তিন দিনের মধ্যে ইটখোলার এক নম্বর হঁট দিয়ে চোরাবালির সবটাই ঘিরে দেওয়া। হলো। চোরাবালির খানিকটা পড়ে পানির ভেতরে সেদিকটা অবশ্য ফাঁকাই রইলো। কুন্দুস মৌলবী তার তালেবেলেমদের নিয়ে কোরান খতম করতে লাগলো দেওয়ালের ধারে বসে। কালামের দোকান থেকে রোজ রোজ আগরবাতির কাঠি আসতে লাগলো গোছা গোছা।
৪২. তমিজ আজ এতো রাত করে
তমিজ আজ এতো রাত করে কেন? দরজা খুলে চৌকাঠে বসলে কুলসুমের চোখের সামনে ঝোলে ঘন কুয়াশা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে চাঁদের ময়লা আলোয় কুয়াশা একটু তরল হয় এবং হালকা বাতাসে একটু দোলেও বৈ কি! মরার উঁদ যদি উঠলিই তো কয়টা দিন আগে উঠলি না কেন? সাত মাসের পোয়াতির মতো প্রায় ভরা ভরা চাঁদটা যদি দশ দিন আগে এমনি থাকে তো মানুষটা কী বিলের ধারে দলদলায় অমনি করে গড়িয়ে পড়ে। নিন্দের মধ্যে যে মানুষ হাঁটে তার সলকই কি আর আন্ধারই বা কি? কে জানে চোরাবালিকে পানি ঠাউরে সে নিজেই হয়তো ঝাঁপ দিয়েছিলো মুনসির ভেড়ায় সওয়ারি হবার আশায়। এ ছাড়া মুনসিকে সে আর ধরবে কোত্থেকে? পাকুড়গাছের নাকি চিহ্ন পর্যন্ত কোথাও নাই। তা মুনসি এখন তা হলে বিল শাসন করে কোন চুলায় বসে? চোরাবালির ভেতর থেকেই কী তমিজের বাপ এখনো উচাটন হয়ে খুঁজে বেড়ায় মুনসির কালো পাগড়িতে ঢাকা লম্বা দাড়িওয়ালা মুখ? তা টলতে টলতে মানুষটী কী একবার তার নিজের ভিটাটা দেখতে আসতে পারে না?
এক রবিবার আরেক রবিবার আট দিন, তারপর সোমবার গেলো মঙ্গলবার গেলো, কয়দিন হলো? এই দশ দিনে কুসুমের খোয়বেও সে কি একবার উঁকিটাও দিতে পারে না? এই কাৎলাহার ছেড়ে, গিরিরডাঙা নিজগিরিরডাঙা ছেড়ে, তাদের সবার মায়া কাটিয়ে নিজের পাকুড়গাছটাকে পর্যন্ত উপড়ে নিয়ে মুনসি যদি হাওয়া হয়ে যেতে পারে তো তার জন্যে তমিজের বাপের অতো দরদ কিসের?
মাটির হাঁড়িতে রেখে রোজ পান্তা খাওয়া হচ্ছে আজ কয়দিন থেকে। পান্তা মজে টক হয়, সেই ঘেরানে ভুরভুর করে সারা ঘর। সানকিতে পান্তা নিয়ে পেঁয়াজে কামড় দিতে গিয়ে কুলসুমের দাত বসে থাকে পেঁয়াজে, চিবানোর বল আর পাওয়া যায় না। দুই সানকি ভাত খেতে যে মানুষ শেষ করে ফেলে পাঁচটা পেঁয়াজ তার খোরাক এখন জোটে কীভাবে? কুলসুমের শুকনা চোখ খরখর করে। চাঁদের আলো তার চোখের সব পানি শুষে নিয়ে শিশিরের ফোঁটা করে ফেলে দিচ্ছে সামনের উঠানে, ঘরের চালে, নতুন খড়ের গাদায়। কুলসুমের চোখে পানি আর জমতে পারে না। তবে চোখে পানি না এ জমার একটি কারণ কিন্তু হতে পারে তার বড়ো বড়ো নিশ্বাস। গন্ধ নিতে নিতে কুলসুম হাপসে হাপসে পড়ে। কৈ তমিজের বাপের গন্ধ কোথাও নাই। মানুষটা তার গায়ের আঁশটে গন্ধ, মুখের পচা মাছের গন্ধ, হাঁটুর ওপরকার ঘায়ের পূজের গন্ধ, উরুর ঘায়ের বাসি গন্ধ সব নিয়ে গেছে মুনসিকে ভেট দিতে? এই যে দশটা দিন গেলো, কৈ কুলসুমের খোয়াবের মধ্যেও তো একবার এলো না।
