পুলিসের গাড়ি এসে জীবিত, আহত, মৃতপ্রায় ও নিহত সবাইকে নিয়ে গেলে আবদুল আজিজের বাড়িতে প্রকট হয়ে ওঠে হামিদার চিৎকার। জ্ঞান ফিরে পেয়ে লাভ হয় নি, তার পাশ থেকে হুমায়ুন অথবা আহসানকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে সে চিৎকার করে, বিলাপ করতে থাকে।
আজিজ তার স্ত্রীর ব্যারামে ত্যক্ত হয়ে বাড়ির সামনে গেটের কাছে গেলে তাকে অনুসরণ করে আবদুল কাদের। বড়োভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে বলে, বাড়ির খবর শুনিছেন?
এই প্রশ্নে সে বাড়ির প্রতি আজিজের উদাসীনতাকে খোটা দেয়। আজিজ একটু বিব্রত হলেও পরিবারের নতুন সম্পত্তি হাতাবার জন্যে কাদেরের সন্দেহজনক প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলে, মুকুন্দ সাহার বাড়ির চাবিটাবি তুই রাখিছিস? দলিল দস্তাবেজ ঠিক রাখিছিস?
চাবি বাজানের কাছে। দলিলও তার সিন্দুকের মধ্যে। পাহারা মোতায়েন করিছি আমি।
রাস্তায় বেরিয়ে কাদের দেখে তার পাশে পাশে চলছে কেরামত।
৪৬. এদিক ওদিক থেকে নানারকম খবর
এদিক ওদিক থেকে নানারকম খবর পেয়ে কেষ্ট পাল আসল খবর জানতে আসে গোলাবাড়ি হাটে। ক্যা রে বৈকুণ্ঠ, বাবু কোটে? ইগলান কি সোমাচার শুনিচ্ছি, ক তো?
কেষ্ট পালের সঙ্গে পালপাড়ার আরো কয়েকজন। এরা সবাই জিগ্যেস করতে শুরু করলে বৈকুণ্ঠ ঘাবড়ে যায়, আমতা আমতা করে বলে, বাবু তো গেছে রাণাঘাট। বাবুর শ্বশুর সিরাজগঞ্জ থ্যাকা রাণাঘাট যাবার সময় কুটি য্যান মোসলমানের হাতে খাম হছে, পিঠেত চোট পাছে, বাঁচে কি না বাঁচে। বাবু তাক দেখবার গেলো।
পরিবার?
সোগলিক লিয়া গেছে। শ্বশুরের কী হয় না হয়! পালদের স্তম্ভিত মুখ দেখে সে তাদের আশ্বাস দেয়, রাণাঘাট কয়দিন থাকবি। তারপরে কলকাতা যাবি। কলকাতা থ্যাকা আসতে দিন বিশেক লাগবার পারে।
ইগলান বিত্তান্ত বাদ দে, কেষ্ট পাল চড়া গলায় বলে, বাবু বলে বাড়ি বেচ্যা দিছে?
এই গুজবটা বৈকুণ্ঠ শুনেছে কাল বিকালে। আলিম মাস্টার বলে গেলো, হাজারখানেক টাকা নিয়ে মুকুন্দ সাহা নাকি তার দুই বিঘা জমির ওপর বাড়ি, মানে একটা আটচালা আর দুটো চারচালা ঘর, দুইটা কাঁঠাল গাছ, ভালো জাতের আমগাছ গোটা বিশেক, চারটে লিচু গাছ এবং একটা করে বিলাতি আমড়া, জামরুল, কামরাঙা আর মেলা কূলগাছের বাগান আর পুকুর বেচে গেলো শরাফত মণ্ডলের কাছে। একে মোসলমান, তায় দাপটের মানুষ, ওদের হাত থেকে লুট করার সাধ্যি কারো হবে না।
আরে চাবি তো নিলো লুট করা পালপাড়ার অর্জুন এই কথা বললে কেষ্ট পাল তাকে থামায়। বৈকুণ্ঠকে ফের জিগ্যেস করে, দোকানের ব্যবস্থা কী করিছে?
