আবার তমিজের মতিগতি বোঝা তো কালাম মাঝির জন্যেও দিন দিন মুশকিল হয়ে পড়ছে। এর ওপরেই সে ভরসা করছিলো বেশি। তমিজের বাপ কম করে যায় নি। ঐ বছর পোড়াদহ মেলার মাছ ধরতে মণ্ডলের হাতে মানুষটার এতো হেনস্থা হওয়াতেই
মাঝিদের দখল এসেছে কালাহার। তারই বেটা, মণ্ডলের সঙ্গে লাগতে গিয়ে জেলও খাটলো। তাকে হাতে রাখাটা কালাম মাঝির খুব দরকার।
কয়েকবার তার ঘরে উঁকি দেওয়ার পর তমিজের দেখা মিললো। ভাত খেয়ে উঠে সশব্দে সে কুলকুচো করছিলো দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। পেছনে কুপি হাতে কুলসুম। খোলা দরজা দিয়ে ঢোকা হাওয়ায় তার হাতে কুপির শিখা কাঁপে! এই ভরযুবতি মেয়েমানুষটা ঘরে থাকে একলা, পাশে তার সৎবেটা। তবে এই নিয়ে আরো কিছু ভাববার আগেই কালামের নাকে লাগে মাগুর মাছের গন্ধ। তার মগজে মাগুরের কাঁটা ফুটলে সে বলে, তমিজ মাছ ধরিস চুরি করা? খাবার হাউস করে হামাক কলেই তো হয়। মানষে তোক মাছচোর কয়, হামার গাওত লাগে!
কাৎলাহার বিল থ্যাকা মাছ নিলে চুরি করা হয় ক্যাংকা করা? বিল না মাঝিগোরে এ সোগলির?
সবই তো জানিস। কালাম মাঝি তাকে একটু বোঝাতেই এসেছিলো, কিন্তু এসেই কালাহারের মাগুরের গন্ধে এবং কুলসুমের কুপির আলোয়-কাঁপা মুখ দেখে তার গলা হঠাৎ চড়ে যায়, তোরা কি হামাক পুলিস ডাকবার কোস? তহসেনেক তো হামি বুঝসুঝ দিয়া রাখিছি। এখন তুই কি হামার লিজের চাচা ভাই জ্ঞাতিগুষ্টির কমোরেত দড়ি বান্দিবার কোস?
তমিজ জবাব না দিয়ে ভেতরে চলে গেলে কালাম মাঝি বলে, বাপের বুড়া বয়সের জোয়ান বৌটাক লিয়া একলা থাকিস, কিছু কই না। আবার বিলের মাছও চুরি করিস। কতো সহ্য করমু? কালাম মাঝি ফিরে যেতে যেতে কুলসুম ও তমিজের এভাবে একসঙ্গে থাকা নিয়ে কীসব বলে, তমিজ ওসব পাত্তাই দেয় না।
তমিজের ভাবনা এখন ফুলজানকে নিয়ে। সেদিন মোষের দিঘির ঢালে অনেকটা আমন কেটে সন্ধ্যাবেলা তমিজ দাঁড়িয়ে ছিলো দিঘির ধারে। রোজকার মতো ফুলজান এসেছে, কিন্তু কাজকামে তমিজের ভুল ধরার বদলে সে হঠাৎ ঢলে পড়ে তার বুকের ওপর। তমিজের হাতে তখন ধান কাটার কাস্তে, ভাগ্যিস সেটা পড়ে গিয়েছিলো তার হাত থেকে, নইলে ফুলজানের হাত পা বুক পেট যে কোনো জায়গায় জখম হয়ে যেতো। ফুলজান তার বুক থেকে মাথা ফিরিয়ে নিয়ে কাঁদতে শুরু করে। সে কাঁদে, কেবলি কাঁদে। তমিজ হতভম্ব হয়ে বলে, কান্দো কিসক? বারবার এই প্রশ্ন করলে ফুলজান বলে, আজ মা হামক পিঠেত খড়ি দিয়া পিটিছে। কেন? তার মা তাকে মারবে কেন? ফুলজান ফের ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে এবং জানায় যে, কয়েকদিন হলো ভাতে তার রুচি নাই। নতুন চালের ভাত সর্ষের তেল পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে মেখেও সে মুখে তুলতে পারে না। তার খালি বমি বমি লাগে। এক পোড়া মাটি আর তেঁতুল ছাড়া আর কিছুই তার রোচে না।