আর মুনসিরই বা এ কেমন ধারা গো? তমিজের বাপকে কি মুনসি এতোই ভালোবাসে যে, তার নিজেরই খাস মানুষ ছিলো চেরাগ আলি, সারা জেবন কাটালো তারই শোলোক বলে বলে, তার নাতনিটার কথাটা কি একবার মনেও করলো না? আবার তমিজের বাপই বা কেমর মরদ যে, মুনসিকে বলতে পারলো না, তোমার নিজের আরস পাকুড়গাছের খবর নাই, ইটের ভাটায় ঢুকলো না কি উড়েই গেলো, তুমি আমাকে বসতে দেবে কোথায়? বলতে পারে না, এখানে আমি খাবো কী? আধপেটা খেয়ে কাটলো তার কতোগুলো দিন, এখন হুরমতুল্লার জমিতে ধান কেটে বেটা তার নতুন ধানের চালের ভাত খাওয়াবে। সে কি বলতে পারে না, তার বৌ আমন ধানের আতপ চালের পিঠা করবে, গুড় দিয়ে খির করবে, আমি এখন যাই!
হয়তো নতুন চালের ঘেরানে পিঠা খাবার লালচেই কুয়াশার ভেতর দিয়ে মাথায় শিশির নিয়ে এগিয়ে আসে তমিজের বাপ। তার ছায়া লেপ্টে থাকে জ্যোৎস্না মাখানো কুয়াশার সঙ্গে। কুলসুম চোখ বন্ধ করে রাখে, পাছে তার চোখের কাপনে মানুষটা ফেরম হারিয়ে যায়!
দরজাত বস্যা কী করো? ভাত খাছো? তমিজের গলা ঠাহর করতে পেরেও কুলসুম। কঁপে; ভয়ে কাঁপে, খুশিতে কাঁপে। মরার পর তমিজের বাপ বেটার রুহের সাথে মিশে এসেছে নিজের ঘর দেখতে।
ধান কিন্তু তমিজ এবারে তেমন পেলো না। মজুরি নিয়ে কাম করলেই ভালো হতো। হুরমতুল্লার মন খারাপ, তার ধানের ভাগ তো সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। তমিজের সঙ্গে সে গজগজর করে, তোক কেটা কী কয়, আর তুই তাই লিয়া নাফ পাড়িস?
হুরমতুল্লা পরামাণিক হদ্দ চাষা, তার দৌড় বড়োজোর গোলাবাড়ি হাট পর্যন্ত।
আবদুল কাদের বলেছে। কেরামত গান বেঁধেছে। ইসমাইল হোসেনের মতো মানুষ পর্যন্ত কতবার করে বলেছে, পাকিস্তানে জমিদারি মহাজনি থাকবে না। তেভাগা নিয়ে বলেছে, পাকিস্তান হলে ওসব এমনি এমনি হয়ে যাবে। মোসলমান চাষারা অন্তত এসব নিয়ে হুজ্জত করা বন্ধ করলো কি মিছেমিছি? জেলখানায় তেভাগার নেতারা আফসোস। করেছে, তাদের কতো তেজি তেজি মুসলমান ছেলে পাকিস্তানের ডাকে মুসলিম লীগে ভিড়ে গেছে। তারা কি এমনি এমনি ভিড়েছিলো?
গোলাবাড়িতে কাদেরকে জিগ্যেস করলে সে গম্ভীর হয়ে যায়, উগলান কথা এখন রাখ। আমাদের নতুন রাষ্ট্র, ইনডিয়ার দালালরা মানুষকে খেপাতে চায়, মানুষ গোলমাল করলে ইনডিয়া সুযোগ নিয়া নয়া দেশটাকে খপ করা খায়া ফালাবি। ইনডিয়ার সমস্যাও কাদের তাকে বোঝায়, হিন্দুস্থানেত যারা চাষাদের নিয়া গোলমাল করে ঐ দেশের সরকার তাদের জেল দেয় : জহরলাল নেহেরু নিজে কতো জেল খাটিছে, এখন প্রধান মন্ত্রী হয়া কম্যুনিস্টদের জেলের মধ্যে ভরে।