হামাক কলো, দোকান ভালো করা দেখিস। ভালো দর পাস তো মাল যা আছে। ব্যামাক ছাড়া দিস। কলকাতা থাকা মালের অর্ডার দিয়াই আসবি। মুকুন্দ সাহার ওপর বৈকুণ্ঠের আস্থা এখনো অটুট, দোকান ছাড়ার মানুষ তাই লয়। দোকান হলো তার জান। দেখো না, কয়টা দিন যাক। গোলমাল, কাটাকাটি কমুক। শ্বশুরের কী হলো তাও তো জানি না। কয়টা দিন দেখি। আসার দেরি হলে বাবু হয়তো দুই চারের মধ্যে টেলিগ্রাম করবার পারে।
পালপাড়ার দল কাদেরের দোকানে গিয়ে গফুরকে একলা পেয়ে আসল খবর জানতে চায়। বলবে না বলবে না করেও সে শেষ পর্যন্ত বলে, ছোটোসাহেব ন্যাশনাল গার্ডের দুইটা মানুষ সাথে দিছে, তারা বর্ডার পার করায়া দিয়া আসিছে।
ভক্ষক গেছে রক্ষকের কাম করবার? পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ডের লোকদের তৎপরতা নিয়ে অসন্তোষ জানাতে কেষ্ট পাল প্রবাদটির উল্টো ব্যবহার করেও কেষ্ট পালের উদ্বেগ যায় না, মালপত্র ব্যামাক লিবার পারিছে? ব্যামাক। সোনাদানা তো বাবুর কম আছিলো না। কাঁসার বাসনকোসন, তামার বাসন, পূজার ঠাকুর,–জিনিস বাদ দেয়। নাই একটাও। বাড়ির দর কম হলে কী হয়, ব্যামাক হিসাব করলে তার লাভই হছে।
কেষ্ট পালের উৎকণ্ঠা, হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ে চতুর্গুণ। তার মোটাসোটা পা দুটো কাঁপতে লাগলে গফুর তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দেয়। বৈকুণ্ঠ অবশ্য বারবার বলে, আরে বাপু দুইটা দিন যাক না। বাবুর ব্যবসা আছে না?
বৈকুণ্ঠের কথা কেষ্টর কানে ঢোকে কি-না সন্দেহ। গফুর জানায়, বাড়ি বিক্রির কাজটা সাহাকে করতে হয়েছে একটু গোপনেই, নইলে কালাম মাঝি টাকাপয়সা না দিয়েই তার সম্পত্তি গ্রাস করে ফেলতো।।
কেষ্ট পাল এখন করেটা কী? লাঠিডাঙা কাছারির দিকে যাবার কথা বলতে গফুর জানায়, লায়েবাবাবু কাচারিত আসেই না।
কেষ্ট পালের তরুণ সঙ্গী একজন তাড়া দেয়, টাউনেত চলো। লায়েববাবু না থাকলেও সতীশ মুক্তার আছে।
টাউন বলে গরম হয়া আছে, গফুর কলু হুঁশিয়ার করে দেয়, ইনডিয়ার রিফিউজি আসিচ্ছে দলে দলে। কখন অরা কী করে, কওয়া যায় না।
কী করবার পারবি? অর্জুন পাল বীরত্ব দেখালেও পরবর্তী বাক্যেই তার তেজ। অর্ধেক ক্ষয় হয়ে যায়, পোড়াদহ মেলার আর তিন দিন। কাছারিত থাকা বরাদ্দ আসে নাই, সাহামশাই নাই।
বিকালবেলাতেই কালাম মাঝি উঠে আসে মুকুন্দ সাহার বারান্দায়। বৈকুণ্ঠকে ডেকে বলে, তোর বাবু খুব নিমকহারাম রে! বাড়িঘর তো দেওয়ার কথা হামাক। হামার বেটা পুলিস ফোর্স সাথে দিয়া বর্ডার পার কর্যা দিবি, কথা পাকা হয়া গেলো। তো আজ কেষ্ট পালের কাছে শুনি অন্য কথা। হামি বায়নাও করলাম পাঁচশো টাকা, দোকান দিবি, বাড়ি ঘর ব্যামাক দিবি। পাঁচ হাজার চায়, তা হামি তিন দিবার চাছিলাম। মণ্ডল কতো দিছে রে?
