চুনকামে মুছে ফেলা যায় নি। রেলিঙটা না ভাঙলে ওগুলো ওঠানো মুশকিল।
আরে আসো, আসো। বসে পড়ো। বাবর টেস্ট পরীক্ষায় ফাস্ট হছে। স্কুলের স্যারদের একটু মিষ্টিমুখ করানো হচ্ছে আর কি। আবদুল কাদের সরে বসে কেরামতকে বসার জায়গা করে দেয়।
মিষ্টির প্লেট সাবাড় হলে আসে চা। বাবরের মেধা ও শ্রম নিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশংসা ও উপদেশ পর্ব শেষ হলে শিক্ষকগণ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দ্রুত অবনতি সম্বন্ধে নিজেদের উদ্বেগ ও বেদনা জানাতে থাকে, কখনো একে একে, কখনো একসঙ্গে। ভালো টিচাররা সবাই চলে যাচ্ছে ইনডিয়া। স্কুল কলেজে কি তালা ঝুলবে নাকি? আবদুল আজিজ বিশেষভাবে উৎকণ্ঠিত : বাবর অঙ্ক কষতে অখিল বসুর কাছে, দিন পনেরো হলো তার বাড়িতে তালা ঝুলছে। শোনা যাচ্ছে অখিলবাবু চলে গেছে বালুরঘাট, তার বাড়ি একসচেঞ্জ করেছে এক মুসলমান রিটায়ার্ড সাব-ডেপুটির সঙ্গে।
শেরোয়ানি, পাজামা ও জিন্না টুপিপরা লম্বা ও রোগা হেডমাস্টারের কষ্টটা একটু বেশি। তার ব্যক্তিগত বন্ধু বলে কেউ থাকছে না। আবার স্কুলে পড়াশোনার মান ঠিক রাখতে তার হিমসিম খাবার জোগাড় হয়েছে।
হেডমাস্টারের কাছ থেকে একটু তফাতে বসেছিলো নীরেন লাহিড়ী, ২৫/২৬ বছরের যুবক, ওপরের ক্লাসে ভূগোল পড়ায়। বাবরের সবচেয়ে প্রিয় স্যার। নীরেন বারবার ওপরে তাকিয়ে বারান্দার ছাদের বিম, একদিকের দেওয়াল এবং অন্যদিকে বারান্দা ঘেঁষে পঞ্চজবা, টগর ও কামিনীর ফুলভরা গাছগুলো দেখছিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে দেখা গেলো সামনের ছোটো বাগানে। বাড়ির সংস্কার করতে গিয়ে দোপাটি ও গাদা গাছগুলো চাপা পড়েছে বাশের নিচে, সে ঘুরছিলো ঐ জায়গাটায়। বাবর তাকে বারবার বলছিলো, চলেন না স্যার, ভেতরে চলেন। আমার পড়ার ঘরটা দেখবেন স্যার। আবদুল কাদের বারান্দা থেকেই ডাকে, নীরেনবাবু, যান না, ভেতরে যান।
নীরেন বারান্দায় ফিরে এলে আবদুল আজিজ বলে, বাবরের মুখে দিনরাত খালি নীরেন স্যারের নাম। যান, ওর পড়ার ঘরটা দেখে আসেন। তারপর জিগ্যেস করে, আগে এদিকটায় আসেন নাই, না? আপনার বাড়িতে মালতিনগর, না? আপনারা রেল লাইন পারই হতে চান না।
নীরেন কিছুক্ষণ ফাঁকা চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, এটা আমার পিসিমার বাড়ি।
তাই নাকি? কার্তিকবাবু আপনার–।
পিসেমশাই। বড়োপিসেমশাই।
তাই নাকি?
