রাগে ও দুঃখে হোক কিংবা পরে মাছ পাবার আশ্বাসেই হোক, আবিতনের বাপ। জাল ও খলুই রেখে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। কিন্তু তার খলুইটা হাতে নেয় ভিকু এবং আলি মামুদকে বলে, ইগলান ফালতু বাত কেয়া বলতা? তোম যমুনা আর গঙ্গা কাহেকা মাঝি না জেলে না নিকারি কেয়া হ্যায় তো হামারা বাল ছিড়েগা? গিরিরডাঙার মাঝিরা পোড়াদহ মেলামে মাছ বেচেগা নেহি?
রীতিমতোন খাজনা দিয়ে একদিনের জন্যে জমা নিয়ে মাছ ধরতে আসা যমুনার বনেদি মাঝিসর্দারের পক্ষে এতোটা সহ্য করা সম্ভব নয়, শোভনও নয়। আলি মামুদ কারো গায়ে হাত তোলার মানুষ নয়। সে পেছনে আড়চোখে একবার তাকায়, অমনি তার বেঁটে খাটো এক সঙ্গীর হাতের প্রবল এক ধাক্কায় ভিকু পড়ে যায় একেবারে নিচে। তার মুখ থেকে পেট পর্যন্ত ড়ুবে যায় পানিতে, তবে কোমর থেকে বাকিটা থাকে ডাঙার ওপরেই। উত্তর পাড়ার নুলা শামসুদ্দিন ভিকুর শরীরের প্রথম আদ্দেকটা তুলতে নেমে পড়ে পানিতে। তবে তার বাঁ হাতটা নুলো বলে শুধু ডান হাতে কিছু করতে পারে না। তবে ততোক্ষণ ভিকু তার শরীরের ডাঙার অংশটিও টেনে নিয়েছে পানিতে এবং একটুখানি সাঁতার দিয়ে পুরো শরীরটাই সে তুলে ফেলে ডাঙার ওপর, কিন্তু পানিতে তার টুপিটা ভেসে গেছে, তার ধুতির হালও এমন হয়েছে যে ওটা পরার উদ্দেশ্যই এখন ব্যর্থ। ধুতিটা কোনোমতে জড়িয়ে পরে ভিকু বারবার তার মাথায় হাত দিতে থাকে, . সেটা কি টুপির শোকে, না চুলের পানি ঝেড়ে ফেলতে তা তারও জানা নাই।
আবিতনের বাপ হনহন করে ছোটে কালাম মাঝির বাড়ির দিকে। হাঁটে গজর আর গজর করে, তাদের গ্রামে এসে, তাদেরই বাপদাদাপরদাদার বিলে মাছ ধরে ভিন ঠেনের মানুষ, আবার তাদের মারধোর করে,-এ কেমন কথা? তাদের নেতা কালাম মাঝি কি এর একটা বিহিত করবে না?
কিন্তু কালাম মাঝির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো বুধা, সে জানায়, মামু গেছে তমিজের বাপের গোর জেয়ারত করবার।
আবিতনের বাপের পিছে পিছে এসেছে ভিকু পাগলা। সে অবাক হয়, তমিজের বাপের গোর? উও তো কেয়া বলতা চোরাবালিমে–! মামা তার সেখানেই গেছে। বলতে বলতে বুধাও তাদের সাথ ধরে।
আবিতনের বাপ সেদিকে ছুটলে ভিকু পাগলাও যেতে যেতে একটা হাঁক ছাড়ে তমিজের বাড়ির সামনে এসে। কুলসুম ভেতর থেকে জানায়, কিছুক্ষণ আগে তমিজ গেছে পাকুড়তলায়। জাল নিয়েই গেছে।
চোরাবালির তিনদিকে ঘেরা খাটো দেওয়ালের এক কোণে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে জিয়ারতের দোয়া পড়ছে কুদ্স মৌলবি, তার পাশে মোনাজাতের হাত তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে কালাম মাঝি। তার দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার দাড়িতে। দাড়ি এখনো তার তেমন বাড়ে নি। তবে দাড়ি হচ্ছে বেশ চাপ বেঁধে। মাথায় পরিষ্কার কিস্তি টুপি। কয়েক গজ দূরে ইটখোলার ইটের সারির পাশে হাঁটতে হাঁটতে একটা বেড় জাল ফেলার জুতসই জায়গা জরিপ করছে যমুনার আরেক সর্দার মাঝি, আলি মামুদের ভাই শাকের মামুদ। তার আশে পাশে বেশ কয়েকজন মাঝি। মস্ত বড়ো জালটা ধরে রয়েছে অন্তত তিনজন লোক।
