ছেলেটির লাশ নিয়ে কয়েকজন লোক থানার ভেতর চলে গেলে মিছিল এগিয়ে চললো সামনের দিকে। রেল লাইন পার হয়ে ঝাউতলা না বাদুড়তলা কি বলে,-টাউনের জায়গাগুলোর নাম তমিজের মনে থাকে না,—মিছিল চলে যায় সেই দিকে। তমিজের আর এগুনো হয় না। নিশান অনেক উঁচুতে ওঠাতে গিয়ে ছেলেটি মরলো, নিশানটিকেও ছাপিয়ে দিলো লালরঙে। এটা কেমন হলো গো?-জেলখানায় তার সঙ্গে খাতির হয়েছিলো লাল নিশানের কয়েকটা মানুষের সঙ্গে। বড়ো ভালো ভালো মানুষ গো। বলতো, জোতদারি জমিদারি আর মহাজনি যদি থেকেই যায় তো পাকিস্তান। বলো আর স্বাধীনতা বলো, এসবের মানে হয় না। এই মিছিলে এসে তমিজ বুঝতে পারে পাকিস্তানে তেভাগা তো হবেই। এতোগুলো মানুষ কি আর বেকুব নাকি? পাকিস্তানের নিশান ওড়াতে বিজলির ধাক্কায় মানুষটা মরলো, সে তো তমিজের মতোই গরিব গরবা মানুষ। সে কি এমনি এমনি নিশান ওড়াতে উঠেছিলো? তমিজ ভরা গলায় স্লোগানের জবাব দেয়, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, কায়েদ আজম জিন্দাবাদ।
আকাশে মেঘ দেখে কুলসুম উঠানের ডালপাতা সব উঠিয়ে রাখছিলো তমিজের ঘরে। তমিজকে দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তমিজ সামনে গিয়ে বলে, ভালো আছে? কুলসুম কিছু না বললে সে ফের বলে, কাল খালাস পালাম।
কুলসুম শাড়ির আঁচলে নিজের মুখ ঢাকে। তমিজ অবাক হয়ে দেখে। কুলসুমকে তো সে এভাবে কখনো কাঁদতে দেখেনি। এটা দেখে তার নিজের চোখও ভারি হয়ে ওঠে। হয়তো সেটা সামলাতেই তমিজ জিগ্যেস করে, বাপজান কোটে?
তমিজের গলার স্বর ভারী, কথাবার্তা ধীরস্থির। চোখ মুছে তার দিকে তাকিয়ে কুলসুম জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়। ছোঁড়াটার গায়ের গন্ধও পাল্টে গেছে। অনেকক্ষণ পর কুলসুম বলে, শুক্যা গেছে। গাওত গোশত নাই।
জেলখানায় নিয়মিত খেয়ে তমিজ বরং একটু মোটাই হয়েছে। কুলসুমের কথা মেনে নেওয়ার ভঙ্গি করে সে হাসে, খিদা নাগিছে। ভাত চড়াও।
তমিজ খেতে বসলে শুরু হয় কুলসুমের অবিরাম কথা। তমিজের বাপ আজকাল ঘরেই থাকে না, দিনরাত ঘুরে বেড়ায় বিলের উত্তর সিথানে। কয়েক দিন পর পর কালাম মাঝির কাছ থেকে সে টাকা নিয়ে আসে, এই বাড়িঘর তার কাছে বেচেই দিলো কি-না কে জানে? কালাম মাঝি আজকাল খুব বড়ো মানুষ, বিলে মাঝিদের হক নাকি সে আদায় করে ছাড়বে।-তা কথা তো ঠিকই, তমিজও জানে পাকিস্তানে সবার হক ঠিকই আদায় হবে। অনেক রাত পর্যন্ত কুলসুম কথা বলে এবং এক বছরের বৃত্তান্ত সবই বয়ান করে।
ঘুমাতে নিজের ঘরে ঢুকে তমিজ দেখে ঘরের চাল একেবারে পাতলা। মেঝে ভর্তি পাতা আর গাছের ডাল। একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে, ঘরের মেঝে কাদাকাদা। একটা বছর জেলখানায় পাকা ঘরে থেকে অভ্যাস অন্যরকম হয়ে গেছে তার। তবে নিজের মাচায় পিঠ ঠেকাতেই কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ে। * ভোরবেলা দুই পা ভরা কাদা নিয়ে ঘরে ফেরে তমিজের বাপ। আর একটু বেলা হলে তমিজ তার ঘরে এসে দুটো টাকা তুলে দেয় বাপের হাতে, জেলখানা থ্যাকা বারাবার সময় দিলো।
তমিজের বাপের চোখ থেকে ঘুম ঝরে পরে,সোম্বাদ শুনিছিস?
