কালাম মাঝি তাড়াতাড়ি তাকে থামায়, রাখো, হামি কই। শোনো, বিল তো হামি ইজারা লিছি। দস্তুরমতো টাকাপয়সা খরচ করা ইজারা লিছি এই বৈশাখ মাস থ্যাকা। মণ্ডলের কবজা থ্যাকা বিল খালাস করতে হামার খরচ তো কম হয় নাই বাপু। হামাক খাজনা না দিলে হামার চলবি ক্যাংকা করা?
আবিতনের বাপ বলে, সেই পয়সা না হয় আমরা সোগলি মিল্যা তুল্যা দেই। তো খাজনা চাও কিসক? খাজনা হলে তো এই বিলেত জাল ফেলালেই টাকা দেওয়া লাগবি। না কী?
তহসেন এবার এদের মূখতায় বিরক্ত হয়, অতো কথা কিসের? বিল তো বাবা ইজারা নিয়েছে। রীতিমতো দুই বছরের টাকা জমা দিয়ে ইজারা নেওয়া হলো। এখন খাজনা না দিয়ে বাবা কাউকে মাছ ধরতে দেবে কেন?
তহসেনের কথায় কালাম মাঝির অস্বস্তি হলেও ছেলের ন্যায্য কথা সে অনুমোদন। করে। তবে তহসেনের দারোগাগিরি এখানে করাটা ঠিক নয়। মাঝির জাত বড়ো তঁাদোড়। কোন কথায় যে কী করে বসে তার ঠিক নাই। তমিজকে হাত করলে সেই বরং সবাইকে বুঝিয়ে বলতে পারবে। তাকে একটু সরিয়ে নিয়ে কালাম মাঝি ফিসফিস করে বলে, তমিজ, দেখ তো ভাই ইগলান কী কচ্ছে? তুই একটু ভালো করা বুঝায়া দে না বাপু!
তমিজ মাঝিদের বোঝাবে কী, সে তো নিজইে ধন্দে পড়েছে। মণ্ডলের ইজারার মেয়াদ শেষ, এখন এই বৈশাখ থেকে বিল তো ফিরে আসবে মাঝিদের হাতে। তা হলে খাজনা দিতে হবে কাকে? সে জিগ্যেস করে, বিল তো মাঝিগোরে হাতেত ফির্যা আসিছে। না কী?
আসে নাই? আসে নাই? কালাম মাঝি গলা চড়ায়, হামি মাঝি লই? হামার বাপদাদা চোদ্দ পুরুষ মাঝি আছিলো না? তোরা মাঝি লোস? তোরা হামার রক্তের আত্মীয় লোস? তা হামার নামে বিল পত্তন লিছি। তা হলে বিল কি মাঝির কাছে আসলো না?
বাপকে থামিয়ে তহসেন বলে, সম্পত্তি তো কারো না কারো নামেই থাকতে হয়। তো বাবা এটা দুই বছরের জন্যে কিনে নিয়েছে। সামনের বার আপনারা কেউ নেবেন। এখন যে মাছ ধরলেন তার সামান্য একটা ভাগ এখানে দিয়ে যান। এর পর থেকে মাছ ধরতে হলে খাজনা দিয়ে জাল ফেলবেন। একটু তাড়াতাড়ি করেন। খালি খালি ঝামেলা করে লাভ কী?
