পালরা চলে গেলে অনেকদিন পর ছিলিমখানেক গাঁজা খেয়ে বৈকুণ্ঠ চমৎকার একটা ঘুম দিয়ে উঠেছিলো। মেলার দিন ছাড়া এসব নেশা সে ছেড়ে দিয়েছে বহু আগে, আজ কী হলো, বাবুও নাই, চুপচাপ কয়েকটা সুখ টান দিয়ে সে বেশ মৌজে আছে। এখন তার মুখভরা পান। মুখে জর্দা ঢেলে ঠোঁটে পিক চেপে রেখে জবাব দেয়, কী যে কও মাঝিকাকা। বাবুর ঠাকুর্দার আমলের দোকান, সেটা ছাড়া যাবার পারে? ব্যবসাপাতি ঠিকই চলিচ্ছে। যদি কিছু লেওয়ার থাকে তো কও। সস্তায় ছাড়া দেই।
কম দামে জিনিস কেনার টোপ গেলার বান্দা কালাম মাঝি নয়। প্যাচাল পাড়িস। সাহা ও বৈকুণ্ঠের দেশপ্রেমে সে কটাক্ষ করে, তোরা ভাত খাস এটি আর কুলিপানি খাস ঐপার। এটা কেমন কথা রে? বেটাবেটি রাখবি ইনডিয়াত, আর ব্যবসাপাতি করবি পাকিস্তানেত?
কালাম মাঝি বলে, এই দোকান তো তার দখলেই আসবে। তবে আরো কয়েকটা দিন সে দেখবে। দেরি হলে বৈকুণ্ঠকেই সে পাঠাবে মুকুন্দ সাহাকে ডেকে আনতে। বৈকুণ্ঠের রাহা খরচ বহন করবে সেই।
বৈকুণ্ঠ রাজি হয় না, তাই কী হয়? বাবু কোটে না কোটে থাকে, কেটা জানে? হামি কলকাতা যাই নাই জেবনে, বাবুর শ্বশুরবাড়ি, সেটাও দেখি নাই। পানের পিক একটু ফেলে সে ফের বলে, কয়টা দিন সবুর করো। পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান কও, ইগলান কী হয় দেখা যাক।
পাকিস্তানের স্থায়িত্ব সম্বন্ধে বৈকুণ্ঠের এরকম সন্দেহে কালাম মাঝির দেশপ্রেম চোট খায়, বৈকুণ্ঠ, কথাবার্তা সামলায়া কোস। যে পাতেত খাস, সেই পাতেত তোরা হাগিস! ফল ভালো হবি না কচ্ছি।
বৈকুণ্ঠের গাঁজা কিংবা পানজার মৌজ এতেও কাটে না। এমন কি পরদিন তমিজ বৈকুণ্ঠদা, মানুষের মাথা খারাপ হওয়া আরম্ভ হছে, কাত্তিক মাসের কুত্তাগুলার লাকান মানষে এখন পাগলা হয়া ঘোরে। তোমার এ্যানা হুঁশিয়ার থাকা লাগে। বললে জেগে ওঠে তার পূর্বপুরুষের তেজ। পানের পিক গিলে বুক চিতেয়ে সে বলে, এটি হামাক হুঁশিয়ার থাকা লাগবি কিসক রে? এই হাট পিতিষ্টা করিছিলো কেটা সেই খবর রাখিস? খবর রাখতে বয়ে গেছে তমিজের। বৈকুণ্ঠ গোলাবাড়ি হাটের প্রতিষ্ঠাতার নাম উল্লেখ না করে তোলে তার পুরনো প্রসঙ্গ, শোন, হামার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা, না-কি তার বাপ নাকি তারও ঠাকুর্দা, যথাযথ প্রজন্মটিকে চিহ্নিত করতে না পারলেও তার কিছু এসে যায় না, গোরা সেপাইদের সঙ্গে ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে তাদের লড়াইয়ের কাহিনী সে বলে ছাড়লো। তার সেনাপতি, নাকি মজনু ফকিরের সেনাপতি ছিলো পাকুড়গাছের মুনসি, ইগলান সোমাচার জানিচ্ছিলো তোর বাপ, পাকুড়গাছের মুনসিক লিয়া তোর বাপ কতো খবর পাচ্ছিলো।
পাকুড়গাছই নাই। তমিজ একটু তুচ্ছই করে, কিসের পাকুড়তলা পাকুড়তলা। করো? পাকুড়গাছ কাটা পড়লো কোনদিন, হামরা দিশাই পালাম না!
