মোষের দিঘির পূর্ব ঢালের নিচে থেকে সন্ন্যাসীর ভিটার উত্তর সীমা প্রায় চার বিঘা জমি মণ্ডল নতুন পত্তন নিয়েছে। ক্যা গো বুড়ার বেটা, চিনবার পারো? দিঘির ঢালে জমিতে মই দিতে দিতে হুরমতুল্লা জবাব দেয় তমিজের দিকে না তাকিয়েই, না চেনার কি হলো? জেল খাটা কয়েদি, চিনা তো রাখাই লাগে।
তমিজের চোখমুখ গরম হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলে, জেলে পাঠালা তো তোমরাই। মণ্ডলের চাকর। মণ্ডল হুকুম দিছে, তোমরা নাঠি লিয়া গেলা। উগলান দিন শ্যাষ। কাৎলাহার তো আর রাখবার পারিচ্ছে না। মাঝিগোরে বিল, মাঝিরাই পাবি।
এবার হুরমতুল্লা একটু ঘাবড়ায়, ছোঁড়ার তেজ তো আরো বেড়েছে! একবার জেলের ভাত খেয়ে এসেছে, এদের কোনো বিশ্বাস আছে? হুরমতুল্লার ভয়-পাওয়া বুঝতে পেরে তমিজ প্রস্তাব করে, জমি তো শুনলাম মেলা বর্গা লিছো।কামলা লাগলে কয়ে।
মইয়ের ওপর শমশের পরামণিকের ভাগ্নেকে উঠিয়ে দিয়ে হুরমতুল্লা বলে, মণ্ডল তো তোক জমি বর্গা দিবি না। এখন তারই জমিত যদি তোক কামলা লেই তো তাই কোদ্দ করে যদি?
উগলান ভয় এখন মাচাত তুল্যা রাখে। শোনো, মণ্ডলের বেটা ঘোরে ইসমাইল সাহেবের পাছে পাছে। ইসমাইল হোসেনের নাম শুনিছো?
ভোট দিলাম না?
হুঁ, ভোট দিয়া তাক কাউন্সিলে পাঠাছো না? ঐ মানুষ নিজে মটোর লিয়া জেলখানাত যায়া হামাক খালাস করা আনিছে। এখন বোঝো! তুমি জমি বর্গা লিছো, হামি জমিত খাটমু, পয়সা দিবা। মণ্ডলের কী?
হুরমতুল্লার আউশ কাটলো সে মজুরি নিয়ে। কিন্তু প্রায় পাশাপাশি আমনের জমি তৈরি করতে কামলা দেওয়ার শর্তে তমিজ একটু অন্যরকম করতে চায়। মজুরি দিলে চলতি হারেই দেবে। কিন্তু হুরমতুল্লা ইচ্ছা করলে অন্যভাবেও দিতে পারে। ধান উঠলে মণ্ডলের গোলায় তুলে হুরমতুল্লা বর্গাচাষী হিসাবে যা পাবে তার একটা ভাগ দেবে তমিজকে।-এটা কেমন কথা?–তমিজ জোর দিয়ে বলে, ততোদিনে তেভাগা হয়া যাচ্ছে। জোতদার পাবি এক ভাগ, তোমার ভাগ দুইটা। তার দুই আনিও যদি হামাক দাও তো তোমার কতো ধান থাকে হিসাব করিছো?
হুরমতুল্লা ব্যাপারটা ঠিক বোঝে না। আবার নিজে দুই ভাগ পাবে—এই ভরসায় তমিজের প্রস্তাব মেনে নিতেও তার আপত্তি নাই। হ্যা না কিছুই না করে বলে, দেখা যাক। কাম কর তো।
ছোঁড়াটার কাম তার খুব পছন্দ। দেখো না, একে মাঝির বেটা, তাতে আবার এক বছর ছিলো জেলে, ধানের জমি চোখেও দেখেনি তখন। অথচ তার আমন বোনার হাতটা দেখে। চারা লাগায় এমন সোজা সারিতে যে তাই দেখতে দেখতে হুরমতুল্লার সারিগুলো আরো এলোমেলো হয়ে যায়। আবার ছোঁড়াটা আসার পর ফুলজানও জমিতে আসতে শুরু করেছে। মাঝখানে কেরামতের ধমকে এদিকে ভিড়তে সাহস করে নি। শালা জামাই একটা!-মাসের পর মাস উধাও হয়ে হাটেবাজারে ঘুরে বেড়ায়, এর বাড়িতে ওর ঘরে গিয়ে থাকে, আবার একেক দিন হুমকি ছেড়ে যায়, মেয়েমানুষ আবার জমিতে যাবে কেন?-ঐ জামাইকে পরোয়া করার দরকারটা কী?
