হয়ে যাচ্ছে। তমিজকে একরকম জোর করেই বুধা আর কালাম মাঝি তোলে নিজের ঘরে। অন্যদের বলে, তোমরা উত্তরপাড়াত যাও।
কিছুক্ষণ পর তমিজের শরীরে মাথায় ছাই রঙের একটা আলোয়ান জড়িয়ে বুধা তার পিঠে হাত ঠেকিয়ে গোলাবাড়ির পথ ধরে। ভিকু পাগলা তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে কালাম মাঝির বাড়ির বাইরের উঠানে। বুধা তার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে।
ভোর হওয়ার আগেই আমতলির দারোগা চলে আসে দুইজন কনস্টেবল নিয়ে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যমুনার মাঝিরা নৌকা বোক্সাই মাছ নিয়ে রওয়ানা হয় পোড়াদহ মাঠের দিকে। জখম মাঝিটা রয়ে গেলো কালামের ঘরে, আর পুলিসকে সামলাতে রইলো আলি মামুদ।
সেদিন পোড়াদহ মেলা। গ্রামের ঘরে ঘরে নাইওর। গ্রামের প্রত্যেকটি প্রাণী মেলায় যাবার জন্যে তৈরি হতে ঘুম থেকে উঠেছে ভোর হওয়ার অনেক আগে। সুতরাং কাউকে জাগিয়ে তোলার কষ্ট পুলিসকে আর করতে হয় নি। ফুল ইউনিফর্মে হাফপ্যান্টের তলায় মাঘের হাওয়া ঢোকায় নিম্নাঙ্গ তাদের শীতে কুঁকড়ে কুঁকড়ে যায়। সেটা পুষিয়ে নিতে ঊর্ধ্বাঙ্গের অন্তর্গত মুখে তারা অবিরাম গালাগালি করে। দারোগাকে ধরলে তিনজন পুলিসের তিন দ্বিগুণে ছয়টা পা চলতে থাকে সারা গ্রাম জুড়ে। পা পিছু দুজন করে মোট বারোজনকে তারা ধরে। তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে সবাইকে বসিয়ে রাখে কালাম মাঝির বাড়ির বাইরে। তহসেন সকালে এসেছে সাদা পোশাকে, বৌ ছেলেমেয়ে রেখে সে চলে যাবে বেলা সাড়ে দশটার মধ্যেই। বাপের কাছে সে বারবার আফসোস করে, এক নম্বর। আসামীই তো ধরা পড়লো না। কী মুশকিল। তমিজকে খুঁজতে পুলিস কোনো জায়গা। আর বাকি রাখে না। এমন কি তহসেনের কথায় তার নিজের বাড়ির ঘরে ঘরেও তমিজকে খোঁজা হয় তন্ন তন্ন করে। তহসেন তার দিকে বারবার আড়চোখে তাকালে কালাম মাঝি মুখ কাচুমাচু করে বলে, এ শালা মণ্ডলের কাম। হামার সাথে দুষমুনি করা মণ্ডলই বুঝি তমিজকে কোটে সরায়া দিলো। মণ্ডলবাড়ি একবার দেখবা নাকি?
তহসেন বলে, পাগল হলেন নাকি? শরাফত মণ্ডলের সঙ্গে বাপের বিবাদ করাটা তহসেন সায় দিতে পারে নি কখনোই। কাদেরের ক্ষমতা এখন মেলা। তার বড়োভায়ের ছেলেটা এবার ম্যাট্রিক দেবে, ছাত্র নাকি খুব ভালো। তার ছোটো বোনটা ভি এম গালর্স স্কুলে তহসেনের মেয়ের সঙ্গে পড়ে, সেটাও পরীক্ষায় ওপরদিকেই থাকে। আজিজ টাউনে বাড়ি কিনেছে হিন্দু পাড়ায়, কী সুন্দর বাড়ি। এইসব লোকের সঙ্গে তার বাপের গোলামাল। আর খাতির যতো সব ছোটলোকের সঙ্গে। গোমরা মুখ করে তহসেন বলে, আমি যাই। দুইটার দিকে ফোর্সের সঙ্গে যেতে হবে কাহালু, তেভাগার শয়তানগুলো আজ বিকালে ময়েজ সরকারের বাড়ির গোলা লুট করতে পারে। যাই। আমতলির দারোগার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় সে বলে, গোলাবড়িটা একবার দেখতে পারেন। তবে একটা রাত পুরো পেয়েছে, বেটা কি আর বসে আছে?