পাকুড়গাছ কাটা অতো সহজ লয় রে পাগলা!
কিন্তু এখন গোলাবাড়ি থেকে গিরিরডাঙার রাস্তা তো বিলের উত্তর সিথান দিয়েই, ইটখোলা হওয়ার পর সেখানে ঝোপজঙ্গল সাফ হয়ে কী সুন্দর রাস্তা হয়েছে। হাজার খুঁজেও তমিজ তো পাকুড়পাছের একটা পাতাও দেখতে পায় নি।
তা হলে কুলসুম এতো খবর পায় কোত্থেকে? ভর সন্ধ্যায় সেদিন খুব শীত পড়লে তমিজ ঘরে গেলো একটু সকাল সকাল। ঘর বন্ধ, ভেতরে ঘুটঘুটে আন্ধার, দরজা বন্ধ করে কুলসুম কথা বলে কার সঙ্গে? কেরামত আলি আসে নি তো? মানুষটাকে কুলসুম সহ্যই করতে পারে না, অথচ সুযোগ পেলেই সে প্যাচাল পাড়তে আসে তার সঙ্গে। আজ কি কুলসুম তাকে আস্কারা দিলো নাকি?। তা আন্ধার ঘরের মধ্যে জোয়ান মানুষটার সঙ্গে সে কিসের আলাপ করে? দরজার বাইরে কান পাতলে তমিজ শোনে কুলসুমের কথা, তুমি লিজে কবার পারো না? উদিনকা বেটার ওপরে আসর করিছিলা না? এখন আসর না করো, তাক বুঝায়া কও। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। কুলসুম ফের কথা শুরু : করলে বোঝা যায়, সে কারো কথার জবাব দিচ্ছে। কিন্তু আরেকজনের প্রশ্ন কিংবা অভিযোগ কিংবা প্রতিবাদের কিছুই শুনতে না পেলেও তমিজের বুক কাঁপে, কুলসুম তো কথা বলছে তমিজের বাপের সঙ্গে। তার এতোই ভয় করে যে, কুলসুমের গলার আওয়াজ পেলেও সেদিকে সে আর মনোযোগ দিতে পারে না। কতোক্ষণ পর সে জানে না, কাল আসো। ওটি তোমার খিদা নাগে না গো? বলতে বলতে কাউকে বিদায় দিতে দরজা খুলে তমিজকে দেখে কুলসুম খুশিতে খলবল করে ওঠে, ল্যাও বাপু, তোমরা বাপবেটা ফয়সালা করো। এই সময় তমিজের গায়ে হাওয়ার একটা ঝাপটা লাগে। কে গো? কাউকেই তো দেখা গেলো না।
অন্ধকার ঘরে দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়ে বাইরের কুয়াশা-ছাকা আলো। ঐ সুযোগে কুয়াশাও খানিকটা ঢুকে অদ্ভুত একটি সুরত নিয়ে ঝুলতে থাকে ঘরের ছোট্টো ঐটুকু শূন্যতায়, সেটা ছড়ানো একেবারে মাচার ওপর পর্যন্ত। নিজের ভয় কাটাতে তমিজ খ্যাক করে ওঠে, ঘরত বাতি দেও না কিসক?
তোমার বাপ তো আবার সলোক থাকলে ঘরত ঢুকবার পারে না। এখনি গেলো, তুমি দেখলা না?
তোমার মাথা খারাপ হছে! ইগলান কী কও?
কুলসুম কুপি জ্বালালে তার দিকে তাকাতেও তমিজের ভয় করে। নিজের ঘরের মেঝেতে পিড়ি পেতে সে ভাত খেতে বসে, সামনে বসে কুলসুম বলে খালি তমিজের বাপের গল্প। তোমার বাপ আজ কয়দিন খালি এক কথা কয়! কী?-বেটাক হুঁশিয়ার হবার কও গো। কাল্লাহার বিলেত আগুন লাগবি, পানি থ্যাকা আগুন উঠা ঘরত ধরবি।
