কালাম মাঝি ফের চেঁচায়, এ তমিজ, উঠা আয়। তোরা শালারা ঠিক থাকিস মণ্ডলের কোন খালে!
ভিকু পাগলা ও মংলুর দুই ও দুই চার হাত, নুলা শামসুদ্দিনের এক হাত এবং তমিজের দুই হাত,–এই সাত হাত এবং তমিজের সর্ব অঙ্গের জোরে মাছটা তখন হাঁসফাঁস করছে, শালাকে বেরুতে দেওয়া হবে না। ভিকু বলে, বহুত বড়া রুই হোগা। তমিজ আস্তে করে জানায়, না। বাঘাড়। কথা কয়ো না। তার কথা কেঁপে কেঁপে ওঠে, বাপটা কি চোরাবালির ভেতর দিয়ে পানিতে ঢুকে মাছ ধরে দিলো নাকি?
কালাম মাঝির আর সহ্য হয় না, এই কুত্তার বাচ্চা। তোর বাপ মণ্ডলের কোন খায়া ঠিক হছিলো। এখন কোন দেওয়া লাগে তোক। মনে হচ্ছে, তমিজের বাপের। দোয়া পাবার পর তার প্রতি ভক্তি রাখার দরকার কালাম মাঝির ফুরিয়ে গেছে। এর পরেও তমিজ জাল নিয়ে ব্যস্ত থাকলে কালাম মাঝি ছাড়ে তার মোক্ষম অস্তর, এই শালা হারামজাদা। কাল তুই কুদ্স মৌলবিক ওয়াদা দিছিল না। কাল শালা ঘেগি মাগীটাক লিকা করলু। এখনি মণ্ডলকে খবর দেই তো হুরমতুল্লাক ভিটাছাড়া করবি। ঐ মাগীক লিয়া তুই তখন উঠবু কুটি? হামার কাছে তোর ভিটাঘর বন্ধক আছে না? আজই ঘর ছাড়া করমু তোক। তারপর সে ডাকে কুদুস মৌলবিকে। কুদুস মৌলবি মিনমিন করে বলে, একটা মাছ তুল্যা তমিজ বাড়িত যা।
কালাম মাঝি কষে ধমক লাগায় মৌলবিকে, আরে মুনসির বেটা, চুপ করো। পয়সা খাও হামার, আর কথা কও উল্টাপাল্টা, না? যাও জুম্মাঘরত যাও। নামাজ পড়ান, লাগবি না?
জুম্মাঘর থেকে তার পদচ্যুতির সম্ভাবনায় কুদুস মৌলবি দমে যায়, যতোটা পারে চিৎকার করে সে বলে, তমিজ, তুই না কাল ওয়াদা করলু, কালাম মিয়া যা কয় তাই শুনবু। আজ আবার–।
তার কথা শেষ না হতেই একটা বর্শা এসে পড়ে মংলুর পিঠে, ঘাড়ের নিচে বর্শাটা লেগেই সেটার গতি শিথিল হয়ে এসেছিলো বলে বর্শা পড়ে যায় পানিতে। তমিজ আর ভিকু পাগলা এর পরেও জাল না ছাড়লে আরেকটি বর্শা বিধে গেল তমিজের কনুইতে। শিথিল হাতের ভেতর দিয়ে জালের দড়ি খুলে যায়। মুনসির পান্টিই কি বর্শা হয়ে বিধলো তার কনুইতে? তা মুনসি হোক আর যেই হোক তমিজ তাকে ছাড়ছে না। এখন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পানিতেই কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে-থাকা লোকটি ভয়ে কাঁপছে। বোগাপটকা, বয়স পঞ্চাশের কম নয়। দেখেই বোঝা যায়, এ শালার জাল নাই, নৌকা নাই; পরের মাছ-ধরা নৌকায় শালা জন খাটে। বর্শাটাও তেমন জোরে মারতে শেখে নি, এর কাছে বর্শা যা, পান্টিও তাই। তমিজ নিজের বাঁ হাতের কনুই থেকে বর্শা উপড়ে নিয়ে বড়ো একটা নিশ্বাস টেনে নিয়ে ছুঁড়ে মারলো লোকটার মুখ বরাবর। লোকটা লাফ দিয়ে ওঠায় বর্শাটা বেঁধে তার গলার নিচে। সঙ্গে সঙ্গে সে পড়ে যায় বিলের পানিতেই, অনেকটা জায়গা জুড়ে পানি দেখতে দেখতে লাল হয়ে ওঠে এবং তমিজের জালের বড়া মাছটাও জাল ছিড়ে বেরুবার সময় তার বহুকালের ল্যাজ, পেট, পিঠ ও মাথা ঝাকালে পানিতে ঢেউ ওঠে এবং রক্তাক্ত পানির ঝাপটায় মনে হয় বিলে বুঝি আগুন লেগেছে।
