চেরাগ আলির দোতারার টুংটাং শোনা যায়। তার গানের প্রথম কথা শুনতে শুনতেই কুলসুম গলা মেলায় :
মরণ তাজ্জব বড়ো বুঝিবারে নারি।
তাজ্জব দ্রিাও সহোদর যে তাহারি।।
ভায়ে ভায়ে মোহাব্বত না বুঝি ফারাক।
সাপটিয়া থাকে যেন বীজ আর খাক।।
ও দাদা, খালি রহস্য করো কিসক গো? তমিজের বাপ এখন খেয়াৰ দেখে?
হাতের দোতারার টুংটাং অব্যাহত রেখে চেরাগ আলি বলে, তমিজের বাপ খোয়াব দেখিছে কুনোদিন? মানুষটা তো খোয়াবের মধ্যেই আছিলো! কুলসুম অবাক হয়ে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকলে চেরাগ আলি বলে, তাই খোয়াব দেখবি ক্যাংকা করা? মরার পর তমিজের বাপ আসিচ্ছে তোর খোয়াবের মদ্যে, বুঝলু?
কুলসুমের বোঝ না বোঝার পরোয়া না করে ফকির শোলোক গায়,
নিন্দে জীব বিচরয় স্বপনে স্বপনে।
খোয়াব দেখায় মুর্দা নিজ প্রিয়জনে।।
গাইতে গাইতে চেরাগ আলি দোতারা বাজায় খুব দ্রুত লয়ে, দুনিয়া বাজে ঝমঝম করে। শোলোকের তালে দুলতে দুলতে তমিজের বাপ চলে যায় বাশঝাড়ের দিকে। তার দাড়ি আর চুলে হাসির কণা চিকচিক করে।
শোলোক তমিজের কানে না গেলেও তার ঘুম ভেঙে যায়। কাঁথার নিচে লুঙি গুছিয়ে নিতে নিতে বিছানা থেকে উঠে আড়চোখে সে তাকায় কুলসুমের মুখে। অন্ধকারেও বোঝা যায়, তার ঠোঁটের কোণে থুথুর মতো সেঁটে রয়েছে হাসির কুচি। তার একটা হাত জড়ানো ছিলো তমিজের গলায়। তমিজ উঠে বসলে হাতটা আস্তে পড়ে যায় কাথার ওপর। সেখানেও তমিজের পায়ের ওম। কিন্তু তমিজ বড়ো উসখুস করে, ঘুমের আগে কীভাবে যে কী হয়ে গেলো! মাথাটা তার নিচের দিকে ঢলে পড়ে। অন্ধকারেও সে তাকাতে পারে না কুলসুমের দিকে। ঢলে-পড়া মাথাটা নিচু করে তমিজ উঠে দাঁড়ায় মেঝেতে এবং ঐ ঘর থেকে বেরিয়ে যায় দরজাটা আস্তে করে ভেজিয়ে দিয়ে। নিজের ঘরে। গিয়ে শোয়, কিন্তু ঘুম আর আসে না। ভোর হওয়ার আগেই বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
সেদিন মোষের দিঘির পুবের জমিতে ধানখেতে তমিজের কাস্তের পোঁচ পড়ে এমন তেজে যে দেখতে দেখতে তার আঁটির পরিমাণ হয়ে যায় পাহাড় সমান, হুরমতুল্লা বলে, কেটা কবি চাষার ঘরের মানুষ তুই লোস!
