আজিজ বাইরে ডেকে নেয় কেরামতকে, তোমার গান বাপু খুব ভালো হছে। তুমি তমিজের বাপকে নিয়া একদিন টাউনে আমার বাড়ি আসো। বাবরের মায়ের অসুখ তো কমে না। এতো খরচপাতি করলাম, ফল নাই। একটু চাপা স্বরে বলে, কাদের ইগলান ফকিরালি কথা শুনবার পায় না। আমার মামাশ্বশুর আলেম মানুষ, তমিজের বাপের সাথে কথা বলে ঐ বইটা দেখে যদি।
তমিজের বাপের দরকার কী? কেরামত বেশ জোরের সঙ্গে তমিজের বাপকে প্রত্যাখ্যান করে, তার জারিজুরি সব তো আমার কাছে।
কেমন?
তার দাদাশ্বশুর চেরাগ আলির বই তো আমার কাছে। একদিন তার বৌ কলো, কবি, হামার স্বামী জাহেল মানুষ, এই বইয়ের বোঝে কী? বই আপনে লিয়া যান, দশের কামেত আসবি।
বই তোমার কাছে? চেরাগ আলির বই তুমি জোগাড় করিছো? আজিজ উত্তেজিত হয়ে বলে, সত্যি? কেরামত সামনে ধরলে বইটা সে তুলে নেয় নিজের হাতে। কেরামত তার গৌরবের কথা বলেই চলে আর হেঁড়া বইটার পাতা ওলটায় আজিজ। কেরামতের কথায় বিরতি পড়লে সে বলে, বই এখন আমার কাছে থাক। আমার মামাশ্বশুরকে কালই পড়তে দেবো। আলেম মানুষ, বড়ো মওলানা, খালি বড়ো বড়ো কেতাব নিয়ে থাকে।
ঐ বই তো আমার খুব দরকার ভাইজান। কেরামত মিনতি করে, তমিজের বাপের বৌ তো আমাক কিছুতেই দিবার চায় না। অনেক কষ্ট করা আনিছি। বই তো তাক ফেরত দেওয়া লাগবি। .
আমার কাছে থাকা যা, তোমার কাছেও থাকাও তো তাই, চেরাগ আলি ফকিরের বই নিজের ব্যাগে ভরতে ভরতে আজিজ বলে, আমার মামাশ্বশুরকে একবার দেখাবো। আলেম মানুষ। খালি পানিপড়া আর তাবিজ দিয়াই তার মাসের রোজগার শও টাকার উপরে। এই বই তিনিই বুঝবেন। কেরামতের হাতে দশ টাকার একটি নোট দিয়ে আজিজ বলে, তোমার ঐ গানের বই ছাপায়া ফালাও। এই টাকাতেই হবে তো? কেরামত টাকাটা হাতে নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে আবদুল আজিজ কাদেরের দোকানে ঢুকতে ঢুকতে বলে, তোমার গানের বই ছাপালে আমাকে দুই কপি দিও। মনে করে দিও কিন্তু।
৩৯. টাউনের বড়ো রাস্তা জুড়ে
টাউনের বড়ো রাস্তা জুড়ে লাল নীল সবুজ বেগুনি হলুদ রঙের কাগজের তেকোণা নিশান টাঙানো মাথার ওপরে; বাড়িঘরের ছাদে কাপড়ের নিশান, সাদা চাঁদ তারা হাসছে সবুজ রঙের জমিতে। মানুষ খুশিতে টইটম্বুর। খুশি তো তমিজও, তার ট্র্যাকে দুই টাকা বারো আনা পয়সা। জেল থেকে খালাস দেওয়ার সময় জেলের ছোটোবাবু একটা কাগজে তার টিপসই নিয়ে বললো, সরকার থেকে রাহাখরচ বাবদ তোমাকে দেওয়া হলো। তা সেই বাবুটিও খুশি, কাল স্বাধীনতা ঘোষণা করা হবে। এই উপলক্ষে কিছু কয়েদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই খালাস করার হুকুম পাওয়া গেছে। ইসমাইল হোসেন সাহেব ডি এমকে বলে তোমার নাম পাঠিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করে যেও।
কিন্তু ইসমাইল সাহেবের বাড়িতে যা ভিড়! ভালো ভালো কাপড়পরা মানুষের মধ্যে অবশ্য গ্রামের মাতব্বর মানুষও কিছু কিছু আছে। কিন্তু তমিজের চেনা কাউকে পাওয়া গেলো না। ঐ বাড়িতে তমিজ ঢোকে কোন সাহসে?
