আবদুল আজিজের স্ত্রীর ব্যারামের কথা বাইরের লোকদের মধ্যে জানে কেবল নীরেন। বাবরের মুখে তার মায়ের কষ্টের কথা শুনে ছেলেটির মাথায় সে হাত রেখেছে কয়েকবার। কিন্তু মহিলার সরাসরি আর্তনাদ নীরেনকে বড়ো বিভ্রান্ত ও বিব্রত করে তোলে। ছেলেটিকে কোনোভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাবনাও তার মাথায় আসে না নারায়ে তকবির-এর সঙ্গে হামিদার চিৎকার বাড়ে পাল্লা দিয়ে। আবদুল আজিজ বলে, মুশকিল, রাস্তায় সামান্য গোলমাল হলেই বাবরের মা অসুস্থ হয়া পড়ে। কলকাতায় হিন্দুরা তার ভাইকে মারলো–। বাবরের শিক্ষকদের মুখেচোখে ভয় দেখতে পেয়ে সে থামে।
ভাইজান, তাবিজ দিছিলেন? আজিজের কানের কাছে মুখ নিয়ে জিগ্যেস করে কেরামত আলি। সে এসেছে ফকির চেরাগ আলির বইটা নিতে। বইটা হাতছাড়া করার পর থেকে কুলসুমের সঙ্গে সে দেখাই করতে পারে না। তার স্বামী মরেছে, তমিজটা। বাইরে বাইরেই থাকে। কুলসুমের সঙ্গে দেখা করার, কথা কওয়ার কতো সুযোগ! অথচ তার ঘরে গিয়ে দাঁড়াবার জো নাই। কুলসুমের এক কথা, তুমি হামার দাদার বই বেচা খাছো। তোমার ভালো হবি না। কেরামতের পদ্য আর আসে না, খোয়াবনামার মধ্যে কী যে আছে, তার হাতে পড়লেই কপাল খুলে যাবে। এখানে এসে সে একটু সুযোগ খুঁজছিলো। গোলমালের মধ্যে যাওয়াটা নিরাপদ নয় বলে কাদের সবাইকে ডাকলে সে মুখ লুকিয়েছিলো মোটা থামের আড়ালে। এখন আজিজকে বাবরের মায়ের কথা জিগ্যেস করলে আজিজও মহা বিরক্ত হয়ে বলে, দূর! ডাক্তারবদ্যি হেঁচা খাওয়ালাম। তাবিজ দিলো আমার মামাশ্বশুর। কৈ, তার ব্যারাম তো খালি বাড়েই দেখি।
আবদুল আজিজের কোঁচকানো ভুরুতে দমে গেলেও কেরামত আলি মরিয়া হয়ে বুকে বল সঞ্চয় করে, ফকিরের ঐ বইটা যদি পাই তো না হয় একটু চেষ্টা করা দেখা গেলে নি। কেতাবটা দেবেন?
কেতাব? কিসের কেতাব? আবদুল আজিজ একটু ভেবে বলে, তোমার ঐ ঘেঁড়া বইটা? তমিজের বাপের বই? আরে উগলান হাবিজাবি শোলোক শূন্যাই তো তার এই হাল। আমার মামাশ্বশুর কলো–।
মামাশ্বশুরের উক্তি প্রকাশ না করেই সে জানায়, নয়া বাড়িত ওঠার সময় গোলমালের মধ্যে বইটা যে কোথায় গেলো! আরে কতো দামি দামি জিনিস হারালো। আর তোমার ঐ বই!
আবদুল আজিজ বাড়ির ভেতরে লোকজনের ও তার স্ত্রীর খোঁজখবর নিতে গেলে এ কেরামত আরেকটি সুযোগ নেয়। বাবরকে সে কাছে টেনে বলে, বাবা, বইটা তোমার আব্বা কোটে থুছে তুমি কবার পারো?
তার কথা শুনে এবং তাকে আরো কিছু প্রশ্ন করে বার মনে করতে পারে, ও হঁ্যা, আপনার ওই বই? খোয়াবনামা না কী যেন নাম না?–বইটা তো আব্বা কাউকে দেখতেই দেয় না। ওই বই হাতে পাওয়ার পর আব্বা নাকি এতো সস্তায় এই বাড়ি কিনতে পারলো! তারপর—।
বইটা তোমার আব্বা কোথায় রাখিছে কবার পারো?