খুশি হয়ে তমিজ ফুলজানকে তার নিকার কথাটা বলতে চায়। ফুলজানও একটু দূরে থেকে তাকিয়েছিলো তার ধানের দিকে। তার ঘ্যাগটা আজ বড়ো বেঢপ বড়ো, কুলসুমের গলার ওই জায়গাটা বড়ো মসৃণ, ওখানকটায় গাল দিলে বডেড়া আরাম লাগে। কিন্তু যতোই সন্ধ্যা হয়, বাড়ির দিকে মেলা করতে তার পা আর ওঠে না। অতো সুন্দর মসৃণ গলা সত্ত্বেও কুলসুমকে দেখতে তার ভয় ভয় করে। হুরমতুল্লার বাড়ির উঠানে একটার পর একটা কাজ হাতে নেয়, শেষকালে একবার গুণে-রাখা ধানের আঁটি সে ফের গুণতে শুরু করলে ফুলজান এসে দাঁড়ায় তার পাশে, বাড়িত যাবা না? মাও তোমার একলা আছে না বাড়িত? ফুলজান কুলসুমকে তার মা বলায় তমিজের গা ছমছম করে, তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে, গলা শুকিয়ে যায়। ফুলজান ফের বলে, মরার বাড়ি, এখনো চল্লিশ দিন হয় নাই। তোমার মাও একলা থাকলে ভয় করবি না? বাড়িত যাও।
পাকুড়তলায় এখন তো মানুষ কিছু না কিছু থাকেই, ইটের ভাটা সেখানে জমজমাট। কিন্তু চোরাবালি এড়াতে তমিজ বাড়ি যায় একটু ঘুরে। বাপের যে হাত এখান থেকে তার লুঙি উঠিয়ে দিয়েছিলো সেই হাতই যদি সাঁড়াশি হয়ে চেপে ধরে তার গলা? ইটখোলার এক পাশে তমিজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে দুইজন পশ্চিমা মিস্ত্রি তাকে দেখে আফসোস করে, আহা, বাপের টানে ছেলেটা রোজ একবার এখানে আসে। একজন তাকে জানায়, তার বাপ প্রত্যেক বাত্রে বড়ো আওয়াজ করে। সংসারের টান সে এখনো কাটাতে পারে নি।
বাপের দুনিয়ার মায়ার কথা শুনে তমিজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে। কুলসুমের দিকে তাকাতে তার ভয় হয়। ভাত দিছি। ভাত খাও। কুলসুমের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে খিদে পেটে নিজের ঘরের দিকে যেতে যেতে বলে, ভাত খায়া আসিছি। তার পিছে পিছে কুলসুমকে আসতে দেখে সে দরজা ভেজিয়ে দেয় ভেতর থেকে।
চোরাবালির ভেতর থেকে তমিজের বাপ আজকাল রোজ রোজ আসে, কুলসুমের। সঙ্গে এটা ওটা কথাও বলে। তা মানুষটা আগের মতোই আছে, কথাবার্তা তেমনি কম। তবে রোগা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে কেমন খুশি খুশি দেখায়। সন্ধ্যার অনেক পরে বাড়ি ফেরে তমিজ। কিন্তু ভাত খেতে বসলে কুলসুমের সারা দিনের বৃত্তান্ত তাকে শুনতেই হয়। বাপের খুশি থাকার খবরে তমিজ একটুও খুশি হয় না। মরা মানুষ প্রতিদিন জীবিত মানুষের খোয়বে আসবে কেন? লক্ষণ তো ভালো নয়। কুলসুমকে কী তমিজের বাপ চোরাবলির ভেতরে টেনে নেবে নাকি? শাস্তিই যদি দিতে চায় তো তমিজ বাদ পড়ে কীভাবে?
মাথা নিচু করে তমিজ ভাত খায়, ভাত খেয়েই জোর করে হাই তুলতে তুলতে নিজের ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দেয়। কুলসুমের মসৃণ গলাটা বারবার দেখতে ইচ্ছা করলেও সে দিকে তাকায় না।
ওদিকে শরাফত মণ্ডলের বাড়ি থেকে ফিরে হুরমতুল্লা একদিন খুব খুশি। জগদীশ সাহার এক দাগে বারো বিঘা জমি মণ্ডল পানির দামে কিনে ফেললো। রেজিষ্ট্রি করা হয়ে গেছে। কালাম মাঝি ভালো করে খবর পাবার আগেই আজিজকে নিয়ে মণ্ডল সাব রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সব ঠিকঠাক করে ফেলেছে। মণ্ডলের সাফল্যে হুরমতুলা অনেকদিন পর হাসে, কাশিতে তার গলা বন্ধ হয়ে এলেও হাসি তার আর যায় না।
তমিজ কিন্তু গম্ভীর। হুরমতুল্লার কাশির দমক কমলে তমিজ বলে, জমি তুমি কিছু রাখবার পারলা না? এতো সস্তা!
