এই কঠিন প্রশ্নের জবাব নিয়ে তমিজ মাথা ঘামায় না। ফুলজানের কিল খেতে খেতেই সে তাকে জড়িয়ে ধরে দুই হাতে। মোটা ঠোঁটে ফুলজানের চোখের নোনতা পানি চুষে নিতে নিতে নুনের ধকে তার সারা শরীর জ্বলে। ফুলজানের গালে, ঠোঁটে ও ঘ্যাগে অবিরাম মুখ ঘষতে ঘষতে সে তাকে নিয়ে শুয়ে পড়ে মোষের দিঘির ঢালে। তাদের কয়েক হাত পরেই চৈত্রের খরখরে চষা জমি। তাদের মাথার কাছে হুরমতুল্লার জোড়া বলদ। আকাশে তারা ফোটে। ফুলজান নিজের শাড়ি গুছিয়ে নিতে নিতে বলে, মাঝির বেটা, কাপড়খানা ছিড়া ফালালা।
অনেকদিন পর সেদিন বাড়ি ফিরে তমিজ কুলসুমের সঙ্গে খুব গল্প করে তার মুখের . দিকে সোজা তাকিয়ে। তমিজের বাপ নাকি অনেক রাত্রে রোজই কুলসুমের কাছে একবার না একবার আসে। তমিজ কিন্তু ভয় পায় না; বরং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিগ্যেস করে বাপের কথা।
৪৪. জুম্মাঘরে কুদুস মৌলবির মিলাদ
জুম্মাঘরে কুদুস মৌলবির মিলাদ পড়াবার পর মাঝিদের হাতে হাতে বাতাসা। এর ওপর তহসেন দারোগা টাউন থেকে নিয়ে এসেছে ঘিয়ে-ভাজা জিলাপি। মিলাদে এতো এতো তবাররক পেয়ে মুখ ভরে সেসব চিবোতে চিবোতে মাঝিরা বিলের ধার ধরে দাঁড়ায় সার করে। বুধা মাঝি কেরামত আলির তিন বছর আগের গানটা ধরলে সবাই খুব হৈ চৈ করে। ওঠে এবং বুধার ভুলভাল কথার সঙ্গে কেউ কেউ বেসুরো গলা মেলায়। মুখ ভার শুধু আবিতনের বাপের। ধরা গলায় সে আক্ষেপ করে, হামার লাতিটা এটি মরিছিলো গো! ও মুনসি, আপনে তার জন্যে দোয়া করেন। মিলাদের শেষে অবশ্য তমিজের বাপের জন্যে কুদুস মৌলবি দোয়া করেছে, আবিতনের ছেলের কথাটা তাকে কেউ মনে করিয়ে দেয় নি। এখন সে হাত তুলে পরওয়ার দিগারের দরবারে মাসুম শিশুটির জন্যে দোয়া করে। তবে ঐ স্মৃতি ঘটতে মাঝিদের উৎসাহ নাই। এমন কি চোরাবালির ধারে তমিজের বাপের পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম জালটা ফেলার জন্যে কালাম মাঝির প্রস্তাবটিও অগ্রাহ্য করে তারই ছেলে তহসেন, না না। আজ ওখানে যাবার দরকার কী? ইটখোলায় একটা ঝামেলা করে লাভ নাই।
তবে ফকিরের ঘাটে কালাম মাঝি প্রথম জালটা ফেলায় তমিজকে দিয়ে, হাজার হলেও কোন বাপের বেটা সেটা দেখা লাগে। আবার বাঘাড় মাঝির লাতির বেটা তো, এর পরদাদার দোয়া লিয়া কাম শুরু করলে বরকত হবি।
বৈশাখ মাসে তমিজের হাতে কৈ জাল দেখে অনেকেই ঠাট্টা করছিলো। বিলে পানি কম, এখন ওই জাল দিয়ে সে করবেটা কী। কিন্তু বাঘাড় মাঝির ওয়ারিশের হাতে ওই জালে ঠিকই ধরা পড়ে বারোটা কৈ মাছ, তার নয়টাই পাকা কৈ। সেগুলোর লালচে আভা লাগে তমিজের কালো গালে।
