তমিজ জানায়, তার দেওয়া থোওয়া সব আগাম-কাজটা কী?-হুরমতুল্লার বেটির সঙ্গে বিয়ে হলে তার বড়ো উপকার হয়। কিন্তু মণ্ডলের ভয়ে পরামাণিক সাহস পায় না। এক কালাম মাঝি যদি অভয় দেয় তো কাজটা সে করতে পারে, তার আর মুসিবত হবে না। সব শুনে কুদুস মৌলবি গম্ভীর হয়ে যায়। দাড়িতে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে বলে, ঠিক আছে। আমার কথা কালাম মিয়া কোনোদিন ফালাবার পারে না। তুই মগরেবের পরে জুম্মাঘরত আয়।
দুপুরবেলা হুরমতুল্লার বৌ তাকে দেখে প্রথমে কটমট করে তাকায়। কিন্তু রাগী চোখে দেখতে দেখতে পানি জমে এবং এদিক ওদিক তাকিয়ে হুরতমুল্লার অনুপস্থিতি সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হয়ে কাঁদে আর বলে, তুমি আমাগোরে কী সব্বোনাশ করলা বাবা? ছোটোজাতের মানষেক ঘরত ঢুকবার দিয়া ফুলজানের বাপ ইগলান কী করলো? তোমার আর কী, হামাগোরে সব গেলো!
তমিজ মাথা নিচু করেই বলে, সব্বোনাশ কিসের? তোমার বেটিক বিয়া করমু। কও তো আজই করবার পারি। ফুলজানের বাপোক কও। ফুলজানের মা তবু চুপচাপ কাঁদতে থাকলে তমিজ আশ্বাস দেয়, বিয়া করার কথা ভো হামি আগেই কয়া রাখিছি।
মাঝির বেটার সাথে বিয়া দিলে হামরা এটি থাকবার পারমু?
তালে বিয়া দিও না, হাটোত যায়া সব কথা কয়া দেই তো কী হবি?
হুরমতুল্লাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে তমিজ হনহন করে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। নবিতন তার পিছে পিছে গিয়ে তাকে আটকায়। চাপা গলায় বলে, তোমার কান একটা বোগদাক দেখ্যা বুবু যে ক্যাংকা করা আটক্যা গেলো হামি বুঝি না। তারপর শক্ত করে চেপে চেপে বলে, মাঝির বেটা, বুবুক লিকা তোমার করাই লাগবি। না হলে বুবু গলাত ফাঁস দিবি। হামি বাপজানেক কয়া বুঝ দেমো। বাপজান হামার কথা শুনবি। এই মেয়েটির প্রতি হুরমতুল্লার একটু বেশি দুর্বলতার কথা ফুলজানও তাকে নালিশ করে বলেছে। এই দুর্বলতা এখন ফুলজানেরই কাজে আসছে দেখে তমিজ হুরমতুল্লার এর প্রতি পক্ষপাতিত্ব অনুমোদন করে। নবিতন ফের বলে, আজ সকাল সকাল বাড়িতে যাও। আজ রাতে ভালো কাপড় পরা আসবা। বিয়া আজই হওয়া লাগবি।–
সারাটা দিন তমিজ ধানের আঁটি বয়ে বয়ে এই বাড়ির উঠানে গাদা করে রাখলো। আর গোনাগুনতি চললো, আজ তার সঙ্গে সঙ্গে থাকলো নবিতন। ফুলজানের কোনো দেখাই পাওয়া গেলো না। নবিতনের দাঁতগুলো উঁচু, কিন্তু নাক বেশ চোখা আর তার। গলায় ঘ্যাগের আভাস মাত্র নাই। কিন্তু ফুলজানকে না দেখে দেখে তমিজের কাজে ভুল হয়, গুনতে ভুল হয়, আঁটি সাজানো এলোমেলো হয়ে যায়। ফুলজানকে না হলে তার। চলবে কী করে?
