তোমার মাথা পুরা খারাপ হছে। ইগলান হাবিজাবি কী কও গো? তমিজের শাসন করার চেষ্টা চাপা পড়ে তার ভয়ের নিচে। পাঁচাল পাড়া বন্ধ করো। আর চারটা ভাত দেও।
তমিজের ভয়-পাওয়া গলার ধমকে কাবু না হয়ে কুলসুম হাঁড়ি থেকে ভাত তুলে দেয় হাত দিয়ে। তারপর জানায় তার বাপের আজকের অভিযোগ-কাম-হুঁশিয়ারিটি, তুমি বলে হুরমুতল্লার ঘেগি বেটিটাক লিকা করিছো? তোমার বাপ কয়, বেটা যেটি খুশি লিকা করুক, কিন্তু বৌয়ের সাথে থাকবার পারবি না।
তমিজ চমকে উঠলে তার গলায় ভাত আটকে যায়। পানি খেয়ে ফের খেসারি ডাল দিয়ে ভাত মাখে আর ভাবে, শালা শরাফত মণ্ডল হুরমতুল্লাকে যেভাবে শাসাচ্ছে, বুড়া খুব ভয় পেয়ে গেছে। মাঝির বেটার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিলে মণ্ডল হুরমতুল্লাকে জমি বর্গা করতে দেবে না। ওর জমি বর্গা করার দরকার কী? ফুলজানের হিস্যা বিঘা দেড়েক জমি তমিজ পাবে, অন্য দুই মেয়ের ভাগও চাষ করবে সে নিজেই। হুরমতুল্লা তো থাকবেই, বুড়া চাষবাসের তদারকি করে ভালো। এই সাড়ে চার বিঘা জমিতে তমিজ যে ফসল তুলবে, তার সঙ্গে আর কারো জমি বর্গা করে তার ও তার শ্বশুরের ও কুলসুমের চমৎকার চলে যাবে। ধান বরং খাওয়ার পর আরো বাঁচবে। সেই থেকে তমিজ বাপের জমি আর ভিটাঘর সব উদ্ধার করবে।
এখন এই কথাগুলো বাপজানকে জানায় কে? তাকে জানাতে স্বপ্নে বাপকে আসার সুযোগ দিতে তমিজ তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চায়। কিন্তু ঘুমাতে না ঘুমাতে স্বপ্নে বাপের বদলে সে দেখে কালাহার বিল সে পার হচ্ছে সাঁতরে। ফকিরের ঘাটে পানিতে নামলো, উত্তরপুবে সাঁতরে সে পাড়ি দিচ্ছে বিলের পানি। ওপারে ঘাট। ঘাট থেকে নামলেই মোষের দিঘি। মোষের দিঘির ওপর তালগাছের নিচে উঁইটিবির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুলজান। ফুলজানের কোলে বাচ্চাটার রোগ যেন সেরে গিয়েছে। সবই দেখছে। কিন্তু বিলের মাঝামাঝি পৌঁছুতেই তমিজের ঘুম ভেঙে যায়। পাশের ঘরে একা একাই কথা বলে চলেছে কুলসুম। অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করতে করতে তমিজ ফের ঘুমিয়ে পড়ে।
৪৭. অপশন দিয়ে পাকিস্তানে এসে
অপশন দিয়ে পাকিস্তানে এসে এ এস আই পোস্টে প্রমোশন পেয়ে ও বাপকে দিয়ে ইসমাইল হোসেনকে ধরে নিজের জেলা সদর থানায় বদলি হবার পর তো বটেই, এর আগেও চাকরি জীবনে তহসেনউদ্দিনকে এমন কি হিন্দু বড়োবাবুদের হাতেও এরকম বিপাকে পড়তে হয় নি। বৈশাখের শুরুতে মাঝিদের উৎপাতে তার মেজাজটা খিচড়ে যায়। দিনে দিনে, মাসে মাসে এবং ঋতুতে ঋতুতে তার মেজাজ চড়ে চক্রবৃদ্ধিহারে। এটা কেমন কথা?—নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে রীতিমতো রশিদ নিয়ে তাদের লিজ নেওয়া বিল, সেখানে কাকে দিয়ে মাছ ধরাই আর নৌকা বাওয়াই আর পানি সেঁচি,-সেটা আমার ব্যাপার। তাতে কার কী করার আছে? বাবাকে তহসেন অনেকবার বলেছে, যমুনা পাড়ের মাঝিদের ডেকে একদিন শিমুলতলায়, একদিন ফকিরের ঘাটে, একদিন পাকুড়তলায় আরেক দিন কালাম মাঝির বাড়ির ঘাটে জাল ফেলা হোক। কিন্তু কালামের এক কথা, ধৈর্য ধরো, ধৈর্য ধরো। আরে ধৈর্যের তো একটা সীমা আছে।-মণ্ডলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে সপ্তাহে অন্তত তিন দিন, হয় ভোরবেলা, নয়তো সন্ধ্যায়, এমনকি বর্ষার সময় ভরদুপুরে এখানে ওখানে ঝুপঝাপ করে কেউ না কেউ জাল ফেলছেই। বাবা বলে, বাপু, লিজেগোরে মানুষ, এরা নিনজর দেয় তো গাঁওত মানইজ্জত লিয়া থাকা যাবি? লিজের মানুষের বল না থাকলে মণ্ডলেক আঁটো করা। কঠিন। কখনো সে আবার আশ্বাস দেয়, সবুর করো। মাঝির জাত, এই কোদ্দো করে, আবার এই দরদ করে। এই আগুন, এই পানি। হামিও তো বাপু মাঝির বেটা, মাঝির রগ হামার জানা আছে।
কালাম মাঝি এরকম কথায় কথায় নিজেকে মাঝির বেটা বলে ঘোষণা করে, তহসেনের এটা পছন্দ হয় না। আবার বাপকে কষ্ট দিতেও মন থেকে সায় পায় না। ছেলের ওপর সন্মায়ের জুলুম সহ্য করতে না পেরেই কালাম মাঝি তাকে নিয়ে দিয়ে এসেছিলো তার প্রথম পক্ষের দূর সম্পর্কের এক বোনের বাড়ি। বোনাই ছিলো খেতলালের কনস্টেবল, পরে বদলি হয়ে চলে যায় অনেক দূরে, মালদা জেলার ইংরেজবাজার থানায়। খালার বাড়িতে থেকে তাদের কুয়ার পানি তুলে দিয়ে, বাজারঘাট করে, খালাতো ভাইদের চোপার বাড়ি খেয়ে তহসেন লেখাপড়াটা চালিয়ে গেছে অনেক কষ্টে। এক বছর বাদ দিয়ে দিয়ে সে ফেল করতো, কিন্তু বাপের মানি অর্ডার ফেল করে নি কোনোদিন। ক্লাস নাইনে একবার ফেল করতেই তার খালু পুলিস সাহেবকে ধরে তাকে পুলিসে ঢুকিয়ে দিলো, আবার ওই সঙ্গে বিয়েও দিলো নিজের মেয়ের সঙ্গে। বৌ তার মাঝির বংশের মেয়ে হলে কী হয়, মানুষ হয়েছে দূরে দূরে। তার ভাষা প্রায় ভদ্দরলোকদের মতে, সে উর্দু বলতে পারে ভাঙা ভাঙা এবং শ্বশুরবাড়ি এসে চালচলন দেখে নাক সিঁটকায়। ছেলেমেয়েরাও পেয়েছে মায়ের ধাত। এখন বাপদাদাকে তারা। যদি মাঝির বংশের মানুষ বলে শোনে তো তারাও কি ছোটো হয়ে যায় না?
আর এই মাঝির বংশ কালাম মাঝিকেও কম মুসিবতে ফেলে নি। এদের সে চেনে হাড়ে হাড়ে। চাষাদের সাথে বিবাদ বাধাও তো এরা থাকবে তোমার পাশে, ইশারা পাওয়া মাত্র দশটা চাষার মাথা ফাটিয়ে দেবে। যদি কলুর ঘরে আগুন লাগাতে চাও, ইঙ্গিত দিলেই কাম হাসিল। আবার এমনিতেই নরম স্বভাবের মানুষ, এক মাছ ছাড়া অন্য কোনো জীবের গায়ে আঁচড় লাগাতে গেলে এদের ঠ্যাঙে ঠ্যাঙ ঠেকে। কিন্তু একবার চেতে যায় তো মাছ মারার বর্শা দিয়েই পাঁচটা দশটা লাশ ফেলে দেবে পলকের মধ্যে। তহসেন এসব বুঝবে কোত্থেকে?