৪৯. কেষ্ট পালের মুখে থমথমে মেঘ
এবার পোড়াদহের মেলায় কেষ্ট পালের মুখে থমথমে মেঘ, চোখে ঘোলাটে লাল অন্ধকার। মেলার আগের দিন মঙ্গলবার সন্ন্যাসী ঠাকুরের প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর কালো মুখে লাল চোখে সে চলে যায় বাড়ির দিকে এবং পরদিন মেলা না দেখে সারাটা দিন কাটায় বটতলায় ঠাকুরের বেদীর নিচে। তার প্রাণটা ধুকধুক করে : এভাবে হেলাফেলা করে আরাধনা হলে ঠাকুরের দৃষ্টি শুভ থাকে আর দ্রুততদিন? এভাবে পূজা হলে মানুষের ভক্তিই বা টেকে কদ্দিন?
মুকুন্দ সাহা তো ভাগলো পূজার আগে আগে, আর নায়েববাবুর দর্শন অনেক কষ্টে যদিও বা মিললো, সন্ন্যাসী ঠাকুরকে নিয়ে কথাবার্তা সে যা বললো নেহায়েৎ বামুনের ঘরে জন্ম হওয়ায় তার মাথায় বজ্রাঘাত হলো না; ছোটোজাতের মানুষ তারা, তাই শুনেই তাদের যা পাপ হলো তার প্রাচিত্তির কোনো শাস্ত্রে আছে কি-না সন্দেহ।
তা নায়েববাবুর আর কী? পরিবার তো ইনডিয়ায় রেখেই এসেছে, নিজেও চলে যাবে দুই এক বছরের মধ্যেই। ইনডিয়া গিয়ে তারা বড়ো বড়ো দেবদেবীর পূজা করবে প্রাণ ভরে। সেখানে কাশী বৃন্দাবন মথুরা, সেখানে কালীঘাট নদীয়া। জাগ্রত দেবদেবীর সেখানে লেখাজোকা নাই। কিন্তু তাদের গ্রামের এই সন্ন্যাসী ঠাকুরকেও যদি অসন্তুষ্ট করে রাখে তো তাদের হালটা হবে কী? মোসলমানদের কি আর বিশ্বাস করা যায়? একটু টাকা পয়সার মুখ দেখলে দুই পাতা পড়াশোনা করলে সন্ন্যাসী পূজায় এরা বাগড়া দিতে আসে। শরাফত মণ্ডল বলেছে, মেলায় তার আপত্তি নাই। কিন্তু পূজার জায়গায়, বটতলায় মোসলমানদের আসা যাওয়া চলবে না। সে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে মোসলমানদের চলতে হবে পাক্কা শরিয়ত মোতাবেক। মেলার দিনে গোলাবাড়ি থেকে সন্ন্যাসীর থান পর্যন্ত এতকালের ঘোড়দৌড়টা সে একেবারে অনুমোদন করে না। কালাম মাঝি অবশ্য তার ওপর টেক্কা দিতে বড়ো বড়ো ঘোড়া আনতে চেয়েছিলো সেরপুরের পশ্চিমে খোন্দকারটোলা থেকে। ঘোড়া নাকি এসেও গিয়েছিলো গোটা পাঁচেক। কিন্তু মেলায় ঘোড়াদৌড়ে সওয়ারি তো সব আসে মাঝিপাড়া থেকে। এবার মেলার দিন ভোরবেলা মাঝিপাড়ার আদ্দেকের কোমরে দড়ি পড়লো। ঘোড়াদৌড় শেষ পর্যন্ত হলোই না। পাকুড়তলার মুনসি কি এটা সহ্য করবে? ঘোড়ায় করে ছুটে এসেছিলো তো মুনসির দলের সর্দার, মজনু শাহ, ভার বেশুমার ফকিরদের সঙ্গে ছিলো মুনসি। মানুষ সেই কথা ভুলে গেলে মুনসির অভিশাপ নেমে আসবে না?
