হুরমতুল্লা হঠাৎ চুপ করে, তারপর আস্তে আস্তে বলে, পানিত বাস করি, কুমিরের সাথে লাগা ভালো লয়। মণ্ডলের ভাগত মুখ বসাবার যায় মাঝিপাড়ার কী দশাটা হলো, তুই বুঝিস না?
তমিজ অবশ্য বোঝার চেষ্টাও করে না। সে বরং তার পরিকল্পনা বোঝায় হুরমতকে হুরমত তো এখন ব্যস্ত থাকবে মণ্ডলের নতুন জমি নিয়ে, সে তো খালের পুবে। তো হুরমতুল্লার বাড়ির পেছনে তার পালানের জমিটা তমিজকে বর্গা দিক না। সবটাই দিক। চার বিঘার ওপর জমি, জমিতে তমিজ সোনা ফলিয়ে ছাড়বে। এই জমির ফসল বেচেই হুরমত নতুন জমি কিনতে পারে। এমন কি, তমিজ ভাগে যা পাবে তাই দিয়ে সে মণ্ডলের কাছ থেকে তার ভিটার লাগোয়া জমি ফেরত না-ও পায় তো অন্তত কালাম মাঝির হাত থেকে ভিটাটা উদ্ধার করবেই। লাঙল দিলে জমি তার বশে থাকে, তমিজ কভো ধান তোলে হুরমতুল্লা নিজেই দেখতে পাবে।।
তার কথা শুনতে শুনতে হুরমতের চোখ চকচক করে, নিশ্বাস ফেলে সে বলে, হামিও পারিচ্ছিলাম রে, এখন শরীলেত কুলায় না।
তুমি করবা কিসক? তুমি মণ্ডলের জোতের দেখাশোনা করো। তমিজ তাকে আশ্বাস দেয়, তোমার বিটি আমার সাথে থাকলে জমিত হামি কী করি তুমি দেখো। নিজের কথাতেই বুকে বল পায় সে, বিটিক তো তোমার লিকা দেওয়াই লাগবি। ইংকা রাড়ি করা রাখবার তো আর পারবা না। তা হামার সাথে!
মাঝির বেটার সাথে লিকা দিলে মানষে আবার? হুরমতুল্লার গলায় আগের তেজ নাই। তমিজকে রাখতে পারলে জমির ফসল সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। ফুলজানটা তার বড়ো হতভাগী। মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে গেলেই তার বুক পোড়ে। তা তমিজের সঙ্গে তার নিকা হলে মেয়েটার মুখ আন্ধার থাকে না। হুরমতুল্লা আস্তে আস্তে বলে, হামার সমাজ আছে একটা বুঝিস তো? দেখি, সোগলির সাথে কথা কয়া।
কিন্তু শরাফত মণ্ডলের অনুমতি চাইতে গেলে মানুষটা গম্ভীর হয়ে বলে, হুরমতুল্লা, তোমার বিটি তুমি কাটো, তুমি মারো, যার কাছে খুশি তুমি তার হাতে দিবা। হামার কী? কিন্তু এরপর তার গলা চড়ে, কিন্তু ঐ বিটিজামাইক লিয়া তুমি এটি থাকলে হামার ইজ্জত থাকে কুটি? একটু থেমে সে ধীরেসুস্থে বলে, এখন আল্লা হামার অবস্থা ভালো করিছে। কিন্তু তোমার সাথে রক্তের সম্পর্ক তো আর বাদ দিবার পারি না। মাঝির বেটার সাথে তুমি কুটুম্বিতা করলে হামার ইজ্জত থাকে কুটি? হামার জমির তদারকি তুমি করবা। তোমাক কিসক দেই?–না, তুমি আমার আত্মীয়, না কী? তার সাথে তুমি আত্মীয়তা করলে তোমার সাথে হামি সম্পর্ক রাখি ক্যাংকা করা? তুমিই কও।
হুরমতুল্লা, কিন্তু তমিজকে এসব কিছুই বলে না। ফুলজানের ব্যাপারে তাকে একেবারে না করে দিতে হুরমতুল্লা মন থেকে সায় পায় না। ছোঁড়াটাকে দিয়ে তার জমির আয় উন্নতি হচ্ছে, তা হোক না! ফুলজানের পেছনে সে ঘুরবে আর কতদিন? নিজে নিজেই একদিন কেটে পড়বে। ছোঁড়াটাকে জামাই করে নিজের কাছে রাখতে পারলে ভালো হতো। তবে মণ্ডল সহ্য করবে না। ভিটামাটি থেকে তাকে উচ্ছেদ করবে না ঠিকই, কিন্তু মণ্ডলের এতোগুলো জমি বর্গা করা, বর্গাদারদের ওপর খবরদারি করা। এসব তার বন্ধ হয়ে যাবে। শরাফত তার সঙ্গে আত্মীয়তার কথাটা এভাবে বললো, তাতেও হুরমতের বুকটা একেবারে ভরে গেছে। তার মানে আবদুল আজিজ, আবদুল কাদের আর সে একই বংশের মানুষ। আজিজ কাদের এদের ছেলেরা সব বড়ো অফিসার। হবে। তারাও তার আত্মীয় হবে। মাঝির বেটার হাতে বেটিকে তুলে দিয়ে হুরমতুল্লা বংশের ইজ্জত হারায় কী করে?
