তমিজ ধন্দে পড়ে। এই দলের মানুষ পাকিস্তানে গোলমাল করে হিন্দুস্থানের টাকা খেয়ে। আবার হিন্দুস্থানে গেলে তারা জেল পাটে। এর মানে কি? কিন্তু লোকে এখানে গোলমাল করবে কেন? ইসমাইল সাহেব না সেদিনও বলে গেলো, নতুন আইন পাস হলে বর্গাচাষাকে তার ন্যায্য পাওনা দেওয়া হবে।
সেই কথা বল। কাদের এবার তমিজের কথাটা বোঝে, জমিদারি উচ্ছেদের একটা। বিল সেদিন সরকারের মন্ত্রী তুলিছে। তার মধ্যে একটা কথা আছে, জোতদার ইচ্ছামতো বর্গাদারেক জমি থেকে উচ্ছেদ করবার পারবি না। হঁ্যা, বিল একটা উঠিছে।
এবার তমিজ খুশি, বিল হোক আর জমি হোক, মাঝি হোক আর চাষা হোক, হামরা ল্যায্য হক পালেই খুশি।
বিল সম্বন্ধে তমিজের ভুলটা ভাঙাবার ধৈর্য কাদেরের এখন নাই। সে হাসে, তোর এতো খবরের দরকার কী? তুই তো আর জমি বর্গা করিচ্ছিস না।
এবার না পারুক, সামনের আবাদ তমিজ বর্গায় করবে। জগদীশ সাহা আড়াই বিঘা জমি বেচলো হামিদ সাকিদারের কাছে। তবে তার এক দাগে প্রায় বারো বিঘা জমি বেচবে, কালাম মাঝি নাকি সবটাই কিনে নেবে। এই দুজনের যে কোনো একজনের কাছে গেলে তমিজকে কি আর খালি হাতে ফিরতে হবে? আবার একই জমিতে চিরকাল বর্গা করার হক পেলে তেভাগার আইন হতে আর কদ্দিন লাগবে?
নিশ্চিন্ত হলে তমিজের মনে পড়ে বাপের কথা। তিন চার দিন হয়ে গেলো বাজানের কাছে যাওয়া হয় নি।
চোরাবালির ধারে দাঁড়িয়ে তমিজের শীত শীত করে। বাপটা তার ঢুকে আছে ওর মধ্যেই, অথচ ঐ শরীর থেকেই তাপ নিতে তমিজের গা আইঢাই করে। সারা জীবন বিলের ধারে ধারে ঘুরলে কি হয়, বাজানের গতরে তাপ ছিলো অনেক। এখানে আছে,–একদিক থেকে ভালোই, বাপ তো তার এই বিলেরই মানুষ। তমিজকেও রাখতে চেয়েছিলো পানিতে পানিতে। বাঘাড় মাঝির বংশের ছেলে হয়ে সে লাঙল ধরবে বাজান এটা কখনোই চায়নি। আবার এই নিয়ে যে জেদ করবে সেই জোরটাও তো তার ছিলো না। এই দুনিয়ায় বাপ যদি কাউকে ভয় করতে তো সেই মানুষটা সে নিজে ছাড়া আর কে? খিয়ারে ধান কেটে বাড়ি ফিরে বাপকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলে কি রাতভর বিলে কাটিয়ে তাকে ফিরতে দেখেলে তমিজ কী তারাতারা কথাই না বলতো! বাপের খাবার। লালচ নিয়েও কী না বলেছে! মানুষটা খেতে বড়ো ভালোবাসতো। তার খুব খাওয়ার হাউস ছিলো গো। খালি জেয়াফতের ধান্দায় থাকত। জেয়াফতে খেতে খেতে তার তবনের গেরো খুলে গেছে, বমি করে ফেলেছে, খেতে বসে পাদতে শুরু করে পাশের লোকের গালি খেয়েছে। এখানে এই শীতের মধ্যে তার খাওয়া নাই, পেট ছোেটানো নাই, বমি করা নাই। মরার আগে কতোদিন সে আধপেটা খেয়ে কাটিয়েছে। তখন নিত্যি রাত হলে বিলে চলে আসতো, পাকুড়গাছ খোঁজ করে করে খালি ঘুরপাক খেয়েছে। চোরাবালিতে ঢুকে মানুষটা এখন করে কী? এখানে না আছে পাকুড়গাছ, না আছে তার মুনসি। আবার বালির মধ্যে জেয়াফতের ধান্দাই কি সে করে বেড়ায়? খাওয়ার ঘেরান খুজতে খুঁজতে মানুষটা বালি খুঁড়ে খুঁড়ে কোথায় যে চলে গেলো কে জানে?
ডোবার এপার থেকেই ঘরের দরজার চৌকাঠে বাপকে বসে থাকতে দেখে তমিজ চমকে ওঠে, ভয়ও পায়। বাপ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘরে নতুন চালের ভাত রান্না। হচ্ছে, সকালে পান্তা, দুপুরে ভাত, রাত্রে ভাত। এই দুটো মাস তিন বেলাই ভাত খাওয়া। বাজান এখানে হাজার বসে থাকুক, সেই ভাত খাবার অবস্থা কি তার আর হবে?