তা তেঁতুল জোগাড় করা তমিজের জন্যে এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়। মোষের দিঘির দক্ষিণে ভবানীর মাঠেই জোড়া তেঁতুল গাছ। দুটোতেই ভূত পেত্নী থাকে বলে লোকে ঐ গাছ থেকে তেঁতুল সহজে পাড়ে না। তা ফুলজানের জন্যে না হয় ভূত পেত্নীর সঙ্গে মারামারি করবে। তবে ভয়ও তার হয় বৈ কি। চুপচাপ বাজার থেকে তেঁতুল এনে দিলেই বা ফুলজান কি আর জিগ্যেস করতে যাবে? কিন্তু ফুলজান তাকে ধিক্কার দেয়, তুমি এক আবোর মাঝির আবোর বেটা, কিছুটা বোঝে না? এখন গলাত দড়ি দেওয়া ছাড়া হামার গতি নাই। তুমি হামাক একটা দড়িই না হয় কিন্যা দাও।
তখন ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে তমিজের শরীর কাঁপে। তার বাপ কি তাহলে মরতে না মরতে এসে ঢুকে পড়েছে ফুলজানের পেটের ভেতরে? পাকুড়গাছ যদি চিরকালের জন্যে হারিয়ে গিয়ে থাকে তো লোকসান নাই, বাপ তার ঠাঁই একটা ঠিকই বেছে নিয়েছে। উত্তেজনা তার এতোই বাড়ে যে ফুলজানকে জড়িয়ে নিজের বুকের সঙ্গে সে আঁকড়ে ধরে প্রবল বেগে। তার মুখে, চোখে, কপাল, ঘ্যাগে ও বুকে নিজের মুখ ঘষতে ঘষতে তার মনে হয়, মাঝির বেটার সঙ্গে এবার বেটির বিয়ে না দিয়ে হুরমতুল্লার আর পথ নাই। তবে বিয়ের আগে জমির ব্যাপারটা সে ফয়সালা করে নেবে।
আজ কালাম মাঝির ঝাঝালো কথাবার্তা শোনার পর নিজের ঘরে শুয়ে তার বাম চোখের পাতা কাঁপতে থাকে প্রবল বেগে। লক্ষণ তো ভালো নয়। মেলার আর বাকি। দুইদিন। কাল বাদে পরশু কাৎলাহার বিলে ঝাঁপিয়ে পড়বে মাঝিপাড়ার সব মানুষ, সেখানে কালামের পক্ষে সে যদি দাঁড়ায় তো ফ্যাকড়া মিটে যায়। ফুলজানকে নিয়ে এখানে চলে এলে তাদের আগলে রাখবে কালাম মাঝিই।
কিন্তু ভোরবেলা কালাম মাঝির বাড়ি গিয়েও সে ফিরে আসে বাইরে থেকেই। তাকে সোজাসুজি না বলাই ভালো। কেরামত আলিকে বললে হতো! কিন্তু ফুলজানের সঙ্গে তার বিয়ের খবর কি কেরামতকে বলাটা ঠিক হবে? বুধাকে বলা যায়?—এসব ভাবতে ভাবতে দেখা হয়ে যায় কুদুস মৌলবির সঙ্গে। মৌলবি তাকে দেখে আক্ষেপ করে, কালাম মিয়া মসজিদের বেড়া নতুন কর্যা দিলো। তাও তোমরা জুম্মাঘরের দিকে একবার পাও দাও না? বাপু খাটাখাটনি যতোই করো, একদিন তো যাওয়াই লাগবি, ঐদিন কী লিয়া যাবা, কও তো?
তমিজ সঙ্গে সঙ্গে ওয়াদা করে, জমিতে যাবার আগে ফজরের নামাজটা সে জুম্মাঘরেই পড়ে যাবে। কিন্তু আপাতত সে যে একটা বিপদে পড়েছে, হুজুর ছাড়া তাকে উদ্ধার করবে আর কে? বিপদের কথায় কুদুস মৌলবি ঘাবড়ায়, আবার কাউকে উদ্ধার করার সাবাশি নেওয়ার লোভও তার কম নয়। মাঝিপাড়ার অসুখ বিসুখে সে পানিপড়া দেয়, কিন্তু নেমকহারামের বাচ্চাগুলো পয়সা দিয়ে মানত যা করার সব করে আসে পোড়াদহ মাঠে। তমিজের দিকে তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, মানষের কাম করা লাভ নাই। এটিকার মানুষ বড়ো নেমকহারাম। কাম হলে আর ফিরাও দ্যাখে না।