এসব নিয়ে তার মাথার কামড়াকামড়ি অবশ্য হুরমতুল্লা খুব একটা টের পাচ্ছে না। কেন?-বুড়া বয়সে মণ্ডল তাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে তাই দেখতে তাকে দিনমান থাকতে হয় বাইরে বাইরে। হামিদ সাকিদার জগদীশের কিছু জমি কিনে নেওয়ার পর নিজেই এখন জোতদার, তার বর্গা খাটে বেশ কয়েকজন চাষা। হুরমতুল্লার কাজ এখন অনেক।
তমিজের ওপর ভরসা না করে তার আর উপায় কী? হুরমতুল্লার জমি সে বর্গা তো করেই, এর ওপর মোষের দিঘির পুবে মণ্ডলের জমিটার খাটাখাটনি বেশিরভাগ করতে হয় তাকেই। শমশের হয়েছে হুরমতুল্লার বড়ো কামলা। কিন্তু বেলা ডোবার আগেই তার বাড়ি ফেরা চাই; সন্ধ্যা হতেই তার জ্বর আসে, জ্বর একবার এসে পড়লে হাঁটতে তার ভারি কষ্ট। ওই জমি থেকে পেঁয়াজ আর মরিচ তোলা হলো, এখন চলছে আউশ বোনার জন্যে জমি তৈরি। এই গরমে অবশ্য সন্ধ্যার পর ওখানে কাজ করতে তমিজের ভালোই লাগে। ওই সময় মানুষজন থাকে না, ফুলজান এসে একটু আধটু হাত লাগায়, তবে ভুল। ধরে অনেক বেশি। চৈত্রের এক সন্ধ্যায় মোষের দিঘির ঢালে দাড়িয়ে তমিজ বলে, তুই কি খালি হামাক ইংকা হেলাই করবু? এতো করাও হামি মাঝির বেটাই থাকি? ফুলজান বসে পড়েছে মোষের দিঘির পুবের ঢালে। সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঝামটা না দেওয়ায় তমিজ হয়তো একটু দমেও যায় আবার একটু লাইও পায়, সে তোলে তার মরা বেটার কথা, হামার কাছে থাকলে তোর বেটা ওংকা কর্যা মরে? কৈ, গেরস্থ চাষার ঘর তো করলু। তাও আবার ল্যাখাপড়াজানা মানুষ, শোলোক বান্দে, বই বেচে। সেই মানুষটা কী করলো?
তার কথায় ফুলজান এই প্রথম বড়ো বিচলিত হয়, তার পায়ের নিচে মাটি কঁপে, কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, হামার নসিব! তুমি মাঝির বেটা হলা কিসকঃ তমিজ তার গা ঘেঁষে বসে পড়লে ফুলজান তার বুকে হঠাৎ করে কিল মারে আর অভিযোগ করে, তুমি মাঝির ঘরত জর্ম লিলা কিসক? কিসক? কিসক?