কালাম ভায়ের কাছ থ্যাকা ট্যাকা লিয়া ঘরখান বেচিছো।
বেচমু কিসক? বন্দুক দিছি। কী করমু, তোর মামলার খরচ দেওয়া লাগে। তো সোম্বাদ সিটা লয়।
আফসার চাচার খবর? শুনিছি। যুধিষ্ঠিরের বাপের খবর শুনিছি আগেই।
আরে না। খবর সিটা লয়। সব্বোনাশ হয় গেছে।
বৈকুণ্ঠদার হাতের আঙুল–।
আরে দূর। সব্বোনাশ হছে। বিলের উত্তর সিথানত পাকুড়গাছ খুঁজ্যা পাই না। পাকুড়গাছ নাই।
নাই। গাছ কাটিছে। তমিজের কাছে এ তো সোজা হিসাব, মণ্ডলরা ইটখোলা করলো না?
মুনসির গাছ কাটা অতোই সোজা কার হাতে এংকা জোর আছে রে?
মুনসি গাছেত চড়া উড়াল দিছে। বেপরোয়া হয়ে বললেও তমিজের একটু ভাবনা হয়, গাছ মনে হয় ক্যাটাই ফালাছে, দিশা পায় নাই। তবে এই নিয়ে কথা বলার মতো সময় কোথায় তার? দেখি, কামকাজ তো কিছু দেখা লাগে।
তমিজকে দেখেই ফুলজান হাউমাউ করে এক পশলা কাঁদে, তুমি আসিছছা গো মাঝির বেটা? হামার বেটাক তুমি ডাক্তোরের কাছে লিয়া গেলা না গো? এখন হামার বেটা নাই, তুমি অ্যাসা আর কী করবা?
ফুলজানের বেটার মরার খবর তমিজ পেয়েছে কুলসুমের কাছে। ফুলজানের পুত্রশোক অবশ্য কুলসুমের প্রধান বিবেচনা নয়। সে বলছিলো, বেটাটাক তো মাগী খালো। ভাতারও আসে না। ঘেগি মাগী এখন লিকা বসবি কার সাথে? কুলসুমের এইসব দুশ্চিন্তা শোনার পর থেকেই তমিজের খুব ইচ্ছা হয়, ফুলজানের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।
ফুলজানের মা মেয়েকে ধমক দেয়, লে বাপু হছে। জাত নাই বিচার নাই, মানুষ দেখলেই কান্দন আরম্ভ হলো! তারপর সে নিজেই শুরু করে তার স্বামী হুরমতুল্লার গপ্পো। বুড়া তো জমি ছাড়া কিছু বোঝে না কিন্তু সারাটা জীবন তার কাটলো বর্গাচাষ করে। এবার মণ্ডলের আরো জমি বর্গা পেয়েছে, এখন আউশ কাটার মানুষ পাওয়া মুশকিল। মজুরি বেড়ে গেছে, খিয়ারে আরো বেশি মজুরির লোভে লোকজন অনেকেই গ্রামছাড়া। কিছু কিছু জমিতে আউশ কাটা হয়েছে, সেখানে আমন বোনার পাঁয়তারা কষছে বুড়া। এদিকে নিজের জমিতে কি বুনবে না বুনবে এখনো ঠিক করতে পারছে না। মণ্ডলের জমিতেই দিনরাত খাটে, নিজের জমির যত্ন নেয় কম।
যে জমিতেই হোক, হুরমতুল্লার ফসল কাটা আর ফসল বোনার গুঞ্জনে তমিজের সারা শরীরেই কোলাহল ওঠে; সেই কুয়াশায় পাকা আমনের জমির পাশে ফুলজানের সঙ্গে কাটানো। ফুলজানকে জড়িয়ে ধরতে না লাঙল ধরতে, না-কি দুটোর তাগিদেই তার হাত নিশপিশ করে বোঝা মুশকিল।