তবে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কুলসুমকে সে ঠিক কুলসুম বলেই ঠাহর করে ফেলে এবং কুপির আলোয় তার চোখে বাজানের চাউনি দেখে সটান শুয়ে পড়ে বাজানের বিছানায়। বাজান! বাজান! কী খাবা গো? ডাকতে ডাকতেই শুরু হয় তার ফোঁপানো কান্না, এই কান্না তার জমতে শুরু করেছিলো চোরাবালির ধারেই, এবং কাঁদতে কাঁদতেই বাপকে তার প্রিয় খাদ্য সম্বন্ধে জিগ্যাসা করা অব্যাহত রাখে। পাশে বসে কুলসুম হাত রাখে তমিজের ঝাঁকড়া চুলে, তারপর ঐ চুলে নাক খুঁজে সে নিশ্বাস নিতে থাকে জোরে জোরে। এই ঝাঁকড়া চুলে মিশেছে তার বাপের পাটের আঁশ কিসিমের চুলের গন্ধ। এতোকাল পর গন্ধটাকে পাখির ডানা ঝাপটানোর গন্ধ বলে সনাক্ত করতে পারলো। তমিজের ঘাড়ের গন্ধে মিশেছে তার বাপের গায়ের আঁশটে গন্ধ, তার বুকে কাদার গন্ধ। তমিজের সারা গায়ের গন্ধ নিতে নিতে কুলসুমও কোঁপাতে শুরু করে এবং এখন কিছুক্ষণের মধ্যে সে কেঁদে ওঠে হাউমাউ করে। তমিজ তার বাপের গতরের ওম নিতে মুখ গুঁজে দেয় কুলসুমের উঁচু বুকে। কাঁদতে কাঁদতে কুলসুম বলে, প্যাট ভরা ভাতও খাবার পারে নাই গো মানুষটা, মুনসির ডাক শূন্য কোটে চলা গেলো, একবার কয়াও গেলো না। বাজান জেয়াফতের বাড়ি উটকাতে ঐ বালুর মধ্যে কোটে কোটে ঘুরিচ্ছে গো। এবার একটা পিটা মুখোত পড়লো না তার। শোলোক শুনবার গেলো, আর এই ফিরলো না। ত্যাল পিঠা হলে তাই একলাই এক কুলা শ্যাষ করিছে। তমিজ হামলে, কেঁদে ওঠে, মণ্ডলবাড়িত জিয়াফতের ভাত খাবার যায় কি কাউলটা তাই করিছিলো গো। কুলসুম জানায়, কালাহারের কৈ মাছ দিয়া নাউ দিয়া ভাত খাবার চাইছিলো গো উদিনকা, খাবার পারলো না।
পেটুক বাপের আধপেটা খাওয়া গতরের তাপ নিতে তমিজ হাত রাখে কুলসুমের পিঠে, তমিজের বাপের তাপ পোয়াতে তাকে নিবিড় করে টেনে নেয় নিজের শরীরে। পায়ের দুটো ঘা থেকে তার আধপেটা গতরের গন্ধ নিতে কুলসুম হাত বোলায় তমিজের হাঁটুতে আর উরুতে। আর তমিজের বাপ অনেক দূরে কাৎলাহার বিলের চোরাবালির ভেতর থেকে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে কিংবা হাতটাই লম্বা করে আলগোছে টেনে নেয় তমিজের বন আর কুলসুমের শাড়ি। গরহাজির মানুষটার গায়ের ওম পেতে আর গায়ের গন্ধ শুকতে দুজনে ঢুকে পড়ে দুজনের ভেতরে।
৪৩. মাঝরাত না ভোরবেলা
মাঝরাত? না ভোরবেলা? বিকালবেলা না সন্ধ্যা? কী জানি মেঘলা দুপুরও হতে পারে। আবছা আন্ধারে ঘুটঘুটে কালা আন্ধার চলে গড়িয়ে গড়িয়ে, ওটা কী গো? কী! কুলসুম এতোক্ষণ দিশাই পায় নি। ওটা না তমিজের বাপ! তমিজের বাপের শরীরটা কয়েকদিনে একটু রোগা হয়েছে। আহারে! আধপেটা খেয়ে মানুষটা গেলো বিলের উত্তর সিথানে, আর ফিরলো না। যাবার আগে তার চুল ছিলো পাটের আঁশের মতে, কয়দিনে তাই ঘন হয়ে কেঁপে উঠেছে ঝাঁকড়া হয়ে। তার মাথায় আর দাড়িতে কী যেন চিকচিক করে, সেগুলি কি তার হাসির কুচি একরম হাসির কণা তো তমিজের বাপের মুখে কখনো দেখা যায়নি। জেয়াফত বাড়িতে ড়ুম ড়ুমা গোশত দিয়ে ভাত খেয়েও সে তো এতো খুশি কখনো হয়নি। তবে আজ এতো সুখ কিসের তার? মরার পর বেটার ভেতর ঢুকে পড়ে কি সে শরীরের স্বাদ এমন তারিয়ে তারিয়ে চেখে গেলো নাকি? দাড়ির: জঙ্গলে, চিকচিকে বালিতে তমিজের বাপ তাই কি এমন হেসে হেসে এভাবে ঘোরে? চেরাগ। আলিকে পেলে কুলসুম ঠিক জিগ্যেস করতো ও দাদা, মরার পরে মানুষ খাব দেখবার পারে? তমিজের বাপ এখন কী খাব দেখে? কী দেখিচ্ছে কও তো।