আমনের শীষে দুধ আসতে শুরু করেছে, তমিজ এখন রাত্রিবেলায় এসেও জমি দেখে যায়। ফুলজান অকারণে খবরদারি করে। হুরমতুল্লা মেয়ের ওপর বিরক্ত হয়; তমিজকে কাজ অতোটা না দেখালেও তো তার চলে। সে পারে না কোন কাজটা? তবে হাজার বাকাচোরা কথা বললেও জমিতে তমিজ থাকলে ফুলজানের মেজাজটা থাকে ভালো।
হাটে তমিজের সঙ্গে দেখা হলে কেরামত তার সঙ্গে খুব গল্প করে। জেলখানায় তেভাগার যেসব নেতার সঙ্গে তমিজের আলাপ হয়েছে, আরে তারা সবাই তো কেরামতের বন্ধুমানুষ। তার বাঁধা গান শুনেই তো চাষারা রুখে দাঁড়িয়েছিলো। তেভাগা তো হয়েই যাচ্ছে, কেরামতের তখন কদর আরো বাড়বে। কেরামতের বেশির ভাগ কথা তমিজ যে বিশ্বাস করে তা নয়, আবার সেসবকে মিছে কথা বলেও মনে হয় না। গানও বাঁধে সে ভালো। পাকিস্তান হয়ে পড়ায় তার লীগ কংগ্রেসের হিংসা কেন গেলো না, বইটার বিক্রি পড়ে গেছে। ইসমাইলের কথায় সে এখন নয়া ওয়াতন পাকিস্তান নামে একটা গান বাঁধার কথা খুব ভাবছে। ঠিক জুত হচ্ছে না।
মানুষটা এমনিতে তো ভালোই। কিন্তু ফুলজানের সঙ্গে সে এমন করে কেন? ফুলজানকে কেরামতের কথা একদিন জিগ্যেস করতেও চেয়েছিলো তমিজ। আজ বলি কাল বলি করতে করতে মেলা দিন হয়ে গেলো। ধানের শীষ ততোদিনে বেশ জমে এসেছে। এবার শীত পড়ছে একটু তাড়াতাড়ি, ধানের কি হয় কে জানে—এই ভাবতে ভাবতে মোষের দিঘির পুবের জমিতে নিড়ানি দিচ্ছে, এমন সময় হুরমতুল্লার বাড়ি থেকে মেয়েলি গলায় সমবেত কান্না শুনতে পেয়ে তমিজ সেদিকে ছোটে।
গফুর কলু এসেছে তার বৌকে নিয়ে। আবিতনের হাতের কাগজটা নিয়েই এতো কান্নাকাটি। পড়তে না পারলেও গম্ভীর মুখে হুরমতুল্লা কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখে। তার হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে তমিজও দেখলো। তবে কাগজে লেখা বিষয়টি বলেছে। আবিতন নিজেই। হুরমতুল্লা মেয়েকে ধমক দেয়, কুত্তার বাচ্চাটা থাকার চায় না থাকাই তো ভালো। তালাক দিছে, হামাগোরে শনি বিদায় হলো। আপদ গেলো।
মাচায় শুয়ে ফুলজানকে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে দেখে তমিজের কষ্ট হয়। কেরামত আলি তালাক দিলে ফুলজানের এতে ভেঙে পড়ার কী হলো? তো ফুলজানের দুঃখ দেখেই সে কষ্ট পায় কি-না তাই বা কে জানে? জমিতে ফিরে গিয়ে তমিজের নিড়ানি দেওয়া সেদিন ভালো হয় না। এই ফুলজানই তো তমিজকে কয়েকবার বলেছে, কেরামত বাইরে এতো ভালো সাজলে কী হয়, ওটা কোনো মানুষের পয়দা নয়। শালা একটা শয়তানের বাচ্চা। ফুলজান বলেছে, শয়তানটা তাকে ইচ্ছা করেই তালাক দেয় না। হুরমতুল্লার তিন মেয়ে ছাড়া আর কে আছে? তার জমি যা আছে সব পাবে তো তার মেয়েরাই। শয়তানটা জমির লোভেই ফুলজানকে তালাক দিচ্ছে না। শরিয়তে নিয়ম থাকলে তালাকনামা পাঠাতে ফুলজানই।—তা এখন বাপু তালাক পেয়ে অমন কাঁদো কেন? কেরামতেরও কি জমির মায়া ছিলো? এখন ফুলজানের ভাগের জমিটা পাবে যে তাকে বিয়ে করবে সে-ই তো? তমিজকে বিয়ে করতে ফুলজানের এখন আর আপত্তি কি থাকতে পারে। তুমি বরং ফুলজানের জমি আরো কতো বাড়িয়ে দিতে পারে। ফুলজানকে বিয়ে করলে, বেশি না, কেবল তার জমিটুকুও যদি হুরমতুল্লা তাকে দেয় তো তিন বছরের ফসল বেচে তমিজ নিজের বাড়ির পালানটা কিনে ফেলতে পারে শরাফতের কাছ থেকে। তার আগে কালাম মাঝিকে টাকা শোধ করে উদ্ধার করতে হবে তার ঘর আর ভিটা। মোষের দিঘির পুবের জমিটা তো পত্তন নিলো হুরমতুল্লা, পশ্চিমের জমি নেবে তমিজ। জমিদারি তো উঠেই যাচ্ছে, তখন জমিদারদের এইসব খাস জমি : পাবে তো তারাই। তখন জমিতে নামো, লাঙল বাও আর ফসল তোলো। ফুলজানকে জমিতে অতোটা না খাটলেও চলবে। চাষবাস নিয়ে সে যদি তমিজকে একটা মুখ ঝামটা দেয় তো তাতেই ফসল যা হবে তাই খাবে কে? এক দাগে ছয় বিঘা জমির মালিক হতে তার তিন বছরও লাগবে না।
৪০. অনেক রাতে বৈকুণ্ঠ আসে
একদিন অনেক রাতে বৈকুণ্ঠ আসে তমিজের বাপের হাত ধরে। তমিজও তখন কেবল ফিরেছে। বৈকুণ্ঠ বলে, তোর বাপ নিন্দের মধ্যে পাকুড়তলাত ঘুরিচ্ছিলো। হামাক চিনবার পারলো না। ধর্যা লিয়া আলাম। মাচায় শুয়ে তমিজের বাপ তার ঘুম অব্যাহত রাখে। বৈকুণ্ঠ বলে, তমিজ, তোর বাপোক দেখ্যা রাখিস। আজ ক্যামা মুনসির ডাক শুনলাম রে। পাকুড়গাছ তো নাই, মুনসি কোটে বস্যা ডাক পাড়ে দিশা পাই না।