জুম্মাঘরে যেতে যেতে তমিজের রাত হয়ে গেলো। এশার নামাজ শেষ করে মুসল্লিরা বাড়ি ফিরছে। কালাম মাঝি তাকে দেখে শব্দ না করে কেবল দাঁত ফাঁক করে হাসে।। তার হাসি মোলায়েম দেখাচ্ছে কি অন্ধকারে? না-কি তমিজকে সে অভয় দিচ্ছে বলে হাসিতে তার ছায়া পড়লো, তমিজ ঠিক বুঝতে পারে না। কুদুস মৌলবি বলে, আসার কথা কলাম মগরেবের বাদে, আর তোর সময় হলো এখন? নামাজ পড়ার ভয় কি তোরগোরে এতোই? আখেরাতে কী লিয়া যাবু, ক তো বাপু।
তমিজ কাচুমাচু হয়ে থাকলে কুদুস মৌলবি আসল কথা ছাড়ে, তোর কাম হবি। আরে কালাম মিয়া হামার কথা ফালাবার পারে? কলো, তুই বিয়া কর্যা বৌ লিয়া বাড়িতে উঠবু। মণ্ডলের ভয় করিস না। তোর বাপের কথা কয়া কালাম মিয়া কান্দিলো। কয়, তার বেটা, হামার দায়িত নাই? বিয়ার খরচও কিছু দিবার চাছে। চিন্তা করিস না। উপরে আল্লা, নিচে কালাম মিয়া।
তো আপনে চলেন। কালাম মাঝির এরকম আশ্বাস যেন তমিজ আশাই। করছিলো। তাই কোনো উচ্ছ্বাস দেখায় না। তার এখন দরকার মৌলবিকে, নিজগিরিরডাঙাত চলেন। লিকা আজই পড়ান লাগবি। মণ্ডলের জামাতের কোনো মুনসি লিকা পড়াবার রাজি হবি না। চলেন।
এখনি? ক্যাংকা করা? কুদুস মৌলবির আজ দাওয়াত আছে আবিতনের বাপের বাড়িতে। আজ হয় না। কালাম মিয়া কলো, মেলাটা পার হোক। মেলার দিন তোক থাকা লাগবি কালাম মিয়ার সাথে। মাঝিরা হুজ্জত করলে তোক সামলান লাগবি। মেলাটা পার হোক।
তা কালাম মাঝির পক্ষে থাকতে তমিজ তো একশোবার রাজি। কিন্তু হুরমতুল্লা বুড়াক তো হামি জবান দিয়া আসিছি। লিকা পড়ান লাগবি।
তোর শ্বশুর হবি, তাক তুই কোস বুড়া, তার নাম ধরিস? নাম তমিজ, কিন্তু কথাবার্তা বেতমিজি।
আদব ও তমিজ এস্তেমাল করার জন্যে কিংবা বিরক্ত হয়ে তমিজ কয়েক পুলক চুপ করে থাকে। কুদুস মৌলবি বলে, জবান দিলেই রাখা লাগবি, এমন কোনো কথা নাই। আল্লা সব বোঝে, বান্দার সুবিধা অসুবিধা তার নজর এড়ায় না।
না হুজুর। অপনাগোরে কথা আলাদা। নামাজ রোজা করেন, আল্লা আপনার। অসুবিধা দেখবি। আমার নামাজ নাই, বন্দেগি নাই, আল্লা হামাক দেখবি কিসক? জবান দিছি, হামাক আজ বিয়া করাই লাগবি।
কুদুস মৌলবি তমিজের সমস্যাটা বোঝে। কিন্তু কালাম মিয়ার সাথে একটু বোঝা লাগে।
বোঝার দরকার কী হুজুর? আজ আপনে খালি লিকা পরায় আসেন। বৌ তো হামি ঘরত লিয়া আসিচ্ছি না।
লিকা পড়ার খরচপাতি আছে, জানিস তো?
হুরমতুল্লার ঘরের মেঝেতে মাদুর পাতা হয়েছে, মাদুরের ওপর নবিতনের বোনা কাঁথা, সেখানে ফুল আছে, মাছের ছবিও আছে। আবার ছোটো একটা কথা, তার ওপর বসলো তমিজ আর মৌলবি। হুরমতুল্লার ছোটো শালা এসেছিলো ভাগ্নীদের মেলায় নাইওর নিতে, ছেলেটা প্রথমে গম্ভীর হয়ে বসেছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবিতন আর ফালানির সঙ্গে সে বিয়ের আমোদে মেতে ওঠে। অতো রাতে হুরমতুল্লা তাকে দিয়ে গোলাবাড়ি হাট থেকে বাতাসা কিনে আনায়।