তার শুদ্ধ কথা ও বলার ভঙ্গিতে মাঝিরা একটু থমকে যায়। কয়েক মিনিট কেউ কথা বলে না। তহসেন হাতের ছাতাটা খুললো। আবিতনের বাপ হঠাৎ সামনে এসে তার খলুই উপুড় করে দেয় কলাপাতার ওপর। কালাম মাঝি বলে, বামাক মাছ দাও কিসক? তোমার ভাগ তুমি লিয়া যাও। আবিতনের বাপ শোনে না, হনহন করে চলে যায় নিজের বাড়ির দিকে। কালাম মাঝি ফের ডাকে, ও আবিতনের বাপ। আবিতনের বাপ ফিরে তাকায় না। আরো দুই তিনজন মাঝি মাছের ভাগ দিয়ে গেলেও হঠাৎ ঝড়ের আভাস পেয়ে কিংবা এর সুযোগ নিয়ে খলুই ও জাল নিয়ে আর সবাই হাঁটা দেয় নিজের নিজের ঘরের দিকে। ছোটো ছেলেদের সবাই হঠাৎ করে দৌড় দেয়, তাদের অন্তত দুইজন আছাড় খেয়ে পড়লে খলুইয়ের মাছ পড়ে যায় মাটিতে। তমিজ কী করবে, মাছ ঢেলে দেবে কি-না, এই নিয়ে দোনোমননা করতে করতে ঝড় শুরু হয়ে যায়, সেও ছুট দেয় নিজের ঘরের দিকে।
এর মধ্যে ঝড় শুরু হয়েছে বেশ ভালোভাবেই। কালাম মাঝির ঘরের বারান্দা থেকে তহসেনের চিৎকার শোনা যায়, বুধা, কে কে মাছ দিয়ে গেলো সেই হিসাব রাখলি না কেন? পরে যখনি কেউ মাছ ধরতে আসে, হিসাব করে আজকের পাওনা আদায় করা হবে
কুলসুমের ঘরে মাটির একটা হাঁড়িতে কৈ মাছগুলো পনিতে জিইয়ে রাখতে রাখতে তমিজ বলে, কাল শলুক দিয়া নাউ দিয়া পাক করো। পাকা কৈ!
এর মধ্যে ঝড়ের পর এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। সোঁদা সোঁদা গন্ধে মাথা ভরে যায়, এই গন্ধে আবার খিদেও লাগে। কিন্তু এখন তমিজের যাওয়া দরকার হুরমতুল্লার জমিতে। এমন সুন্দর বৃষ্টি হলো, এখনো সন্ধ্যা হয় নাই, মোষের দিঘির ঢালে জমিটায় একটা চাষ দেওয়া যায়।
কুলসুম বলে, এখন আবার জমিত যাবা? ভাত খায়া যাও।
বিলে যাবার আগে ঘরে বসে কড়কড়া ভাত খেয়েই বেরিয়েছিলো, গরম ভাতের লোভে তমিজ ফের বসে পড়ে।
খেয়ে উঠে মাটির হাঁড়ি থেকে বেছে বেছে পাঁচটা মাছ খলুইতে তুলে তমিজ রওয়ানা হলে কুলসুম বলে, মাছ কয়টা কুটি লেও?
পাঁচটা মাছ কালাম মাঝিক খাজনা দেওয়া লাগবি। বলেই সে মিথ্যা কথাটা শোধরায়, কিসের খাজনা? অর বাপের সম্পত্তি নাকি? খাজনা দেওয়া লাগবি কিসক? এইসব ঝাঝালো কথা বলে বলে তমিজ খাজনা না দেওয়ার সিন্ধান্তটি পাকা করে। তারপর বলে, দেখি, পরামাণিক বুড়া একদিন কৈ মাছ খাওয়ার হাউস করিছিলো। লাজুক খুশিতে সারা মুখ তার হালকা কালো আলোতে চুবিয়ে নিয়ে তমিজ বেরিয়ে পড়ে।
৪৫. কালিতলায় আবদুল আজিজের নতুন বাড়ি
কালিতলায় আবদুল আজিজের নতুন বাড়ি চিনতে কেরামত আলির বেগ পেতে হয় না। কার্তিক ভাদুড়ির বাড়ি বলতেই রিকশাওয়ালা এক কথায় চিনে ফেললো। মাধবীলতায় ছাওয়া কাঠের গেটের সামনে রিকশা থেকে নামতে কেরামতের সংকোচ হয়, এই বাড়িতে রিকশায় আসাটা বোধ হয় বেয়াদবিই হয়ে গেলো! গেটের পরে ঘাসে ঢাকা ছোটো মাঠ পেরিয়ে বারান্দা, বারান্দায় সতরঞ্চির ওপর বসে রয়েছে ১৫/২০ জন মানুষ। আবদুল কাদের কেরামতকে দেখে হাসলো।
ছোটোখাটো দালানটার ছাদের দিকে দেখতে দেখতে কেরামত সহজ হতে চেষ্টা করে। ছাদের রেলিঙের মাঝখানটা উঁচু, সেখানে সিমেন্টে খোদাই করা ওঁ এবং এর নিচে লেখা শ্ৰীশঙ্করালয় এবং তার নিচে ১৩০৭।—এসবের কোনো কিছুই সাম্প্রতিক