পিসিমা মারা গেলো ফর্টি ওয়ানে, পিসেমশাই ফের বিয়ে করলেন। তারপরেও আমরা আসতাম। আর পিসিমা বেঁচে থাকতে তো প্রায় রোজই আসা হতো। আমার বড়োপিসিমা এই পঞ্চজবা, কামিনী লাগিয়েছিলেন। পিসিমার হাতের গাছ হতো! যা লাগাতেন তাই হতো! নীরেন লাহিড়ীর মনে হয় কথার ব্যামোতে পেয়ে বসেছে। তার প্রিয় শিক্ষক ও বর্তমান বস এই হেডমাস্টারের সামনে অনেক দিন মাথা নিচু করে বসে থাকাটা সে হঠাৎ করে পুষিয়ে নিতে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে, আর পিসেমশাই লাগিয়েছিলেন কনকচাপার গাছটা। কলকাতা থেকে কলম নিয়ে এসে দুটো লাগান, একটা মরে গেলো, আর একটা বাঁচলো। কী সুন্দর ফুল যে হতো! ঐ যে ওদিকটায়, তাই না? গাছটা দেখছি না। কনকচাঁপার গাছ খুঁজতে সে এদিক ওদিক তাকালে আবদুল আজিজ কৈফিয়ৎ দেয়, ওখানেই ছিলো। লম্বা গাছটা তো? পাঁচিল তোলার সময় গাছটা আর রাখা গেলো না।
অতো সুন্দর ফুলের গাছটা নষ্ট করলা? কী সুন্দর গন্ধ! ইসমাইল ভাইয়ের বাড়িতে দুইটা আছে। কাদেরের এই আফসোসে আজিজ রাগ করলেও নীরেন লাহিড়ীর কাছে। গাছ কাটার কারণ ব্যাখ্যা করে, এই বাড়িতে তো চুনকাম হয় নি বহুদিন। ঘরের দেওয়াল টেওয়াল সব নষ্ট হয়ে গেছিলো। পাশের বাড়ির সঙ্গে সীমানা নিয়ে গোলমাল, তাই পাঁচিল ছিলো না ওদিকে। পাঁচিল দেওয়ার সময়।
বাড়ির সংস্কার ও উন্নয়নে নীরেনের উৎসাহ নাই, সে দাড়িয়েই থাকে। বাবর তাকে ভেতরে যাবার জন্যে পীড়াপীড়ি করলেও সে নড়ে না।।
এর মধ্যে বড়ো রাস্তায় শোনা যায় নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর আওয়াজ। বারান্দার লোকজনের মধ্যে উসখুস শুরু হয়। এদের অনেকেই এই দুই বছর আগেও এই স্লোগানে উত্তেজিত, এমন কি উদ্দীপ্ত হয়েছে। আবদুল কাদের উঠে দাঁড়ায়, শালা শুকুর শেখ বোধহয় এসেছে। শালা রিফিউজিদের নিয়ে গোলমাল পাকাবার তালে আছে।
একজন শিক্ষক বলে, গত কয়েক দিনে টাউনে খালি রিফিউজি আসছে। যতীন রায়ের বাড়িটা রিফিউজিতে ভরে গেছে।
যতীন রায়? আমাদের যতীনবাবু? তাঁর বাড়ি কি রিকুইজিশন করা হয়েছে নাকি? হেডমাস্টারের এই উদ্বেগের জবাবে কাদের বলে, উপায় কী? এতো এতো রিফিউজি আসছে। তাদের শেলটার দিতে হবে তো।
হেডমাস্টার সন্তুষ্ট নয়, বিড়বিড় করে বলে, এতো বড়ো লিডার। তার মতো লোকের বাড়ি নিয়ে নেওয়া।
এই আক্ষেপের দিকে খেয়াল না করে কাদের নির্দেশ দেয়, আপনারা কয়েকজন আমার সঙ্গে আসেন। হিন্দু পাড়া, শুক্কুর আলি যা তা কিছু করে ফেলবে। হিন্দু শিক্ষকদের সে অভয় দেয়, আপনারা বরং বাড়ির ভেতরে যান। নিশ্চিন্ত থাকেন।
কয়েকজন নিয়ে সে বেরিয়ে গেলে হেডমাস্টারও তাদের সঙ্গে যায়।
বাইরের নারায়ে তকৃবির আল্লাহ আকবর-এর বুলন্দ আওয়াজের সাড়ায় এই। বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েলি গলার তীক্ষ্ণ চিৎকারে লোকজনের কাপড়চোপড়ের ভাঁজে ভাজে ও কোঁচায় কেঁচায় এবং বারান্দায় ঝুঁকে পড়া পঞ্চজবা ফুলের লাল আভায়, টগরের সাদা পাপড়িতে, এমন কি কেটে-ফেলা কনকচাপার হারিয়ে-যাওয়া ছায়ায়। শিরশির করে ছমছমে কোলাহল, ও বাবরের বাপ! ও বাবর! আসিচ্ছে রে, আসিচ্ছে। ভাইজানের গলাত কোপ তুললো রে। হুমায়ুনেক টান দিয়ে লিয়া আসো গো। ও বাবরের বাপ।