না। তা ওই বই দিয়ে আপনি করবেন কী? পিকিউলিয়ার বই! কী সব স্বপ্ন টপ্ল নিয়ে আজগুবি কথা। আবার লাইন টানা স্কয়ার, ট্রায়াঙ্গল,মাথামুণ্ডু বোঝা যায় না। বাবরের হাসিতে বিজ্ঞানমনস্ক বালকের অবজ্ঞা। তা ছাড়া তার সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়াও মুশকিল। এই বাড়ির উত্তর দিক থেকে বাচাও! বাচাও! আর্তনাদ এবং তার। জবাবে বাড়ির ভেতর থেকে হামিদার ও বাবরের বাপ, ভাইজানেক কোপ মারলো গো! চিৎকারে সবাই চুপ মেরে গেছে। আবার এর মধ্যে কে যেন রাস্তা দিয়ে বলতে বলতে দৌড়ে যায়, বোসবাড়ি লুট হলো গো! আবদুল কাদেরের এক কর্মী এসে বলে যায়, আপনারা কেউ বাইরে যাবেন না। এখানে থাকলে ভয় নাই। পুলিসে খবর দেওয়া হয়েছে। সে ফিরে যেতে যেতে জানিয়ে যায়, লুটের সময় বাধা দিতে গেলে শুক্কুরের লোকদের হাতে বুকে ছুরি খেয়ে সিড়ির ওপর পড়ে রয়েছে ফণীবাবু। বড়োভাই মণীন্দ্র বোস আগেই সরে পড়েছে, সে বোধহয় লুকিয়ে রয়েছে কোথাও।
এসব খবর আসছে তো আসছেই। এমন সময় এক গাদা ছেলেবুড়ো ও মেয়েমানুষকে নিয়ে আজিজের বাড়িতে ঢোকে কাদের। আজিজ যে কী করবে বুঝতে পারে না। তার মায়ের পেটের ভাই তার নতুন বাড়িটা মনে হয় সহ্য করতে পারে না, যতো সব উৎপাতের আখড়া বানাবার তালে আছে। দেখো, এর পরেই আবার হেডমাস্টারের নেতৃত্বে মণীন্দ্র বোস তার দুই ছেলে ও খুড়তুতো ভাই মিলে চ্যাংদোলা করে নিয়ে আসে এক বুড়িকে। মহিলা হলো মণীন্দ্র বোসের বিধবা পিসি, সিঁড়ি থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে নিচে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে সিঁথি খা খা করে রাখার পুণ্যে আজ তার মাথা ভরা তরল সিঁদুর। ভেতরের ঘরে একটা তক্তপোষে তাকে শুইয়ে দিতেই বয়স, লিঙ্গ ও সর্বোপরি জাতের কাণ্ডজ্ঞানশূন্য হয়ে হামিদা ভাইজান, ভাইজান গো বলে চিৎকার করে তার বুকে লাফিয়ে পড়তে গিয়ে পড়ে যায় মেঝেতে এবং কাণ্ডজ্ঞানের সঙ্গে হারায় তার এমনি জ্ঞান। দুইজন বেহুঁশ মহিলার গায়ে গা লাগে নি বলে পরম নিষ্ঠাবতী ও ভক্তিময়ী পিসি মৃত্যুর মুহূর্তেও স্লেচ্ছাস্পর্শমুক্ত থাকায় মণীন্দ্রনাথ বসু স্বস্তি পায় এবং এই অবসরে তার তিন পুরুষের বনেদি বাড়ির মূল্যবান সম্পত্তি নিয়ে উৎকণ্ঠিত হবার সুযোগটির সদ্ব্যবহার করে। মিনিট পঁচিশেক পর তার ছোটোভাই ফণীন্দ্রের মৃত্যুসংবাদ না পাওয়া পর্যন্ত তার উৎকণ্ঠার টার্গেট অপরিবর্তিত ছিলো।
নীরেনকে এর আগেই বাবর নিয়ে গেছে তার পড়ার ঘরে। চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকতে নীরেনের বাধো বাধো ঠেকছিলো, পিসি থাকতে এই ঘরে সে কখনো ঢুকতে পারে নি। এটা পিসিমার ঠাকুরঘর। খুব ছোটোবেলায় চুপ করে এই ঘরে ঢুকে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো পিসিমার পিঠে। পূজা ছেড়ে পিসিমা তাকে কোলে নিয়ে বারান্দায় তার মায়ের কোলে তুলে দিয়ে বলেছিলো, দুষ্টু ছেলে, তোমার জন্যে আমাকে আর এখন ফের ঠাকুরের ভোগ রাঁধতে হবে। সেই থেকে ঠাকুরকে নীরেন একটু হিংসাই করতো। বড়ো হতে হতে সেই হিংসা আর রাগ তার আপনাআপনি ঝরে যায়। ঠাকুর কেউ থাকলে তো তার ওপর হিংসা হবে! ঠাকুরুদেবতা নিয়ে স্কুলে ছেলেদের সামনে নীরেন কম ঠাট্টা করে না। বাবরদের ক্লাসেই একদিন বলেছিলো, পৈতার অসম্মান করলে নাকি মাথায় বজ্রপাত ঘটবে। তা কলেজে ভর্তি হয়েইে তো পৈতা দিয়ে সে খাতা। সেলাই করেছে। কৈ তার মাথায় তো একটা দেশলায়ের কাঠিও জ্বললো না। আর এখন তার প্রিয় ছাত্রের দেওয়াল জুড়ে টাঙানো পৃথিবীর মানচিত্র, আলমারির ওপর গ্লোব, টেবিলে ইনস্ট্রমেন্ট বক্স, রঙের বাক্স, বই খাতাপত্র। তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলো দেখেও ঠাকুরের অভাবে নীরেনের বুকটা পিসিমার জন্যে হু হু করতে থাকে।