বুধা সবাইকে ছাড়িয়ে চলে যায় আরেকটু উত্তরে, সেখানে মস্ত একটা তৌড়া জাল উড়িয়ে দিচ্ছে তমিজ। ৰিলের ঠাণ্ডা সর-পড়া পানিতে ছপাস আওয়াজ করে জালটা পড়তেই কালাম মাঝি হাত মোনাজাতে রেখেই এদিকে তাকায়। বুধা গিয়ে ধরে ফেলে তমিজের হাত, চাচা, তমিজ চাচা, আকজার দিনটা বাদ দে। মামু যমুনার মাঝিগোরে কাছ থ্যাকা মেলা ট্যাকা লিয়া আজকার জন্যে বিল জমা দিছে। তুই আজ আর মাছ ধরিস না চাচা। আজ থাক।
জাল ওঠাও। জাল ওঠাও। শাকের মামুদের এই কড়া হুকুমে তমিজ ফিরেও তাকায় না। কিন্তু জিয়ারত ছেড়ে কিংবা জিয়ারত সেরে ছুটে আসে কালাম মাঝি। তমিজের পাশে দাঁড়িয়ে সে বলে, তুই পাগলা হলু? তোর বাপের মাজার জিয়ারত করা তার দোয়া লিয়া আজ কাম শুরু করনু। তোর বাপের অছিলাত হামরা মাঝিরা বিল ফেরত পানু। হামি বিল পত্তন নিলাম। আজ যমুনার মাঝিরা মাছ ধরবি, ওরা হামাক খাজনাও দিছে। তুই জাল ওঠা।
বুধা তমিজের কানের কাছে মুখ নিয়ে সাবধান করে দেয়, যমুনার মাঝিরা সব মারকুটা মানুষ। আবার তহসেন ভাই কয়া রাখিছে আমতলির দারোগাক। খবর পালেই
পুলিস আসবি মটোরেত চড়া। তুই ওঠ বাপু।
কিন্তু ততক্ষণ তমিজের হাতে শক্ত টান পড়েছে। জালে ঢুকছে মস্ত কোনো মাছ। বেশ বড়ো মাছ। তমিজ ফিসফিস করে বলে, বুধা, বাপজান বাঘাড় ধরিছিলো না? তুইও তো সাথে আছিলু? মনে হয় ওই বাঘাড়টা!
বুধার গা শিরশির করে উঠলে সে চুপ করে। তমিজ বোঝে ডাঙায় দাড়িয়ে এই মাছ তোলা অসম্ভব। সরসর করে সে নেমে পড়ে ঠাণ্ডা পানিতে। ডাঙার তুলনায় পানি কম ঠাণ্ডা আর উরুতে গত রাত্রির ফুলজানের উরুর তাপ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তার মনোযোগ এখন জালের দড়ি টানার দিকে। বড়ো মাছের আভাস পেয়ে তার সঙ্গে সঙ্গে পানিতে নেমে পড়েছে ভিকু পাগলা, নুলা শামসুদ্দিন আর শামসুদ্দিনের ভাগ্নে মংলু। সবাই মিলে তারা জাল টেনেও হাপসে হাপসে যাচ্ছে, মাগো! কী মাছু না জানি আজ ধরা পড়লো গো!
শাকের মামুদ এবার সরাসরি ফয়সালা করতে চায় কালাম মাঝির সঙ্গে, কালাম মিয়া, বিলের ব্যামাক ঘাটোত তোমাগোরে মাঝিপাড়ার মানুষ জাল লিয়া আসিছে। ইগলান কী? তুমি হামাগোরে পয়সা ঘুরা দাও। মাছ ধরবার আসা এংকা হুজ্জত করবার পারমু না আমরা। পয়সা ঘুরা দাও। হামরা যাই। তবে ফিরে যাবার কোনো লক্ষণ তাদের নাই। বরং যমুনার মাঝিদের হাতে জাল ও পলো ছাড়াও যেসব অস্তর দেখা। যাচ্ছে সেগুলো দিয়ে শুধু মাছই মারা যায় না। কালাম মাঝি সবই খেয়াল করে এবং চি স্কার করে বলে, শালা হামাগোরে মাঝিপাড়ার মানুষ ইগলান কী করিচ্ছে? শালারা তো মরবি গো! শাকের মামুদ বলে, না গো, পয়সা ঘুরা দাও। আগে শরাফত মিয়াক খাজনা দিয়া হামরা বছর বছর মাছ ধরিছি, কেউ ক্যাচাল করে নাই। তোমাক খাজনা দিয়া অ্যাসা মুসিবতে পড়লাম।