গলায় বর্শা বেঁধা মানুষটাকে ডাঙায় উঠিয়ে ফেলে যমুনার মাঝিরা। তাকে ঘিরে যমুনার মাঝিদের ভিড় দেখে শাকের মামুদ তাদের উঠিয়ে দেয়, এটি তামশা দেখবার আসিছে, না? যাও যাও বেড় জালটা খাটাও। শিমুলতলা এখনো খালিই পড়া আছে। যাও সোগলি যাও।
এদিকে তমিজের বর্শায় আহত মানুষটা বেহুঁশ হয়ে রইলো, তাকে শোয়াননা হয়েছে চোরাবালির বেঁটে দেওয়াল ঘেঁষে। কালাম মাঝি লোক পাঠিয়েছে করিম ডাক্তারকে ডাকতে। কিন্তু আলি মামুদ বলে, আগেই ডাক্তার কিসক? পুলিস জখম দেখবি না? জখম না দেখলে মামলা শক্ত হয় ক্যাংকা কর্যা?
আরে আমতলির দারোগা তো আমার বেটার কথাত উঠবি, তার কথাত বসবি। কালাম মাঝির এই আত্মবিশ্বাসে আলি মামুদ কিংবা শাকের মামুদ টলে না, দারোগা, তাই দারোগাই। দারোগা নিজের বাপেকও ছাড়ে নাকি?
এদিকে তমিজের দিকে তেড়ে এসেছিলো যমুনার মাঝিদের মেলা ছোঁড়া। মংলু, ভিকু পাগলা, আবিতনের বাপের নেতৃত্বে মাঝিপাড়ার ছোঁড়ারা তাদের ঠেকায়, তবে তমিজের পিঠে বাঁশের একটা চোট লেগেছে বেশ ভালো ভাবে। কিন্তু যমুনার নেতৃস্থানীয় মাঝিরা এখন গোলমাল সহ্য করছে না, আগে মাছ ধরো। বেলা তো ড়ুবাই গেছে, বাতি জ্বালাও, মাছ ধরো।
কালাম মাঝি তাদের আশ্বাস দেয়, তহসেন তো আর এটি আসবার পারে না। অর হুকুম পায়া আমতলির দারোগা ফোর্স লিয়া খাড়া হয়া আছে গোলাবাড়ি হাটেত। এখনি আসিচ্ছে।
না। এখন থাক। আলি মামুদ বাধা দেয়, হামাগোরে মাছ ধরা হোক। মাছ ধরা পোড়াদহ পাঠাঁই আগে। পুলিস আসলে শালারা আদ্দেক মাছ লিয়া যাবি।
তমিজের ওপর কালাম মাঝি এতোটাই রেগে গেছে যে পারে তো এখনি গলায় পা দিয়ে তাকে শেষ করে ফেলে। কিন্তু তার জন্যে তার উদ্বেগও অন্তত চার আনা। একবার ইচ্ছা করে, কোমরে দড়ি বেঁধে তৌড়া জালের মতো তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় চোরাবালির ঠিক মাঝখানটায়। কুত্তার বাচ্চা বালুর মধ্যে মরুক দম বন্ধ হয়ে। আবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়। হয়, ছোঁড়াটাকে যদি পুলিস একবার ধরে তো জেলের ঘানি টানবে সারাটা জীবন। এদিকে মাঝিপাড়ার মানুষ সব জোট বাঁধতে শুরু করেছে উত্তর পাড়ায়। সবাই যদি এদিকে আসে তো শালার মাঝির জাত, কোনো বিশ্বাস নাই, কালাম মাঝির টিনের নতুন আটচালায় আগুন ধরিয়ে দেবে। কালাম এখন কী করে?