অবশ্য তার জালে মাছ পড়তে পড়তে আবিতনের বাপের তৌড়া জালে ধরা পড়েছে। রুই কাতলের মাঝারি আকারের কয়েকটা বাচ্চা। বেশিরভাগ মাঝির জালে কিছু না কিছু মাছ উঠলোই। যাদের তেমন কিছুই ওঠে না, তারা পলো দিয়ে, বড়শি দিয়ে পুঁটি, খলসে, ট্যাংরা, এমন কি ছোটো পাবদা পর্যন্ত ধরে। পাকুড়গাছশূন্য পাকুড়তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছিলো মাঝিরা। কিন্তু তহসেন তাদের থামিয়ে দেয়, আজ ওদিকটা থাক।
দুপুরবেলা শেষ হতে না হতে কালাম মাঝির ভাগ্নে বুধা মাঝি সবাইকে বলে, এখন তোমরা থামো গো। আর মাছ ধরা হবি না। কালাম মাঝির বাড়ির ঘাটে নতুন আমগাছের নিচে কয়েকটা কলাপাতা পেতে বুধা জোরে হাঁক দেয়, এটি সোগলি মাছ দিয়া যাও। যা ধরিছো তার ছয় আনা করা মাছ ঢালো।
মাছ ধরার উৎসাহে মাঝিরা এই আহ্বান কানে তোলে না। কিন্তু বুধার ডাকটি বারবার শুনে এবং তাতে হুকুমের স্বর পেয়ে সেদিকে তাদের মন দিতেই হয়। মাছ ধরলো, এখন আবার মাছ দিতে হবে কাকে?
আবিতনের বাপ বুধাকে ওংকা চিক্কুর পাড়িস কিসক রে? জিগ্যেস করে নিজেই খুব জোরে চিৎকার করে।
কালাম মাঝি এতোক্ষণ এদের সঙ্গেই ছিলো। একটু আগে সে বাড়ির ভেতরে গিয়েছিলো। এখন ফিরে এসে বলে, বাপু, আজ মাঝিগোরে বিল ফেরত পাবার পয়লা দিন। খাজনা টাজনা কিছু লাগবি না। মাছ যা ধরিছো তার ছয় আনা, না হয় চার আনা, কিছু না হলে অন্তত দুই আনা ভাগ হামাক দিয়া যাও।
তিন বছর আগে এই বিলে মণ্ডলের অধিকার অগ্রাহ্য করে জাল ফেলার কথা মনে পড়ে আবিতনের বাপের। নাতির জন্যে তার শোক খুঁচিয়ে তোলার চেষ্টা কারো কাছে আমল না পাওয়ায় সে শোধ নিতে চায় এইভাবে, শালা মাঝিগোরে আবার খাজনা দেওয়া কী? মাঝির আবার খাজনা লিবি কেটা রে?
নুলা ভিকুর পাঁচটা ট্যাংরার দুটোই যদি দিতে হয় তো তার আর থাকে কী? সে নিম সমর্থন করে আবিতনের বাপকে, খাজনা কিসের গো? কালাম মিয়া না কলো, মাঝিগোরে। বিল মাঝিরাই মাছ ধরবি? তো এখনো মণ্ডলেক পয়সা দিয়া মাছ ধরা লাগবি?
ফকিরের ঘাটে শ্যাওড়া গাছের নিচে জমায়েত মাঝিদের সবাই এই নিয়ে চঁচামেচি শুরু করলে ঠিক কে কোনটা বলছে বোঝো কঠিন হয়ে পড়ে।
মণ্ডল বিল পত্তন লিছিলো লায়েবেক ঘুষ দিয়া। শালা লায়েব তো শুনি ভাগিছে। কিসের লায়েব, কিসের পত্তন?
লায়েব? আরে পাকিস্তানে জমিদারিই থাকিচ্ছে না। কিসের জমিদার? তার আবার পত্তন দেওয়ার ক্ষমতা আছে নাকি?
পাকিস্তানেত আবার জমিদার আর লায়েবেক পোঁছে কেটা?
এর মধ্যে চলে আসে তহসেন দারোগা। লুঙিপরা আর খালি পায়ে থাকলেও তার হাতে ঘড়ি, সাদা শার্টের পকেটে সিগ্রেটের প্যাকেট। গলা এতোটুকু উঁচু না করে সবাইকে সে বোঝায়, বাবা এই বিল ইজারা নিয়েছে। বিলের মালিকানা–