রেল স্টেশনের কাছে পুরো তিন আনা পয়সা খরচ করে ভাত আর গোরুর গোশত খেয়ে স্টেশনের পাকা মেঝেতে শুয়েই ঘুমে তমিজের চোখ জড়িয়ে আসে। কিন্তু ভোর হবার অনেক আগে অনেকগুলো ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলে সে জেগে ওঠে। লোকজন সব ছুটছে বড়ো রাস্তার দিকে। সকাল হলে দোকানপাট খুললে বাজানের জন্যে একটা লুঙি আর কুলসুমের জন্যে রুটি বেলার চাকি বেলুন কিনতে তমিজ। কুলসুম রুটি খেতে না চায় খুব, রুটি নাকি বানাতেও শিখেছে মণ্ডলবাড়িতে। কিন্তু দোকানপাট তো আর খোলে না। রাস্তায় মানুষ গিজগিজ করে। থানার কাছে আকবরিয়া হোটেলের সামনে সে কয়েকবার ঘুরঘুর করে, পোলাও, গোশত, পরোটার কী সুন্দর ঘেরান। কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস তার হয় না। কল্পনা সিনেমার পাশের গলিতে উড়ে ঠাকুরের দোকানেও পাজামা পাঞ্জাবি, ধুতি শার্ট, ধুতি পাঞ্জাবিপরা লোকদের ভিড় দেখে সেখানেও তার ঢোকা হলো না। সিনেমা হলের সামনে দুই পয়সার বাদাম ভাজা কিনতে কিনতে জিগ্যেস করলে জানতে পায়, আজ তো সব বন্ধু। এখুনি মিছিল বেরুবে।
তা বাপু মিছিলও বেরোলো একখান! মানুষে মানুষে সয়লাব। মিছিলের মধ্যে নাই কী? হুড-খোলা মোটরগাড়িই তো গোটা দুয়েক। একটা গাড়িতে সায়েবদের পোশাকপরা কয়েকটা ছেলে সায়েব সেজে ভারতবাসীর কাছে বিদায় চাইছে, হামরা দুইশো বছর টোমাডের শাসন করিয়াছে। এখন আবার নিজেডের ডেশে ফিরিয়া যাইটেছি। লোকজন তাদের অঙ্গভঙ্গি দেখে হেসেই অস্থির। মিছিলের মাঝখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে পুলিসের মতো ঢাকনি-দেওয়া পকেটওয়ালা শার্ট পরে পুলিসের মতো সমান তালে পা ফেলতে ফেলতে চলছে কয়েকজন জোয়ান ছেলে। তমিজের পাশের লোকটি বলে, পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড। আরে এদের সঙ্গে তো আবদুল কাদেরকেও দেখা যাচ্ছে। কাদের ভাই কি পুলিসে নাম লেখালো? কাদের পুলিসে যদি বছরখানেক আগে ঢোকে তো তমিজের এই হেনস্থাটা হতো না। কয়েকটা টমটমে পাকিস্তানের নিশান হাতে নিয়ে কয়েকজন খুব জোরে জোরে স্লোগান দেয়, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। খোলা গোরুর গাড়িতে কয়েকটা ছেলে হেলেদুলে নাচে আর রাস্তার দুই পাশের মানুষকে সালাম দেয়। মিছিল এগিয়ে চলে। এরপর আসে মস্ত উঁচু একটা হাতি। হাতির ওপর উল্টো করে রাখা তক্তপোষ, তার চার পায়ায় পাকিস্তানের চারটে নিশান। মাঝখানে গদির ওপরে বসে রয়েছে কয়েকজন। আরে ঐ তো ইসমাইল হোসেন। কিন্তু এই ভিড় ঠেলে তমিজ কি আর ইসমাইলের হাতির কাছাকাছিও যেতে পারবে? তবু না হয় একটু চেষ্টা করা যেতো। কিন্তু এই সময় থানার মোড়ে হঠাৎ সোরগোল ওঠে।-কী গো?-আঠারো বিশ বছরের একটা ছেলে, লুঙি আর গেঞ্জিপরা, আটকা পড়েছে উঁচু লাইট পোস্টে। লোকটা আঁ আঁ করে চিৎকার করছে আর হাতের মুঠিতে ধরা পাকিস্তানের নিশান, নিশানটা সবচেয়ে উঁচুতে টাঙাবে বলে সে উঠে পড়েছে বিজলি বাতির পোলে। নিচে থেকে সবাই চায়, আরে পিছনের দোতলায় লাফায়া পড়ো, নিচে লাফ দাও। সবার পরামর্শ ও অনুরোধ অগ্রাহ্য করে ছেলেটা পড়ে যায় রাস্তায়। তবে তাকে জায়গা দিতে ঐ জায়গাটুকুর লোকজন ভিড়ের চাপ সহ্য করেও সরে গিয়েছিলো। খোয়া বিছানো রাস্তায় পড়ে ছেলেটা মাথা ফাটিয়ে ফেলেছে। নিশানটা সে ছাড়ে নি, তার গায়ের রক্তে নিশানের সবুজ ও সাদা জায়গার অনেকটা ফুটে ওঠে লাল টকটকে রঙে।
